রোহিঙ্গাদের ত্রাণ নিয়ে নয় ছয়

প্রথম পাতা

মহিউদ্দিন অদুল, টেকনাফের নয়াপাড়া থেকে | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪৭
মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে লুটের কবলে রোহিঙ্গারা। অসহায় ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গাদের প্রতি সদয় স্থানীয় হৃদয়বানরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বিতরণ করছে ত্রাণ। স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত ও বখাটেরা লুট করছে সেই ত্রাণ। অসহায় রোহিঙ্গাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ও মারধর করে নিয়ে যাচ্ছে ত্রাণ সামগ্রী। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থলে পরিণত উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে এমন নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার অভাবে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পের ই-ব্লকের কাছেই আশ্রয় নিয়েছেন উম্মে ছলি ও হাবিবুর রহমানের পরিবার। সঙ্গে তাদের ছেলে-মেয়ে। এক দু’বছরের ব্যবধানে তাদের সবাই শিশু। সাজানো সংসার ছিল মংডুর উদংয়ে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কোনো মতে প্রাণ বাঁচিয়ে গত ৩১শে আগস্ট বাংলাদেশে ঢুকেন পরিবার নিয়ে। এরপর আশ্রয়ের খোঁজে যান টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে। ক্যাম্পের পাশেই কোনো মতে পলিথিন জোগাড় করে মাথার উপর ছায়া দিয়েছেন। খেয়ে না খেয়ে কাটিয়েছেন প্রায় দু’সপ্তাহ। দু’দিন আগে তাদের একটি কার্ড দিয়েছে বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির সেবাকর্মীরা। সেই কার্ড দিয়ে গত মঙ্গলবার কিছু বিস্কুট ও ২৫ কেজি ওজনের একটি চালের বস্তা ছাড়িয়েছেন। তাতে খুশি ছলি ও হাবিব। অসহায় পরিবারটির সেই খুশি লুট হলো মঙ্গলবার মধ্য রাতের আঁধারে। রাত ১২টার দিকে স্থানীয় দুই ব্যক্তি তাদের ঝুপড়ির কাছে যায়। তারপর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলে আমরা তোমাদের ত্রাণ হিসেবে টাকা দিতে এসেছি। দরজা খোলো। সরল বিশ্বাসে দরজা খোলেন তারা। এরপর তাদের ঘরে মূল্যবান জিনিস খুঁজতে শুরু করে। কিছু না পেয়ে চালের বস্তাটি নিয়ে নেয়। তখন ছলি টাকা দিতে এসে চাল নিয়ে যাচ্ছে কেন জানতে চাইলে একজন ছুরি বের করে হুমকি দেয়। ভিন দেশে ত্রাণ লুটে আর বাধা দেয়ার সাহস পায়নি তারা। উম্মে ছলি দু’চোখ মুছতে মুছতে মানবজমিনকে বলেন, সব কিছু হারিয়ে ওই চাল পেয়ে সবাই খুশি হয়েছিলাম। ভেবে ছিলাম অন্তত কয়েক দিন আর না খেয়ে থাকতে হবে না। কিন্তু স্থানীয়রা এসে আমাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিলো। আমরা তো কিছুই চিনি না। কার কাছে বিচার চাইবো।
একই এলাকায় আশ্রয় নেয়া মংডুর গদুছড়া থেকে আসা তৈয়বা ও তার স্বামী আইয়ুবকে বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির দেয়া রেশন কার্ডটিই লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। ওই কার্ডে তারা বিস্কুট পেয়েছিলেন। পরের বার ২৫ কেজি চালের জন্য গেলে গত ৯ই সেপ্টেম্বর স্থানীয় ব্যক্তি তৈয়বার কাছ থেকে কার্ডটি কেড়ে নেয়। এরপর সেই চাল ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে।
তৈয়বা এই কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন দু’সপ্তা অনাহার-অর্ধাহারে থাকার পর কার্ডটি নিয়ে আশায় বুক বেধেছিলাম। এখন তিন বছরের মুন্নি ও চার বছরের খাদিজাসহ ৬ ছেলে- মেয়ে নিয়ে না খেয়ে আছি।
২৯শে আগস্ট বাংলাদেশে আসেন মংডুর হাসসুরাতার আবদুর রহমানের ছেলে জাহির হোসেন। তিনিও নয়াপাড়া ক্যাম্পের কাছে আশ্রয় নেন। দু’দিন আগে একটি কার্ড পান। গতকাল সেই কার্ড দিয়ে চাল ছাড়াতে নির্ধারিত স্থানে যান। ইতিপূর্বে বাংলাদেশে আসা এক ব্যক্তি চেক করবে বলে তার কার্ডটি ছিনিয়ে নেয়।
সর্বস্ব হারিয়ে গত ১০ দিন আগে আসেন এবং পাঁচদিন আগে একটি কার্ড পান আজম উল্লাহ। একইভাবে তার স্ত্রী মমতাজের কাছ থেকে কার্ডটি ছিনিয়ে নেন আগে আসা অপর রোহিঙ্গা। মমতাজ বলেন, আগে আসা এক রোহিঙ্গা আমাকে বলে যে এক কার্ডের নম্বর ঠিক নেই। হিসাব করে দেখতে হবে। এদিকে দাও। তার থেকে ছোঁ মেরে কার্ড নিয়ে সরে পড়ে।
অপর কিশোরী জানালেন, তার সম্ভ্রম লুটের অপচেষ্টার কথা। তিনি বলেন মঙ্গলবার দিবাগত রাতে আমি পাশে স্থানীয় একটি টয়লেটে প্রাকৃতিক কাজ সারতে যাই। অন্যজনকে সঙ্গে নিই। সে অবস্থায় দু’লোক সেখানে আসে। তারা টর্চের আলো ফেলে। আমি বেরিয়ে আসি। এরপর ওই লোক আমার সম্ভ্রম লুটের চেষ্টা চালায়। আমি সরে একটি ঘরের কাছে ঘেঁষলে ওই লোক আমার নাকফুল-কান ফুল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। তাদের একজনের হাতে ছুরি ও অন্যজনের হাতে লাঠি ছিল। আমি চিৎকার দিলে তারা পালায়।
সোমবার উখিয়ার পালংখালী বাজারের কাছে রাস্তার পাশে বিভিন্ন ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে ত্রাণ দিচ্ছিল। সেখানে অপেক্ষায় ছিল ৭টি রোহিঙ্গা পরিবার। তখন দেখা যায় স্থানীয় বোরকা পরিহিত তিন নারী ও কয়েক শিশু সেখানে হাজির। ট্রাক থেকে মুড়ি ও চিড়ার প্যাকেট ফেলতেই রোহিঙ্গাদের আগে তারা ছিনিয়ে নিলো পাঁচ প্যাকেট। তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা সরে পড়ে।
সেখানে প্রতিযোগিতা করে ত্রাণ না পাওয়া মংডুর বলিবাজার এলাকার চিনগিরি পাড়ার বাসিন্দা আছুমা বেগম ও ছাবেকুন নাহার বলেন আগের দিন মঙ্গলবারও তারা এসে আমাদের ত্রাণ নিয়ে গেছে। আমাদের গালিগালাজ করে শাসিয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় নানাভাবে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ লুটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশি নাগরিক হোয়াইক্যংয়ের লম্বাবিল এলাকার আইসক্রিম বিক্রেতা কক্সবাজারের ঈদগাহর বাসিন্দা আব্দুল্লাহও এমন এক লুটের সাক্ষী বলে জানান। তিনি বলেন, স্থানীয় দু’ব্যক্তি এক রোহিঙ্গা পরিবার থেকে তাদের ত্রাণ ও সম্পদ লুট করেছে। এভাবে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ লুটের ঘটনা ঘটছে।
শুধু ত্রাণ নয়। মিয়ানমারের সেনা ও বৌদ্ধদের নির্বিচার গুলি, আগুন বোমা এবং দা-কিরিচের কোপ থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে বাংলাদেশে আসার পথে পথে লুটের শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গারা। মঙ্গলবার রাতে নাফ নদ পার হওয়ার সময় নৌকাটি ডুবিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠে। বিত্তশালী পরিবারের স্বর্ণালংকার ও টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেয়ার জন্যই বাংলাদেশের এক লোভী মাঝি এই জঘন্য কাজ করেছে বলে জানা যাচ্ছে। এতে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংডিয়া থেকে আসা ষাটোর্ধ্ব তাজুল মুল্লুক বলেন, শাহ পরীর দ্বীপে আসার পর দুই লোক আমার শার্টের কলার ধরে ছুরি মারার ভয় দেখিয়ে মিয়ানমারের ১৬ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। হাসসুরাতার কানফুপাড়ার বাসিন্দা হাশিম উল্লাহ বলেন, আমার ৪টা ইঞ্জিন চালিত ফিশিং বোট ছিল। দু’টা নিয়ে আসতে সক্ষম হই। সেন্টমার্টিনের এক লোক কিছুক্ষণের জন্য বলে জোর করে নিয়ে গেছে।
মিয়ানমারের গারতি বিল থেকে আসা ইউনুছ বলেন, আমার ভাই গত ৮ই সেপ্টেম্বর রফিক ঘুমধুমের তুম্বরু দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেন। এরপর মিয়ানমারের টাকা ভাঙ্গিয়ে বাংলাদেশি ৫ হাজার টাকা হাতে নেয়। কিছুটা আসতেই দুই লোক তাকে মারধর করে আহত করে। টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। গত কয়েকদিনে অনেক রোহিঙ্গাই বাংলাদেশে আসার পথে তাদের স্বর্ণালংকার টাকা গরুসহ শেষ সম্বল লুটে নিয়েছেন। আর এখন ত্রাণও লুট হচ্ছে। তা বন্ধ না হলে এখানেও তাদের না খেয়ে থাকতে হবে বলে আর্তি জানান অন্তত অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা।
টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক মানবজমিনকে বলেন, নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা সতর্ক। কিছু লোক হয়তো সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সুযোগ পেলেই লুট করে। আমরা লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবো। আর ত্রাণ বিতরণে কিছু অব্যবস্থাপনাও রয়েছে।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

saifulislam

২০১৭-০৯-১৪ ০৮:৩৭:৩২

নিরাপত্তা বাড়ানো হোক তাদের জন্য...

sharif zahid

২০১৭-০৯-১৪ ০১:০৮:১৪

এব্যাপারে সরকারের কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সাথে সাথে গোয়েন্দা নজর বাড়িয়ে দুস্কৃত কারিদের ধরে শাস্তি দিতে হবে সাথে সাথে। তাহলে এ ধরনের ঘটনা আর হবে না।

foysal bin nesar

২০১৭-০৯-১৩ ২০:৪২:১৫

অসহায় মাজলুম রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে সেখানে সেনাবাহিনী নিয়োগ করতে হবে। যাতে এ অসহায়দের উপর দ্বিতীয়বার আর জুলুম না করা হয়। (মাক্কাতুল মোকাররামা,সৌদিআরব) থেকে

sak

২০১৭-০৯-১৩ ২০:৩৮:৩৬

১৯৭০ এর ভোলা সাইক্লনের পর সরকার ত্রান সামগ্রী নিয়ে এ রকম করেছিল।

আপনার মতামত দিন