নৌকার মাঝি থেকে সার সমিতির সভাপতি

দেশ বিদেশ

জাবেদ রহিম বিজন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে নির্মাণাধীন ফিলিং স্টেশনের ছাদ ধসে হতাহতের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। জেলা প্রশাসকের কাছে গত ১০ই সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। ঘটনার একদিন পর ২৯শে আগস্ট থেকে কাজ শুরু করে ৫ সদস্যের এ তদন্ত কমিটি। ৫ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে তদন্ত। ৬ পৃষ্ঠার এই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিং স্টেশনটির মালিক সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে ফিলিং স্টেশনের জন্য সড়কের জমি ব্যবহার করতে ১০ বছরের ইজারা নেন ২০০৭ সালে। কিন্তু নির্মাণ কাজ শুরু করেন প্রায় দশবছর পর ২০১৭ সালে। ২০০৬ সালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ফিলিং স্টেশন স্থাপনের জন্য শর্তসাপেক্ষে অনাপত্তি প্রদান করা হয়। তাতে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে কাজ শুরু করার শর্ত দেয়া হয়। এক্ষেত্রে তিনি প্রায় ১১ বছর পর কাজ শুরু করেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রায় ১৮ ফুট উচ্চতার ছাদে পোকা ধরা চিকন বাঁশ দিয়ে দুর্বল সেন্টারিং ও শাটারিং দেয়ায় এবং পর্যাপ্ত পিলার না দেয়ায় ছাদটি ধসে পড়ে। ২৮শে আগস্ট দুপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন বাহাদুরপুর এলাকায় সায়েরা ফিলিং স্টেশনের সামনের ছাউনির ছাদ ঢালাইয়ের পরপরই তা ধসে পড়ে। এর নিচে চাপা পড়ে মারা যায় ৪ নির্মাণ শ্রমিক। তারা হলেন সরাইলের তেরাকান্দার মো. মিজান মিয়া (৩৫), আশুগঞ্জের যাত্রাপুরের মো. নাজমুল (২০) ও  দুলাল মিয়া (৫০), সদর উপজেলার সাদেকপুরের আবু সায়েদ (৪০)। আহত হয় আরো ৩ শ্রমিক মো. শিপন মিয়া (২২),  মো. রিপন মিয়া (২৫) ও মো. হানিফ মিয়া (৩২)। আহতের মধ্যে মো. শিপন মিয়া ও মো. রিপন মিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেন এবং মো. হানিফ মিয়াকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তার আঘাতের চিকিৎসা না থাকায় বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়। বর্তমানে সে কথা বলতে পারছেন না।
তদন্ত প্রতিবেদনে ফিলিং স্টেশনটির মালিক জালাল উদ্দিনের উত্থান কাহিনীও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়, জালাল উদ্দিন ১৯৮৮ সালে নৌকার মাঝি ছিলেন। এরপর ১৯৯০ সালে খোলা বাজারে সার বিক্রি করতেন। ১৯৯৬ সালে সারের ডিলার নিযুক্ত হয়ে বিভিন্ন জেলার ডিলারদের কাছ থেকে এলাকার প্রভাব খাটিয়ে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেন। তিনি জেলা সার ডিলার সমিতির (বিএফএ) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমান প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি। তার তিতাস ব্রিকফিল্ড নামে একটি ব্রিকফিল্ডও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয় গত ১২ বছর আগে আশুগঞ্জ বাজারে জালাল তার মালিকানাধীন জমিতে ভবন নির্মাণকালে তিনজন নির্মাণ শ্রমিক মারা যান। কিন্তু তিনি মৃত শ্রমিকদের পরিবারবর্গকে কোনো ক্ষতিপূরণ প্রদান করেননি। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ব্যবসা বাণিজ্যে অনিয়ম করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। তার এই ফিলিং স্টেশন নির্মাণ কাজটিও একটি বড় ধরনের অনিয়ম। ফিলিং স্টেশনটির মালিক জালাল উদ্দিন প্রায় দেড় মাস আগে এই নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ভিকটিম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তারা এই কাজের সাইটে কোনো ঠিকাদার বা কোনো প্রকৌশলীকে কোনোদিন দেখেননি। মালিক নিজেই প্রতিদিন উপস্থিত থেকে কাজটি শ্রমিকদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে আসছিলেন। আহত একজন ভিকটিমের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বর্ণিত ফিলিং স্টেশনটির মালিক জালাল উদ্দিন ছাদ ঢালাইয়ের কাজে লোহা ও রড যাতে কম ব্যবহার হয় সেজন্য উপস্থিত থেকে সবসময় নির্দেশনা দিতেন। ফিলিং স্টেশনটির ছাদের কাছ ঘেঁষেই উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বৈদ্যুতিক লাইন রয়েছে এবং এই দুর্র্ঘটনার ২/৩ দিন পূর্বে ফিলিং স্টেশনের ছাদের রডের কাজ করতে গিয়ে নির্মাণ শ্রমিকদের একজন মো. আলমগীর (৪৫) বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, কোনো অনুমোদিত নকশা, ডিজাইন ও পরিকল্পনা ছাড়াই  জালাল উদ্দিন  ফিলিং স্টেশনটির নির্মাণ কাজ পরিচালনা করে আসছিলেন। অর্থলোভী মনোভাবের দরুন নির্মাণ ব্যয় সংকোচন করতে গিয়ে জালাল উদ্দিন কর্তৃক নিম্নমানের নির্মাণ পণ্য, যথাযথ পরিমাণের চেয়ে কম পরিমাণ রড ব্যবহার এবং ছাদের পিলারের সংখ্যা, সাইজ ও আকৃতিতে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করা হয়। ফলে এই হতাহতের ঘটনাটি জালাল উদ্দিন কর্তৃকই সংঘটিত। ৫ সদস্যের এই তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. মোহাম্মদ শাহানুর আলম, সদস্য সচিব আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আমিরুল কায়সার, সদস্যরা হচ্ছেন গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম ভূইয়া, এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুজ্জামান, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল উপ-সহকারী পরিচালক মো. শারফুল আহ্‌সান ভূঞা। ঘটনার পর ফিলিং স্টেশনটির মালিক জালাল মিয়া (৫০) ও তার ছেলে অপু মিয়া (২৪)কে আসামি করে ৩০শে আগস্ট আশুগঞ্জ থানায় মামলা হয়। তবে এ দু-জনের কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মামলা করার দু’দিন পরই আপসের প্রস্তাব নিয়ে যাত্রাপুর গ্রামে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন চর-চারতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা জিয়া উদ্দিন খন্দকার ও ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি বাবুল সরকার ও জহির নামের একজনসহ ৪ জন। তারা বেশি দেরি না করে তাড়াতাড়ি ঘটনার মীমাংসায় আসতে বলেন ৪ হত্যা মামলার বাদী নিহত নাজমুলের ভাই জিয়াউদ্দিনকে। এই ধরনের বিষয় স্থানীয়ভাবে আপস মীমাংসা হলে ভবিষ্যতে আরো দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।


 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

৮৫ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণসহ ভারতীয় নাগরিক আটক

যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ!

নবজাতকের মৃত্যু, উত্তেজনা

মিয়ানমারের অনুরোধে খবর গোপন করেছিল জাতিসংঘ

তিন দিন ধীরগতি থাকবে ইন্টারনেটে

সন্তানকে ফিরে পেতে বাবা-মায়ের আকুতি

‘সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে রোহিঙ্গা, তিস্তা ইস্যু থাকবে’

কে এই কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হরি?

রোহিঙ্গাদের জন্য ৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার সংগ্রহে ডোনার কনফারেন্স করবেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা

ইউপি চেয়ারম্যান ও আ’লীগের নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা

‘ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে সিদ্ধান্তের অধিকার সবারই আছে’

ঢাকায় আসছেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো

আবারো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র-ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান

কুয়েতে এসি বিস্ফোরণে মৌলভীবাজারের একই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যু

৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন

যুদ্ধ নয় আলোচনায় সমাধান