আকবর আলি খানের বই থেকে

দরিদ্রদের জন্য বিচারের বাণী নীরবে কাঁদে

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ২৫ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৪৯
দরিদ্রদের জন্য বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। যারা দুর্বল তাদের শাস্তি হয় আর যারা প্রতিপত্তিশীল তারা ছাড়া পেয়ে যায়। এ চিত্র পৃথিবীর সবখানেই। আর সেজন্যই আদিমকাল থেকে দুনিয়ার সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছে। বাংলাদেশের
বিচারব্যবস্থায় গরিবদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বিচারব্যবস্থার এ চিরায়ত রীতি থেকে কিভাবে বের হওয়া যায়, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় কোন কোন ক্ষেত্রে সংস্কার করলে তা সাধারণ মানুষের জন্য আরো কার্যকরী হতে পারে তা উল্লেখ করেছেন প্রথমা প্রকাশিত ‘অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ গ্রন্থে।
বিচার ব্যবস্থার সংস্কারে বেশকিছু সুপারিশমালার উল্লেখ করে তিনি বলেন, পৃথিবীর সর্বত্র ঠাট্টা করে বলা হয় যে বিচার ব্যবস্থা হলো এমন একটি জাল, যাতে ছোট ছোট পতেঙ্গরা আটকে যায়, আর বড় বড় পতেঙ্গরা জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। অর্থাৎ যারা দুর্বল, তাদেরই শাস্তি হয়; যারা প্রতিপত্তিশীল, তারা ছাড়া পেয়ে যায়। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাতেও তাই অনেক ত্রুটি রয়েছে। তবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার একটি তফাত রয়েছে। বাংলাদেশের বাইরের দেশগুলোতে বিচার ব্যবস্থায় কোনো কোনো উপাদান শক্তিশালী আবার কোনো কোনো উপাদান দুর্বল। বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থার প্রায় সব উপাদানই অত্যন্ত দুর্বল। এখানে আইনসমূহের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, বিচার পদ্ধতির উপযোগিতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, বিচারকদের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আইনজীবীদের দুর্নীতি প্রায় প্রবাদপ্রতিম পর্যায়ে উন্নীত। বিচার বিভাগের সহায়ক কর্মকর্তারা দুর্নীতির একটি বড় উৎস। এখানে সাক্ষীরা আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, এখানে অধিকাংশ মামলা অসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে দলিলপত্র অনেক ক্ষেত্রে জাল, এখানে ধনী ব্যক্তিরা আদালতের রায় অর্থ খরচ করে কিনতে পারেন। অথচ অসহায় দরিদ্রদের জন্য বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। এই ব্যবস্থার সংস্কার অত্যন্ত জটিল এবং এ সংস্কার একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া। কাজেই এ সংস্কার অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশে সিভিল সমাজের বিশ্বাস যে স্বাধীন ও যোগ্য বিচারপতি নিয়োগ করলেই এ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। উপযুক্ত বিচারপতিরা নেতৃত্ব দিয়ে বিচার সংস্কার এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এই উক্তির পক্ষে কিছু যুক্তি আছে ঠিকই, কিন্তু এটি সর্বাংশে সত্য নয়। পৃথিবীর কোথাও সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচারপতি নিয়োগ করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে আপাতদৃষ্টিতে পক্ষপাতদুষ্ট বিচারপতিরাও বিচারকের আসনে বসে স্বাধীন হয়ে যেতে পারেন। এ প্রসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি আর্ল ওয়ারেলের (Earl Warrel) অভিজ্ঞতা স্মরণ করে আকবর আলি খান বলেন, ওয়ারেল ছিলেন রক্ষণশীল রিপাবলিকান দলের সদস্য। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হওয়ার আগে তিনি রক্ষণশীল রিপাবলিকান দলের গভর্নররূপে ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে তিন মেয়াদে গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি উপরাষ্ট্রপতি পদের জন্য নির্বাচন করেন এবং হেরে যান। প্রেসিডেন্ট আইজেন আওয়ার যখন তাকে বিচারপতি নিয়োগ করেছিলেন, তখন ধরে নেয়া হয়েছিল, তিনি হবেন একজন রক্ষণশীল বিচারপতি। অথচ যে ১৬ বছর (১৯৫৩-৩৯ সাল) ওয়ারেল প্রধান বিচারপতি পদে ছিলেন, সেই ১৬ বছর মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে সবচেয়ে উদার আদালত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ওয়ারেলের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে নিযুক্ত বিচারপতিরা তাদের আগের ধ্যানধারণায় বন্দি হয়ে না-ও থাকতে পারেন, বিচারপতিদের ধ্যানধারণায় পরিবর্তন ঘটে। তাই যেটা নিশ্চিত করতে হবে সেটা হলো বিচারপতির যোগ্যতা। কিন্তু বিভিন্ন প্রশ্নে তার মতামত বিচারপতি হওয়ার পূর্ববিশ্বাসে অটল থাকবে, এ ধরনের ধারণা ভুল। তাই বিচারপতি নিয়োগে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া উচিত তাদের যোগ্যতার ওপর। বাংলাদেশে উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগে যোগ্যতা সঠিকভাবে যাচাই করা হয় কি না, সে সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে। দেখা গেছে যে, আইনের ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ আদালতে এক ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় এবং পরবর্তীকালে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ড. আকবর আলি খান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণে বেশ কিছু প্রস্তাবনা রেখেছেন।
১. সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রত্যেক বিচারক পদের জন্য তিনজন করে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে। সরকার এই তিনজন মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে থেকে একজনকে নির্বাচন করে জাতীয় সংসদের আইন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির কাছে সুপারিশ করবে। স্থায়ী কমিটি মনোনীত প্রার্থীর ওপর শুনানির ব্যবস্থা করবে। এই শুনানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, যদি বিরোধী দল এই শুনানিতে অংশগ্রহণ করে, তাহলে মনোনীত প্রার্থীর অযোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্নসমূহ শুনানিতে প্রকাশিত হবে। এর ফলে সরকার মনোনয়নের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করবে।
২. বর্তমানে হাইকোর্টে দুই ধরনের ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়: ১. বিচার বিভাগে কর্মরত জ্যেষ্ঠতম জেলা জজ এবং ২. সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনজীবী। শেষোক্ত ক্ষেত্রে আইনজীবীদের মধ্য থেকে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে কোনো বিধিনিষেধ নেই। এর ফলে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক অযোগ্য প্রার্থীও বিচারক নিযুক্ত হতে পারেন। নিম্নতম পর্যায়ে যারা কোর্টে বিচারক হিসেবে যোগ দেন, শুধু তাদের মধ্যে থেকেই সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ করলে বিচারকদের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র অনেক ধরনের আইনের বিশেষজ্ঞ থাকেন। এই ধরনের বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ করলে আদালত শক্তিশালী হতে পারে। উপরন্তু যারা মেধাবী আইনজীবী, তারা নিম্নতম পর্যায়ে বিচারক পদে নিয়োগ পেতে আগ্রহী হন না। বৃটিশ আমলে আইনজীবী ও নিম্নতম পর্যায়ে যোগদানকারী বিচারক ছাড়াও আরেকটি উৎস থেকে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ করা হতো। বৃটিশ আমলে অতিরিক্ত জেলা জজ পর্যায়ে আইনজীবীদের মধ্য থেকে সরাসরি নিয়োগ দেয়া হতো। তারা দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে অনেকেই হাইকোর্টে নিয়োগ লাভ করতেন। যেহেতু উচ্চতর পদে দ্রুত পদোন্নতির সুবিধাসহ নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল, সে জন্য উচ্চতর পদে দ্রুত পদোন্নতির সুবিধাসহ নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল, সে জন্য উচ্চতর ডিগ্রিধারী মেধাবী আইনজীবীরা এ পদে যোগ দিতেন। এ ধরনের নিয়োগ পদ্ধতি প্রবর্তন করলে সুপ্রিম কোর্টে আইনজ্ঞ নিয়োগের পরিমাণ কমানো যেতে পারে।
প্রস্তাবনার ইতি টেনে ড. আকবর আলি খান বলেছেন, শুধু বিচারপতি নিয়োগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই যথেষ্ট নয়, বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ করতে হবে। বর্তমানে সংসদের হাতে বিচারপতিদের অভিশংসনের যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তা প্রত্যাহার করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সেলের মাধ্যমে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান করা যেতে পারে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মো জাহিদ হাসান

