রোহিঙ্গাদের কষ্ট দেখে আপ্লুত প্রধানমন্ত্রী

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার, উখিয়া, কক্সবাজার থেকে | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪৯
মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর বর্বর নির্যাতনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বিপন্ন রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা তাদের দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাবো। গতকাল কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারী শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের মুখে মিয়ানমার বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। এ সময় ছোট বোন শেখ রেহানা তার পাশে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দিয়ে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নেপিডো’র সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায় তবে কোন অন্যায়-অবিচার সহ্য করবে না। এই ব্যাপারে আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
শরণার্থীদের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী রাখাইন সম্প্রদায়ের জনগণের প্রতি অত্যাচার বন্ধ এবং বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের শরণার্থীদের দেশে ফেরত নিয়ে যাবার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মিয়ানমারের শরণার্থীদের পাশে রয়েছি এবং তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাবো, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের দেশে ফিরছে আমরা পাশে রয়েছি। মিয়ানমারের শরণার্থীদের দুরবস্থা দেখার পর অন্তরের অন্তস্তলে গভীর দুঃখ অনুভব করছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারাও মানুষ এবং মানুষ হিসেবেই তাদের বাঁচার অধিকার রয়েছে। তারা কেন এত দুঃখ কষ্ট ভোগ করবে? তিনি বলেন, এই নিরীহ রাখাইন সম্প্রদায়ের ওপরে অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধে এবং বাংলাদেশ থেকে তাদের নিজের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ প্রয়োগ করা উচিত। তিনি বলেন, এই রাখাইন সম্প্রদায়কে তাদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করার মিয়ানমারের কোনো অধিকার নেই। তাদের মিয়ানমার সরকারের নিরাপত্তা দিতে হবে। যাতে নিজেদের দেশে তারা নিরাপদে বসবাস করতে পারে। এই বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে সবধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিন্তু আগে তাদের এই রাখাইন জনগণের প্রতি অন্যায়-অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। সরকার প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং জরুরি সেবা শরণার্থীদের জন্য অব্যাহত রাখবে, তাতে কোনো সমস্যা হবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে যদি সকলের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা সরকার বিধান করতে পারে সেক্ষেত্রে মিয়ানমারের শরণার্থীদেরও কোনো সমস্যা হবে না। এই বার্তাও প্রধানমন্ত্রী আগত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে দেন- এইখানে কোন স্বার্থান্বেষী মহল যদি ফায়দা লোটার চেষ্টা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুতরাং বিচ্ছিন্নভাবে হলেও কেউ যেন এ ধরনের কোনো অপচেষ্টার সঙ্গে লিপ্ত না হন। সে ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করে দেন। এলাকাবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এসব আশ্রিত জনগণের সঙ্গে কোনো অস্থির বা অমানবিক আচরণ করা যাবে না। সহনশীলতার সঙ্গে এবং মানবতার সঙ্গে যেন তারা এসব মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা বিবেচনা করেন।
অনুষ্ঠানে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, হুইপ ইকবালুর রহিম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মুহম্মদ শফিউল হক এবং শেখ রেহানার পুত্রবধূ এবং সিনিয়র আইএমও কর্মকর্তা পেপী সিদ্দিকসহ স্থানীয় সাংসদ এবং জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এক দেশের নাগরিকদের অন্য দেশে আশ্রয় গ্রহণ সেই দেশের জন্যই অসম্মানজনক আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের নাগরিকদের তাদের দেশে ফেরত নেয়ার জন্য আহ্বান জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি আমাদের দেশের একদা সৃষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে যে রিফিউজি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, তারও উল্লেখ করেন। তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার সমাধান এবং ভারত থেকে ৬৪ হাজার শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনারও উদাহরণ দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে সৃষ্ট সংঘাত প্রসঙ্গে বলেন, বারবার আমরা দেখতে পাচ্ছি কিছু মানুষ কোনো কোনো জায়গায় এক একটা ঘটনা ঘটায়। তারাতো ঘটনা ঘটিয়েই চলে যায়। আর ভুক্তভোগী হতে হয় ছোট্ট শিশু, নারী আর সাধারণ মানুষজনদের। তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকারকে আমি বলবো, তারা যেন এই নিরীহ মানুষগুলোর ওপর কোনোরকম নির্যাতন না করে। এগুলো যেন তারা বন্ধ করে প্রকৃত দোষী যারা তাদের খুঁজে বের করে। আর এটি করার জন্য আমরা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যা যা সাহায্যের দরকার তা করবো। প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রশ্নে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পুনরুল্লেখ করে বলেন, আমাদের একটা সিদ্ধান্ত যে কোনোরকমের সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ কোনো কিছুই আমরা কখনো মেনে নেবো না। বা আমাদের মাটি ব্যবহার করে কেউ সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদী কাজ করবে তাও আমরা কখনো বরদাশত করবো না। তিনি বলেন, আজকে হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়া হয়ে চলে এসেছে। সেখানে (মিয়ানমারে) এখনো আগুন জ্বলছে। সেখানে এখনো অনেকে আপনজনের হদিস পাচ্ছে না। নাফ নদে ছোট্ট শিশুর লাশ ভেসে বেড়াচ্ছে। মানুষের লাশ ভাসছে- এটা সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী কাজ। শিশু, নারী, পুরুষ সাধারণ মানুষেরা কি অপরাধ করেছে যে, তাদের ওপর এই জুলুম-অত্যাচার। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমরা কখনই সমর্থন করতে পারি না। তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমার সরকারকে বারবার বলেছি- আমাদের তরফ থেকে একটা কথা বলেছি যে, সেই ’৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে আর মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। এদের ভোটের অধিকার, নাগরিক অধিকার- সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। কেন এই অত্যাচার। এরা তো মিয়ানমারেরই লোক। মিয়ানমারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তো নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন- এই রোহিঙ্গারা তাদেরই নাগরিক। তাহলে এখন তারা এই সমস্যা সৃষ্টি করছে কেন?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এটুকুই বলবো এ ধরনের ঘটনা, বিশেষ করে এটি একটি অমানবিক ঘটনা, এটি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। প্রতিবেশী দেশ আমরা। সেখানে কোনো ঘটনা ঘটলে আমাদের ওপর চাপ পড়ে। তিনি বলেন, এই যে মানুষ আজকে এখানে এসেছে- আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের এখানে আশ্রয় দিয়েছি। কারণ স্বজন হারানোর বেদনাটা যে কি সেটা আমরা জানি। প্রধানমন্ত্রী তার এবং শেখ রেহানার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা দুটি বোন ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট মা, বাবা, ভাই সব হারিয়ে আমাদেরও রিফিউজি হিসেবে বিদেশে থাকতে হয়েছে। আমার মনে পড়ে, ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করেছিল তখন দেশের মানুষ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। এভাবেই ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল হানাদার বাহিনী। আমাদের নিজের ঘর, আমার দাদার বাড়ি, নানার বাড়ি এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িঘর, আমাদের গ্রাম পুরো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করা হয়েছিল। আজকের যারা নতুন প্রজন্ম তারা পাকিস্তানি বাহিনীর সেই বর্বর অত্যাচার-নির্যাতন দেখেনি। কিন্তু আমরা যারা দেখেছি তারা স্মরণ করতে পারি তা কী ভয়াবহ ছিল। তাই এই শরণার্থীদের প্রতি আমি সবাইকে সদয় হতে বলবো। মানবতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানাবো।
আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থাই মিয়ানমারের শরণার্থীদের সহায়তার জন্য এগিয়ে এসেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একটি রিলিফ কমিটি গঠন করে তার মাধ্যমে ত্রাণ সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সহযোগিতার হাতকে প্রসারিত করেছেন। সরকার বায়মেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে রিলিফ তৎপরতা চালিয়ে যাবার উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শরণার্থীদের নাম, ঠিকানা, পরিচয় লিপিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাতে তাদের কোনো সমস্যা হলে আমরা দেখভাল করতে পারি এবং তাদের দেখভাল করাটা আমাদের দায়িত্ব। যাতে সবকিছু সুন্দরভাবে করতে পারে, সেজন্যই এই উদ্যোগ বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শরণার্থীদের হাতে নিজে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। এ সময় শরণার্থীরা তাদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে মিয়ানমারে তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী দুর্গত নারী ও শিশুকে কাছে টেনে নেন। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন