মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসির প্রতি আহ্বান

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৪০
রাখাইন রাজ্যে মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গা মুসলিমদের কাছে জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সহায়তা পৌছে দেয়ার সুবিধা দিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘ, বহুজাতিক সংগঠন ও বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশকে চাপ তীব্র থেকে তীব্র করার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সহায়তা বৃদ্ধি করার জন্যও জাতিসংঘ ও দাতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক ডাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, তা থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের দাবি জানাতে হবে। রোহিঙ্গাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর অনুমতি দিতে বলতে হবে মিয়ানমারকে। যদি তারা তা অনুমোদন না করে তাহলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবরোধ দিতে হবে।
নিউ ইয়র্ক থেকে সোমবার ইস্যু করা এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানায় সংস্থাটি। এতে বলা হয়, জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি সহ প্রভাবশালী সংগঠন বা দেশের উচিত মিয়ানমারের ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করা। নিশ্চিত করতে হবে যাতে সম্প্রতি পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গার জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করা। ওই বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ২৫ শে আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মির সদস্যরা সেনা ও পুলিশ চেকপোস্ট বা অবস্থানস্থলে হামলা চালায়। এর ফলে সেনাবাহিনী নৃশংস অভিযান শুরু করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর। এতে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পারলেও হাজার হাজার রোহিঙ্গা এখনও মিয়ানমারের ভিতরে, রাখাইনে বাস্তুচ্যুত হয়ে আছেন। রাখাইনে মূল জাতিগত রাখাইন ও অমুসলিম মিলিয়ে আরো প্রায় ১২ হাজার মানুষ রয়েছে এর মধ্যে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উপপরিচালক ফিলিপ বোলোপিয়ন বলেছেন, রাখাইনে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী যে ভয়াবহ মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি করেছে, সরকার সেখানে মানবিক সহায়তাদানকারী সংস্থাগুলোকে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে তাকে বহুগুলে বাড়িয়ে দিয়েছে। তার ভাষায়, এ অবস্থায় আমরা জাতিসংঘ, আসিয়ান ও অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)-এর কাছে উদাত্ত আহ্বান জানাই মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন এবং বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সহায়তা দ্রুততর করুন এবং বৃদ্ধি করুন। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গ্রামবাসীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। গুলি করেছে। বহু মানুষের শরীরে বিদ্ধ হয়ে আছে গোলা। তারা বাড়িঘর পুদিয়ে দিয়েছে। জাতি নির্মূলের অংশ হিসেবে তারা নির্বিচারে হত্যাকা- চালাচ্ছে। গোলা নিক্ষোপ করছে। গ্রামে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে যেসব আন্তর্জাতিক সহায়তা দিয়ে থাকে যারা তাদের অনেকের কর্মকা- সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে ওই রাজ্যে অবস্থানকারী প্রায় আড়াই লাখ মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা সেবা ও অন্যান্য গুরুতর মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শরণার্থীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, মংডু শহরের বহু মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে সক্ষম হয়েছেন, কিন্তু এখনও হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা আত্মগোপন করে আছেন রাথেডাং ও বুথিডাং এলাকায়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরো লিখেছে, দশকের পর দশক রাখাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বিদেশী বলে বর্ণনা করে আসছে। ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার বসবাস মিয়ানমারে। বিশাল এ দেশটিতে তারা তুলনামুলকভাবে সংখ্যায় অনেক কম। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে তাদেরকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। এ কারণে তারা দীর্ঘ সময় পর্যায়ক্রমে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গারা বিশ্বে রাষ্ট্রহীন সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীর অন্যতম। তাদের নাগরিকত্ব না থাকায় মিয়ানমারের পুলিশ, সীমান্তরক্ষী, স্থানীয় কর্মকর্তাদের হাতে তারা পর্যায়ক্রমে নির্যাতনের শিকার হয়। কারণ, তাদের মানবাধিকার নেই। তাদের অধিকার রয়েছে সীমিত। নিজেদের গ্রামের বাইরে যাওয়ার স্বাধীনা তাদেরকে দেয়নি সরকারের আইন, নীতি ও চর্চিত নিয়ম। জীবিকার সন্ধানের ক্ষেত্রে তাদের বিধিনিষেধ আছে। তাদের বিয়ে ও সন্তান নেয়ার ব্যক্তিগত অধিকারেও হস্তক্ষেপ করে সরকার। তাদেরকে মৌলিক স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
