তিনি আছেন থাকবেন

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫৭
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে একটি পদ আঁকড়ে আছেন প্রফেসর ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। ১৯৯৯ সাল থেকেই ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর মহাসচিব তিনি। ড্যাবের পাশাপাশি সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, প্রকৃচিসহ একাধিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পদ বছরের পর বছর ধরে তার কব্জায়। পেশাজীবী এ নেতা একই সঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় এলে জাদুরকাঠি হাতে পান তিনি। মেডিকেলখাতের লাভজনক সব পদ ছিল তার দখলে।
তিনিই ছিলেন স্বাস্থ্যখাতের অঘোষিত সর্বেসর্বা। কেবল পদ দখলই নয়, শেয়ার দেয়ার কথা বলে মানুষের টাকায় গড়ে তুলেছেন বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠানের শেয়ার যেমন কারও মেলেনি, সংগৃহিত অর্থও কাউকে ফিরিয়ে দেননি।
ড্যাব ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস পাস করা ডা. জাহিদ হোসেন  ৮০’র দশকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সঙ্গে সদস্য হিসেবে সক্রিয় ছিলেন রোটারি ক্লাবে। ১৯৯০ সালের ১২ই জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। যদিও সংগঠনটি ৬ই আগস্ট তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে। ড্যাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৯১ সালে ডা. জাহিদ এ সংগঠনের সদস্য হন। সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দ্রুতই সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। ১৯৯৮ সালে প্রফেসর ডা. এম এ হাদিকে আহ্বায়ক করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন হলে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান ডা. জাহিদ হোসেন। পরের বছর পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে তিনি হন মহাসচিব। প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সুপারিশে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পরামর্শ এড়িয়ে ডা. জাহিদকে মহাসচিব করে সে কমিটি পাস হয়েছিল। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৮ বছর। পদ্মা-যমুনায় বয়ে গেছে বহু জল। কিন্তু পরিবর্তন ঘটেনি ড্যাব মহাসচিবের নাম। ড্যাব সদস্যদের বিবেচনায় তিনি এখন পরিণত হয়েছে সংগঠনের গ্যাংরিনে। বিএনপি আমলে সিভিল সার্জনরা পর্যন্ত তার ভয়ে তটস্থ থাকতেন বিএমএ নির্বাচনে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, ড্যাবের ফেসবুক গ্রুপের সদস্য হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৎপরতা চালাচ্ছেন তিনি। বাস্তবে তাদের অনেকেই সংগঠনের প্রাথমিক সদস্যও নন। অন্যদিকে দেড় যুগ ধরে মহাসচিব পদে পরিবর্তন না আসায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন ড্যাবের অনেক যোগ্য নেতা। পেশাজীবী সংগঠনের পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতিতেও সক্রিয় চরিত্র ডা. জাহিদ হোসেন। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদ পান তিনি। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কাউন্সিলে পদোন্নতি পেয়ে হন ভাইস চেয়ারম্যান। পেশাজীবী সংগঠনের মহাসচিব পদটি তার কাছে এতই লোভনীয় যে অনেকেই টিপ্পনী কেটে বলেন, বিএনপির মহাসচিব হওয়াই তার চূড়ান্ত লক্ষ্য। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীকে জাতীয় নির্বাচনে লড়তে চান তিনি। নির্ধারিত আসন না থাকায় কখনো ময়মনসিংহ কখনো দিনাজপুরে প্রচারণা চালান তিনি। এ নিয়ে ময়মনসিংহ ও দিনাজপুর জেলা বিএনপির রাজনীতিতে তৈরি করেছেন কোন্দল। পেশাজীবী সংগঠন ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা হিসেবে দলের কমিটি গঠনসহ নানা কর্মকাণ্ডেও প্রভাব খাটান তিনি।
চিকিৎসক হিসেবে তিনি ছিলেন একজন সার্জন। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে জাদুর চেরাগ হাতে পান ডা. জাহিদ হোসেন। দেশের মেডিকেল সেক্টরে যতগুলো বড় পদ আছে তার বেশিরভাগই কব্জা করে নেন তিনি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ডিন, প্রকৌশলী-কৃষিবিদ-চিকিৎসক (প্রকৃচি)’র সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব, মেডিকেল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক, বিইপিসির সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ডিএমসি) ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের পদ সবই দখলে আসে তার। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইউরোলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট থেকে মাত্র তিন বছরে অনেকজনকে ডিঙিয়ে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হন ২০০৪ সালে। তার অল্প সময়ের মধ্যেই প্রফেসর ও বিভাগের চেয়ারম্যান ও প্রভাব খাটিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের দায়িত্বও পালন করেন। পদোন্নতিতে অভিজ্ঞতা বা প্রকাশনার কোনো বিধিই প্রতিবন্ধক হয়নি তার সামনে। এ ধরনের পদোন্নতি বৈধ করতেই সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ এসআরও জারির মাধ্যমে ‘ওয়ান টাইম রিলাক্সেশন’ নামে একটি নতুন অর্ডিন্যান্সও করা হয়। যে অধ্যাদেশটির সুবিধা নিয়েছে অনেকেই। পেশাজীবী ডাক্তারদের জাতীয় সংগঠন বিএমএর মহাসচিব হন দু’বার। সে সময় ৩৯টি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মুখ্যব্যক্তি ছিলেন তিনি। তিনি পরিণত হন দেশের মেডিকেল সেক্টরের একচ্ছত্র অধিপতি। তার অঙ্গুলি হেলনে চলত পুরো সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, কেনাকাটা সবকিছুতেই ছিল তার নিয়ন্ত্রণ। বিএনপির অনুগ্রহপ্রার্থী, সুযোগ সন্ধানী সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, উন্নয়ন বা কেনাকাটার দরপত্রে কাউকে সুবিধা পাইয়ে দেয়ার তদবির প্রার্থীদের ভিড় লেগে থাকতো তার ইস্কাটনের অফিসে। তার বিরুদ্ধে ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে দেশের আটটি মেডিকেল কলেজে পাঁচ বছরের পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্স (এমএস, এমডি ও এমফিল ডিগ্রি) চালুতে প্রভাব সৃষ্টি ও নিয়মনীতি না মেনেই অনুগতদের ওই কোর্সে ভর্তি করানোর অভিযোগও উঠেছিল সে সময়। জোট সরকার শেষদিকে বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে বিশ্ব ব্যাংকের টাকায় দুইশ’ অনুগত চিকিৎসককে প্রমোদ ভ্রমণে পাঠিয়েছিলেন তিনি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে তার বিরুদ্ধে উঠেছিল লটারি কেলেঙ্কারির অভিযোগ। ২০০৪ সালের প্রথমদিকে ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে লটারির আয়োজন করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে হাসপাতালের প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টিকিট কেনার নামে বিশেষ কমিশনের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ও পরে বিশেষ কৌশলে লটারির প্রথম পুরস্কারের ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। চারদলীয় সরকারের শেষদিকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার টেপিরবাড়ি গ্রামের ৯নং টেপিরবাড়ি মৌজায় মায়ের নামে দখল করেছিলেন ৩০ বিঘা জমি। পরে এ নিয়ে এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে তিনি জমিটি তার প্রতিষ্ঠান ডেল্টা ফার্মার নামে দলিল করে নেন।
কেবল পদ নয়, গড়ে তুলেন একের পর এক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ময়মনসিংহের ব্রাক্ষ্মপল্লী পাড়ায় বাবার সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ‘দেশ বাংলা ফাউন্ডেশনে’র ছাতায় এখনো চলছে ডা. জাহিদের কয়েকটি বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- দেশ বাংলা ফাউন্ডেশন, ডেলটা ফার্মা লিমিটেড, ডেলটা হেলথ কেয়ার, ডেলটা হারবাল লিমিটেড, ডেল্টা ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড ও ডেলটা লিমিটেড। ডা. জাহিদ হোসেন ও তার স্ত্রী রিফাত হোসেন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো গড়তেও তিনি আশ্রয় নিয়েছেন প্রতারণার। প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার দেয়ার কথা বলে বহু জনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। পরে কাউকে দেয়া হয়নি তার প্রতিষ্ঠানের শেয়ার। শেয়ার বিক্রির কথা বলে সংগৃহিত অর্থও ফেরত দেয়া হয়নি। ওয়ান ইলেভেনের পর মঈন-ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন জরুরি সরকারের আমলে দুর্নীতিবাজদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল সেখানে ওঠেছিল ডা. জাহিদ হোসেনের নাম। কর ফাঁকি দেয়ার জন্য কাগজপত্রে ভুয়া পেশা ও ঠিকানা পাল্টানোর অভিযোগও উঠে এসেছিল দুদকের অনুসন্ধানে। দুদকের মামলায় বেশকিছুদিন কারাভোগ করেছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে ১৩ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৩ বছরের কারাদণ্ডের রায় হলেও পরে উচ্চ আদালতের আদেশে এখন স্থগিত রয়েছে সে রায়।
ডা. জাহিদ হোসেনের চাঁদাবাজির হাতও বেশ লম্বা। স্পন্সরের নাম করে তিনি দেশের ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানিগুলোর কাছে চাঁদাবাজি করেন নিয়মিত। দলের ও পেশাজীবী সংগঠনের জন্য আদায় করেন মোটা অঙ্কের চাঁদা। সেই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ। ড্যাব সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবা দিতে বিএনপির পক্ষ থেকে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডা. জাহিদ হোসেন। ড্যাবের সহায়তায় দেয়া চিকিৎসা সেবা পরিচালনার নেতৃত্বও তার হাতে। এ সুযোগে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদাবাজি করছেন।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Md Ashraf Us Shalahi

২০১৭-১১-২২ ১১:৫৯:০৩

মিথ্যা দিয়ে কি স্বর্গ পাওয়া যায়। একজন আদর্শবান সৎমানুষ অধ‍্যাপক ডাঃ এ জেড এমন জাহিদ হোসেন। আল্লাহ সব ভাল জানেন।

kazi

২০১৭-১১-২০ ২০:৩০:৪৩

System and democracy less country. The position is democratic position.

kazi

২০১৭-১১-২০ ১৭:৩৮:০৪

Very important exploration of corruption. But while khaleda Zia is facing corruption cases why his case is stopped by court ?

MD Khalid mahmud

২০১৭-১১-২০ ১৫:০৪:৪৮

Rab কি ওরে চোখে দেখেনা ! ওর দল ক্ষমতায় নাই তাতেই এই অবস্থা ওর দল ক্ষমতায় আসলে কি হবে ?

আপনার মতামত দিন

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা

বিছানায় তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেসুতের বড়ছেলের মৃতদেহ

গোয়া: যৌন ব্যবসায়ও আধার কার্ড

ট্রাম্প শিবিরের হাজার হাজার ইমেইল মুয়েলারের হাতে

পেট্রলবোমায় দুজন দগ্ধ

যেভাবে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হন আকায়েদ উল্লাহ

ঝন্টুর পেশা রাজনীতি

রিয়াল মাদ্রিদই চ্যাম্পিয়ন

‘জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা অবশ্যই বাতিল করতে হবে’

উড়ে গেল টটেনহ্যমও

ছায়েদুল হকের জানাজা সম্পন্ন

ভারতে 'ছয় মাসের মধ্যে' ধর্ষকদের ফাঁসির দাবি করলেন নারী অধিকারকর্মী

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিক পাচার চক্র, কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে ৬০০ কর্মকর্তা বদলি

জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে নোটিশ জারিতে ইন্টারপোলের অস্বীকৃতি

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