২০১৭-১১-২৪ ২২:৩০:৩৯

সহমত স্যার

Akbar Ali

২০১৭-১১-২৫ ০৮:৪৫:৪৫

সকল কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সাধনের সবচেয়ে বর নিয়ামক হচ্ছে ন্যায়পরায়ণ শাসক।

M Haq

২০১৭-১১-২৪ ১৯:১২:৪৮

ভাবনা মমিনুল হক ছড়ায় কি আজ ছড়িয়ে দেবো একটু আলোর ছিটা মন মগজে আসবে ফিরে জীবন চলার Key টা। আধাঁরে মন বন্দী থেকে জীবনটা আর ক‘দিন টেকে স্বাধীনতার পাখনা মেলে ছাড়তে হবে ভিটা।

আপনার মতামত দিন

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা

বিছানায় তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেসুতের বড়ছেলের মৃতদেহ

গোয়া: যৌন ব্যবসায়ও আধার কার্ড

ট্রাম্প শিবিরের হাজার হাজার ইমেইল মুয়েলারের হাতে

পেট্রলবোমায় দুজন দগ্ধ

যেভাবে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হন আকায়েদ উল্লাহ

ঝন্টুর পেশা রাজনীতি

রিয়াল মাদ্রিদই চ্যাম্পিয়ন

‘জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা অবশ্যই বাতিল করতে হবে’

উড়ে গেল টটেনহ্যমও

ছায়েদুল হকের জানাজা সম্পন্ন

ভারতে 'ছয় মাসের মধ্যে' ধর্ষকদের ফাঁসির দাবি করলেন নারী অধিকারকর্মী

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিক পাচার চক্র, কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে ৬০০ কর্মকর্তা বদলি

জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে নোটিশ জারিতে ইন্টারপোলের অস্বীকৃতি

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