এমনকি সাম্প্রতিক সহিংসতা শুরুর আগে মংডুতে খাদ্য নিরাপত্তার সূচক ও শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতার হার ইর্মাজেন্সি লেভেল ক্রস করে। এ তথ্য মিয়ানমারে মানবিক সহায়তা বিষয়ক জাতিসংঘের সমন্বয় অফিসের। যেহেতু সরকারি কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর নির্মমতা চালাচ্ছে এতে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নানা সমস্যায় থাকা রোহিঙ্গাদের সমস্যা আরো প্রকট হচ্ছে। তাদের খুব বেশি প্রয়োজন খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা। এর আগে এসব বিতরণ করেছে জাতিসংঘের এজেন্সিগুলো ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠনগুলো।
সরকার অভিযোগ করছে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সমর্থন দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সাহায্য বিষয়ক সংগঠন। এ নিয়ে ওই সব এজেন্সির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে সরকারের। মিয়ানমার সরকার বলছে, জুলাই মাসে উগ্রপন্থিদের ক্যাম্পে উচ্চ শক্তিযুক্ত বিস্কুট পাওয়া গেছে। এই বিস্কুট বিতরণ করেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসুচি। আন্তর্জাতিক সহায়তাকারী বেশ কিছু গ্রুপের স্থানীয় গুদাম সেপ্টেম্বরে লুট হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠনগুলোতে কর্মরত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এমনটা দাবি করা হয়েছে ইউরোপিয়ান কমিশনের ইউরোপিয়ান সিভিল প্রটেকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান এইড অপারেশনস-এর ডিরেক্টর জেনারেল। ওদিকে সরকারিভাবে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ৩৪ হাজার। এর বাইরে রয়েছে তিন থেকে ৫ লাখ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর অভিযানের ফলে আরো ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। আর সর্বশেষ সহিংসতায় নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ লিখেছে, বর্তমান সঙ্কটে অনানুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে। কর্মকর্তারা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো যেসব মানুষ নো ম্যানস ল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন তাদেরকে সহায়তা করা। তাদেরকে জরুরি ভিত্তিতে রেশন দেয়া। চিকিৎসা সেবা দেয়া। পয়ঃনিষ্কাশনের সহায়তা করা। পানি সরবরাহ দেয়া। তারা আরো বলেছেন, নজরদারি করা হয় না সীমান্তের এমন অনেক পয়েন্ট দিয়েও রোহিঙ্গারা আসছেন। তাদেরকে সহায়তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। উল্লেখ্য, এখন বর্ষা চলছে। এ সময়ে নাফ নদী পাড় হওয়া প্রচন্ড বিপদজনক। বর্ডার গার্ড কর্মকর্তা ও অন্যান্য সূত্রগুলো বলেছেন, তাই এই নদী অতিক্রম করার সময় নৌকা ডুবে দু’ডজনেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। যারা অতিক্রম করতে পেয়েছেন তারা ক্ষণস্থায়ী তাঁবু বা ঘরের মতো বানিয়ে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় হচ্ছে প্রচন্ড বৃষ্টি। ধারণ ক্ষমতার বাইরে গিয়েও হাসপাতালগুলো সেবা দিচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন অতিরিক্ত গাদাগাদি ও নাজুক পয়ঃনিষ্কাশনের কারণে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১৭ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা বালক। তার বাহুতে বুলেট বিদ্ধ হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে তিনি বলেছেন, তার এখন কি হবে। তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কি করবেন। তিনি আরো বলেন, আমার কোনো পরিবার নেই। কোনো বন্ধু নেই। কারো সঙ্গে যোগাযোগ নেই। আমার কাছে অর্থ নেই। বর্ডার গার্ড কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা এমন বহু ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। রাখাইনের ঘটনায় নিঃস্ব অনেক শিশু একা একা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে বাংলাদেশী কিছু কর্মকর্তা বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বাগত জানানো হবে না। তারা বন্যায় দেশের বহু এলাকা ডুবে যাওয়ার প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। ২০১৬ সালে বঙ্গোপসাগরের জনমানবহীন ঠেঙ্গারচরে রোহিঙ্গাদেরকে পুনর্বাসনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ সরকার। বোলোপিয়ন বলেছেন, রাখাইনে সেনাবাহিনীর গণ নৈরাজ্য চালানো যদি অব্যঃাহত থাকে তাহলে মিয়ানমার ও বাংলাদেশে মানবিক পরিস্থিতির আরো অবনিত ঘটবে। তাই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উচিত জরুরি বৈঠক ডাকা এবং তা থেকে মিয়ানমার সরকারের কাছে আহ্বান জানানো যে, রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। সহায়তা পৌঁছাতে দিতে হবে। যদি তা করা না হয় তাহলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবরোধ দেয়া হবে।


 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের দাবি

এখনও আসছে রোহিঙ্গারা, সমঝোতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

৯০ টাকা ছাড়ালো পিয়াজের কেজি

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি মামুলি ব্যাপার

‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’

চিরঘুমে লোকসংগীতের মহীরুহ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার ক্ষতি পোষাতে দরকার ১০০ কোটি টাকা

জিম্বাবুয়ের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ

দুই দলেই হেভিওয়েট প্রার্থী

দরিদ্রদের জন্য বিচারের বাণী নীরবে কাঁদে

৭ই মার্চ ভাষণের স্বীকৃতিতে দেশব্যাপী শোভাযাত্রা আজ

সম্মতিপত্র প্রকাশের দাবি বিএনপির

ঘরে ঘুরে দাঁড়ালো চিটাগং

মিশরে মসজিদে জঙ্গি হামলা, নিহত কমপক্ষে ২৩০

‘শেষ মুহূর্তে হলে সরকার সমঝোতায় আসবে’

রবি-সোমবার সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতি