অ্যা জার্নি বাই রং এক্সপ্রেস!

চলতে ফিরতে

সিরাজুস সালেকিন | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার
রংপুর এক্সপ্রেসের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত
কয়টার ট্রেন কয়টায় আসবে সেটা এখন জানা কঠিন না। পাঁচ টাকা খরচ করে শুধু একটা এসএমএস করলেই ট্রেনের অবস্থান জানা সম্ভব। আর রংপুর এক্সপ্রেসের একটা আনঅফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ আছে যেখানে নিয়মিত ট্রেনের খবর পাওয়া যায়। অন্য কোনো ট্রেনের ক্ষেত্রে এই ধরণের সক্রিয় ফেসুবক পেজ আছে বলে মনে হয়না!
রংপুরের বাইরে আছি প্রায় এক দশক। প্রায় পঞ্চাশের ওপর জেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তবে ট্রেনে উঠেছি মাত্র হাতে গোনা কয়েকদিন। কেন জানি ট্রেন জার্নিকে এনজয় করতে পারিনা!
এবছর বাবা হজে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন ১৪ সেপ্টেম্বর। বাড়ির ‘ছোট ছেলে’ হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল তাকে ঢাকা থেকে রংপুরে পৌঁছে দেওয়া। সাধারণত বাবা বাসে যাতায়াত করলেও এবার ট্রেনে বাড়ি ফেরার ইচ্ছে পোষণ করলেন। তার ইচ্ছের কারণেই ১৬ সেপ্টেম্বরের এসি কেবিনের টিকেট সংগ্রহ করলাম। টিকেট কাটার সময় জানতে পারলাম ওই কেবিনটি ডাবল কেবিন যেখানে ৬ জনের বসার ব্যবস্থা আছে। যাত্রার দুইদিন আগে থেকে রংপুর এক্সপ্রেসের ফেসবুক পেজে নজর রাখছিলাম। প্রতিদিনই প্রায় গড়ে ৫ ঘন্টা বিলম্বে যাতায়াত করছিল ট্রেনটি। সাধারণত সকাল ৯টায় ট্রেনটি কমলাপুর থেকে যাত্রা শুরু করে। যাত্রার দিন সকালে কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার সীতাংশু দাদাকে ফোন করলাম। দাদা জানালেন দুপুর ১টার দিকে ট্রেন ছাড়ার সম্ভাবনা আছে। বাবা-মায়ের অস্থিরতার কারণে ১১ টায় স্টেশনে চলে গেলাম। স্টেশনে নেমেই ‘উবারে’ ভাড়া পরিশোধ করলাম ৩০০ টাকা। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে স্টেশনের গেইট থেকে ৬ নম্বর প্লাটফর্ম পর্যন্ত কুলিকে দিতে হয়েছে দুই দফায় দুইশো টাকা। এতো বড় একটা রেল স্টেশন অথচ যাত্রীদের মালামাল পরিবহনের জন্য কোনো ট্রলি নেই। ট্রলি নিয়ন্ত্রণ করে কুলির সিন্ডিকেট! হয়তো বা কুলি সম্প্রদায়কে বাঁচিয়ে রাখতে একটি সিন্ডিকেট ‘মানবিক’ কাজ করে যাচ্ছে। যাই হোক অপেক্ষা করতে হবে প্রায় দুই থেকে তিন ঘন্টা। বসার জায়গা নেই। বাবা, মা ও আমার এক স্যারকে স্টেশন ম্যানেজারের রুমে বসিয়ে আমি বাইরে ব্যাগ পাহারা দিতে লাগলাম। পৌনে একটার দিকে ট্রেন কমলাপুরে প্রবেশ করল। এরপর গেল ওয়াশপিটে। আমাদের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হতে লাগল।
পৌনে দুইটার সময় ট্রেন ৬ নম্বর প্লাটফর্মে ইন করল। এক্সটেনশন ১ বগির সেই বার্থ ১,২-এ উঠলাম। প্রথমে ধারণা করেছিলাম ডাবল বার্থ মানে হয়তো শোবার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ৬ জনের জন্য মাত্র দুটো সোফা! এত সংকীর্ণ জায়গা যে ছয়জনের ছয়টি ট্রলি ব্যাগ রাখলে সেখানে আর কেউ বসার মতো অবস্থা থাকবে না। অর্থাৎ সেখানে ৬ জন ভ্রমণ করতে হলে ব্যাগ ছাড়াই উঠতে হবে।  কেবিনে ওঠার পর শুরু হলো উষ্ণ অভিবাদন! ট্রেন না ছাড়লে এসি ছাড়বে না। যে পনের মিনিট ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষায় ছিলাম মনে হয়ে দুনিয়াতেই দোযখের হাওয়া লেগেছে। বাথরুমের সঙ্গে কেবিনটি হওয়ায় প্রস্রাবের দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সঙ্গে থাকা বডি স্প্রে দিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। ঠিক দুইটায় ট্রেন ছাড়ল। মনে হলো এবার বুঝি শান্তি মিলবে। কিন্তু শান্তি তো দূরের কথা। কেবিনের ভেতর থাকাই দায় হয়ে গেল।
