সিরিয়ায় বিপর্যয়, অনাহারে শিশুরা

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ২৫ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার
সিরিয়ার ঘৌটা অঞ্চলের পূর্বাঞ্চলে প্রায়ই কোনো নারীকে তার অপুষ্টিতে ভোগা শিশুকে নিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে ঢুকতে দেখা যায়। কোনো কোনো শিশুর অবস্থা এমন যে, গায়ের হাড় আর চামড়া ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। সেখানকার এক চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসক আব্দেল হামিদ। এ রকম দৃশ্য তার কাছে খুব একটা বিরল নয়। তবে একদিন যখন, এক নারী তাকে বললেন যে, তার চার শিশুর কান্না থামাতে তাদের পত্রিকার কাগজ পানিতে ভিজিয়ে খাওয়াতে হয়েছে, তখন হামিদও তার কান্না ধরে রাখতে পারেন নি। রাতের বেলায় অনাহারে থাকা ওই শিশুদের চিৎকার দূর-দূরান্ত পর্যন্ত শোনা যায়।
আব্দেল হামিদ গার্ডিয়ানকে বলেন, আমরা যে পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছি তা আপনার কাছে বর্ণনা করতে গেলে আমার চোখ ফেটে কান্না আসবে। কিন্তু বাস্তবতা ওই বর্ণনার চেয়েও আরো জঘন্য।
ঘৌটার পূর্বাঞ্চলে বর্তমানে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের প্রতি অনুগত বাহিনীর অবরোধ বিদ্যমান। রাজধানী দামেস্কের পার্শ্ববর্তী এই অঞ্চলে ৪ লাখ মানুষের বসবাস। একসময় রাজধানীর সবচেয়ে ধনী ও সমপদশালী অঞ্চল ছিল এটি। কিন্তু সিরিয়ার ৬ বছরের যুদ্ধে একে অনেক নৃশংসতা সহ্য করতে হয়েছে। ২০১৩ সালে এই অঞ্চল দখলের চেষ্টায় সেখানে ‘সারিন’ (রাসায়নিক পদার্থ) হামলার শিকার হয়। এরপর থেকে সময় যত গড়িয়েছে, সেখানকার অবস্থার ততই অবনতি ঘটেছে। সিরিয়ায় কার্যরত অবরোধ সংক্রান্ত প্রজেক্ট সিজ ওয়াচ বলেছে, অঞ্চলটি প্রায় ধ্বংসের কাছাকাছি। জ্বালানির অভাবে এই শীত পার করা অনেকের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে। এ ছাড়া, বিমান হামলাতো চলছেই। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছে, শুধু এই (গত) সপ্তাহেই ১৮১ জন মানুষ হামলার শিকার হয়েছে। অঞ্চলটি বহু আগ থেকেই অবৈধ কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত। পাচারকারীদের বেশকিছু রাস্তা খোলা ছিল সেখানে। তবে এই বছরের এপ্রিলে অঞ্চলটিতে সরকারি বাহিনীর এক আক্রমণাত্মক অভিযানের পর সেখানে অবরোধ জোরদার করা হয়। ত্রাণকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি চরম পর্যায়ে বিরাজ করছে। ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যেসব খাবার পাওয়া যায়, সেগুলোর দাম আকাশচুম্বী। বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সরবরাহও সীমিত। এসবের মাঝেই চলছে বিমান হামলা ও শেলিং। আব্দেল হামিদ বলেন, আমাদের জীবনে ফ্রিজের কোনো অস্তিত্ব নেই। আসলে, বিদ্যুৎ লাগে এমন কোনো কিছুই আর ব্যবহার করা হয় না। এখনো যে এখানে কলেরার সংক্রমণ শুরু হয়নি এজন্যে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ।
তিন মাসে ত্রাণ পৌঁছেছে একবার

সিরিয়ার বিরোধী দল বর্তমানে ছত্রভঙ্গ অবস্থায় রয়েছে; আসাদের অনুগত বাহিনী মস্কো ও তেহরানের সহায়তায় তাদের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে; ইরাক ও লেবানন থেকে যাওয়া হাজার হাজার শিয়া মিলিশিয়া যোদ্ধারাও প্রায় জয়ের কাছাকাছি- সব মিলিয়ে প্রায় সমাপ্তির দিকে সিরিয়ার ছয় বছর ধরে চলা যুদ্ধ। এদিকে, ঘৌটার পূর্বাঞ্চল মূলত রাশিয়া, ইরান ও তুরস্কের মধ্যস্থতা করে দেয়া ‘ডি-এস্কাল্যাশন চুক্তির’ আওতায় থাকার কথা। এখানে কোনো প্রকার সংঘাত ঘটার কথা নয়। এখানে হামলা চলার কথা নয়। এই মাসের শুরুতে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, আসাদ সরকার যুদ্ধে ‘আত্মসমর্পণ কর নয়তো না খেয়ে মর’ এই কৌশল ব্যবহার করে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। বৃহসপতিবার সিরিয়ার বিরোধী দল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হওয়া শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনায় আসাদের কোনো ভূমিকাই মেনে নেবে না। তাদের এই অবস্থান জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের শান্তি চুক্তি বিষয়ক আলোচনায় আসাদের কোনো রাজনৈতিক সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দিয়েছে। কিন্তু, শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা অগ্রসর না হওয়া মানে হচ্ছে ঘৌটার পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়তেই থাকা। অঞ্চলটিতে আসাদ সরকারের দখল আর স্থানীয় বিদ্রোহী দলগুলোর মধ্যে চলমান যুদ্ধ সেখানে ত্রাণ সরবরাহ করার কাজ আরো কঠিন করে তুলেছে। গত তিন মাসের মধ্যে ১২ দিন আগে প্রথমবারের মতো অঞ্চলটির দৌমা শহরে রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্টের একটি যৌথ গাড়ি বহর পৌঁছেছে। আর সেই বহর মাত্র ২১ হাজার ৫০০ মানুষকে ত্রাণ দিতে সক্ষম হয়েছে। চিকিৎসক আর ত্রাণকর্মীরা বলছে, ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ওষুধের প্রচণ্ড অভাব। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের জন্য নিয়ম-মাফিক টিকার প্রয়োজন।
এক কেজি রুটির দাম ৪৬২ টাকা

সিরিয়া সংকট তীব্রভাবে বিশ্ববাসীর নজরে আসে অক্টোবর মাসে- যখন একটি এক মাসের শিশু অপুষ্টিতে ভুগে জীর্ণ শীর্ণ দেহ নিয়ে মারা যায়। শিশুটির মা নিজেও অপুষ্টিতে ভুগছিল। অবস্থা এতোই খারাপ ছিল যে, নিজের সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটিকে বুকের দুধ পর্যন্ত খাওয়াতে পারেনি। ঘৌটার পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের বেশিরভাগকেই দিন পার করতে হয়, অবিশুদ্ধ পানি খেয়ে। বেশিরভাগ পরিবার দিনে একবেলার বেশি খাবার জোগাড় করতে পারে না। সেখানে এক কেজি রুটির দাম এখন ৫.৫০ ডলার। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অফ রেডক্রসের মুখপাত্র ইঞ্জি সেডকি বলেন, ‘শুধু ঘৌটার পূর্বাঞ্চল হোক আর পুরো সিরিয়াই হোক, প্রবেশাধিকারে বাধা যে কোনো স্থানেই খুব দ্রুত মানবিক সংকটের সৃষ্টি করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এক গাড়ি বহরে যত পরিমাণ খাবারই নিয়ে যাই না কেন, তা সেখানকার মানুষের এক মাসের বেশি সময়ের যোগান হবে না। আর এজন্যেই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নিয়মিত প্রবেশাধিকার থাকা উচিত।’ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার জাইদ রা’দ আল হুসাইন গত মাসে ঘৌটার পূর্বাঞ্চলের অবরোধকে ‘জুলুম’ বলে বর্ণনা করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সিরিয়া প্রতিনিধি এলিজাবেথ হফ বলেন, ‘ঘৌটার পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি হৃদয়বিদারক। কয়েক মাস ধরে এখানের মানুষগুলো মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চনা, সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এখন এমন একটা সংকটময় পরিস্থিতিতে পৌঁছেছি যেখানে শিশুসহ হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা যদি অতি সত্বর চিকিৎসা সেবা না পায় তাহলে খুব সম্ভবত তারা মারা যাবে।’

[গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনের অনুবাদ]


এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা

বিছানায় তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেসুতের বড়ছেলের মৃতদেহ

গোয়া: যৌন ব্যবসায়ও আধার কার্ড

ট্রাম্প শিবিরের হাজার হাজার ইমেইল মুয়েলারের হাতে

পেট্রলবোমায় দুজন দগ্ধ

যেভাবে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হন আকায়েদ উল্লাহ

ঝন্টুর পেশা রাজনীতি

রিয়াল মাদ্রিদই চ্যাম্পিয়ন

‘জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা অবশ্যই বাতিল করতে হবে’

উড়ে গেল টটেনহ্যমও

ছায়েদুল হকের জানাজা সম্পন্ন

ভারতে 'ছয় মাসের মধ্যে' ধর্ষকদের ফাঁসির দাবি করলেন নারী অধিকারকর্মী

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিক পাচার চক্র, কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে ৬০০ কর্মকর্তা বদলি

জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে নোটিশ জারিতে ইন্টারপোলের অস্বীকৃতি

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