একটু পর পর কেবিনের দরজায় এসে টোকা। ভেতরে লোক আছে কিনা দেখার চেষ্টা! সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনের এসির মাত্রাও বাড়তে শুরু করল। এক পর্যায়ে ভেতরে টেকা মুশকিল হয়ে পড়ল। ট্রেনে পরিচর্যক বলে কিছু লোক থাকে বলে জানতাম। ট্রেন ছাড়ার আগে তাদের কয়েকজনকে বগির ভেতর ঘোরা ফেরা করতে দেখেছি। দুঃখের বিষয় তাদের চেহারা একটিবারের জন্য দেখলাম না। টিকেট চেক করতে টিটিই আসলেন। তাদের বললাম আমাদের কম্বল দরকার। কিভাবে পেতে পারি। তারা জানালেন খাবারের গাড়ির লোকজনের কাছে টাকা দিলে কম্বল পাওয়া যাবে। ট্রেনের পক্ষ থেকে কম্বলের সুবিধা নেই। খাবারের গাড়ির অবস্থান জানতে চাইলে তারা জানালেন, ডানে দশ বগি ও বামে ছয় বগি পরে খাবারেরর গাড়ি। বঙ্গবন্ধু সেতু পাওয়ার আগে খাবারের গাড়ির কোনো লোক আসবেন না। এদিকে ঠান্ডার কারণে আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। ব্যাগে থাকা চাদর দিয়ে তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। মাঝপথে এসে কেবিনের অবস্থা এমন হলো যে সেটা ডিপ ফ্রিজের মতো ঠা-া হয়ে গেল! বাড়তি কাপড়চোপড় দিয়ে আমরা শরীর গরম রাখার চেষ্টা করলাম। ইতিমধ্যে ফোনের ব্যাটারি ফুরিয়ে যেতে শুরু করেছে। কেবিনে খুঁজে দেখলাম ফোন চার্জের কোনো ব্যবস্থা নেই।
ট্রেন বঙ্গবন্ধু সেতুর কাছে আসতেই এক বিব্রতকর ঘটনার সাক্ষী হলাম। দুই তরুণী, তাদের মা ও ভাই আমাদের পাশের কেবিনে ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন কেবিনের পাশের টয়লেট ব্যবহার করেছিলেন যেখানে পানি ছিল না! ভেতর থেকে ‘মা’কে ডাকতে থাকলেন এক তরুণী। ‘মা’ বাইরেই ছিলেন। তিনি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়লেন। আমি বললাম ‘‘আন্টি বোতলে করে বেসিনের পানি ভেতরে পাঠান’। তখন উনি কেবিন থেকে বোতল এনে পানি দিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করলেন। মাঝপথে রাত আটটার দিকে ঘটল আরেক বিপত্তি। কেবিনের ভেতরে আবার গন্ধ! এবার মানুষের মলের গন্ধ। এতো খারাপ পরিস্থিতিতে কখনও পড়িনি। মনে হচ্ছে এসির ভেতর দিয়ে গন্ধটা আসছে। কেবিনের দরজা খুলে আর বডি স্প্রে দিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম।
ট্রেন চলতে চলতে যখন গাইবান্ধা পৌঁছল তখন শুরু হলো আবার কেবিনের দরজায় টোকা। ভেতরে কেউ আছে কিনা দেখতে চায়। পাঁচ ঘন্টার ওপর বিলম্ব থাকার কারণে ঢাকামুখী যাত্রীরা অপেক্ষা করছিলেন কখন ট্রেন আসবে। তারাই মূলত রংপুরগামী ট্রেনে উঠে পরে। এরপর একের পর এক লোক উঠে আর কেবিনে টোকা দিতে থাকে। অবশেষে রাত পৌনে একটার দিকে রংপুর পৌঁছল রংপুুর এক্সপ্রেস। দীর্ঘ এ জার্নিতে যে অভিজ্ঞতা হলো তাতে ভবিষ্যতে ট্রেনে উঠব কিনা সেটা ভাবছিলাম। কিন্তু রিটার্ন টিকেট আগেই কেটে রাখায় ওই ট্রেনের এসি চেয়ার ‘সিন্ধা’তে করে ঢাকায় ফিরতে হয়েছে। সেখানে হলো আরেক অভিজ্ঞতা। রংপুর এক্সপ্রেসের ভ্রমণ কখই আরামদায়ক মনে হয়নি। বর্তমানে রেলের অনেক উন্নয়নের কথা শুনি। রেলের ‘কালো বিড়ালের’ কথাও শুনেছি। এই ‘অদৃশ্য’ সিন্ডিকেট কেন রেলকে টার্গেট করেছে তা ওইদিন টের পেলাম।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

৮৫ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণসহ ভারতীয় নাগরিক আটক

যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ!

নবজাতকের মৃত্যু, উত্তেজনা

মিয়ানমারের অনুরোধে খবর গোপন করেছিল জাতিসংঘ

তিন দিন ধীরগতি থাকবে ইন্টারনেটে

সন্তানকে ফিরে পেতে বাবা-মায়ের আকুতি

‘সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে রোহিঙ্গা, তিস্তা ইস্যু থাকবে’

কে এই কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হরি?

রোহিঙ্গাদের জন্য ৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার সংগ্রহে ডোনার কনফারেন্স করবেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা

ইউপি চেয়ারম্যান ও আ’লীগের নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা

‘ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে সিদ্ধান্তের অধিকার সবারই আছে’

ঢাকায় আসছেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো

আবারো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র-ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান

কুয়েতে এসি বিস্ফোরণে মৌলভীবাজারের একই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যু

৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন

যুদ্ধ নয় আলোচনায় সমাধান