কলকাতার কড়চা

একজন জালালের বাঁচার লড়াই

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, কলকাতা থেকে ফিরে | ৩০ আগস্ট ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৫১
নিউমার্কেট। কলকাতার উপকণ্ঠ। বিপণী বিতান খ্যাত এলাকা। এর আশপাশে রয়েছে মার্কুইজ স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট, মীর্জা গালিব স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদওয়াই স্ট্রিট,  সদর স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, কিড স্ট্রিট। আর এই এলাকার কাছাকাছি চলাফেরায় খুব সহজেই যাত্রীরা নির্ভর করেন টানা রিকশার ওপর। কারণ নিউমার্কেট থেকে এত কাছে মিটার ট্যাক্সি, ওবার বা ওলা কোনোটাই ঠিক আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী নয়। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেনাকাটা শেষে একরাশ ক্লান্তি যখন আপনাকে নুইয়ে দিয়েছে, পায়ের গোড়ালি তীব্র ব্যথায় কুকড়ে আসছে ঠিক তখন একটি টুং টুং আওয়াজ আপনাকে স্বস্তি এনে দেবে। আপনার বাজারের থলেগুলো পৌঁছে দেবে আপনার হোটেল লবিতে। আপনি কেনাকাটা শেষে বাইরে বের হবার সঙ্গে সঙ্গেই কানে বাজবে, বাবু যাবেন? হাতের এই টুং টুং ঘণ্টা আপনাকে স্বাগত জানাবে। এটাই বহুল প্রচলিত টানা রিকশা। ঢাকায় আমরা যে রিকশায় অভ্যস্ত বা রিকশার ভিড়ে বিরক্ত। এটা ঠিক একই রকমের নয়। নিউ মার্কেটের সামনে আপনার অপেক্ষায় থাকা এদের বলা হচ্ছে টানা রিকশা। মানুষচালিত বা মানুষের টেনে নেয়া বাহন এটি। কাঠের তৈরি। দুটি বড় চাকার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে এ বাহনটি। এর লম্বা হাতল ধরে চালক একে বয়ে নিয়ে চলে।
টানা রিকশাওয়ালাদের দিন শুরু হয় ভোর ৫টা থেকে। আর সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করে শেষ হয় সন্ধ্যার শেষ দিকে। তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বিভিন্ন জিনিসপত্র আনা-নেয়া করেন। স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যায়, আবার বাড়ি নিয়ে আসে। নারীদের নিয়ে যায় স্থানীয় বাজারগুলোতে। বিকেলের দিকে কিছু সময় জিরিয়ে আবার শুরু হয় কলকাতার রাস্তাজুড়ে তাদের চলাচল। কখনো উত্তরের গলিঘুঁজি, কখনো মধ্য কলকাতা। এভাবেই চলে একেবারে সন্ধ্যার শেষ সময় পর্যন্ত। হাতে-টানা রিকশাগুলো শহরের এমন সব জায়গায় যেতে সক্ষম যেসব জায়গায় ট্যাক্সি, গাড়ি বা অটোরিক্সাগুলো যেতে পারে না। যেমন শহরের পুরনো অংশের বিভিন্ন লেন ও অলিগলি- বিশেষ করে যখন বর্ষায় গলিগুলোতে পানি জমে থাকে। রিকশাচালক নিজে ছুটে চলেন কলকাতার অলি-গলির জমে থাকা পানির ভেতর দিয়ে। আর যাত্রী থাকেন রিকশার উপরিভাগে, যেখানে পানি উঠে না।
দোমিনিক ল্যাপিয়ের তার ‘সিটি অব জয়’ বইতে উল্লেখ করেছেন টানা রিকশার। বইটির বিভিন্ন পরতে টানা রিকশা চালকের জীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা উল্লেখ আছে। ভারতের বিভিন্ন চলচ্চিত্রেও টানা রিকশার দেখা মেলে। বিমল রায়ের ‘দো বিঘা জমিন’ ছবিতে দেখা যায় গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে শহরে আসা এক কৃষকের জীবন নির্বাহ হয় এই টানাকে ভর করে। দো বিঘা জমিনের সেই কৃষকের চরিত্র আজও বদল হয়নি। এখনো নিউমার্কেট এলাকার চারপাশের অলিগলিতে দেখা মেলে সংগ্রামী সেই সব মানুষের। তাদের একজন মোহাম্মদ জালালউদ্দীন। বাঁচার লড়াইয়ে যিনি ষোল বছর টানা রিকশা নিয়ে যুদ্ধ করছেন। ২০০৬ সালেই রাজ্যে তৎকালীন বাম সরকার  অমানবিক এই টানা রিকশা ধীরে ধীরে তুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু উল্টো বিতর্কও আছে। ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এই টানাকে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায় তা নিয়ে রয়েছে নানা মত। ফিরে আসি জালালের কথায়। অনেকটা অভিমানের স্বরে তিনি বললেন, মুসলিম বলেই এ টানা চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কারণ, যখনই কোনো অফিসে চাকরি করেছেন তখন খুব বেশিদিন কাজ করতে পারেন নি। শেষ ষোল বছর টানা নিয়ে ভালোই আছেন। তিন কন্যা ও স্ত্রী নিয়ে সুখী জালাল। পেশা বদলের আর কোনো চিন্তা নেই। অন্য কাজের তুলনায় এটা চালাতে খুব একটা কষ্ট হয় তা নয়। এর একটি নির্দিষ্ট কৌশল আছে। জালাল জানায়, কলকাতা শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দশ হাজারের মতো টানা রিকশা আছে। সবচেয়ে বেশি চলে নিউমার্কেট ও উত্তর কলকাতায়। জালালের মতোই টানা রিকশায় জীবন নির্বাহ করছেন আলী। আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় টানা তৈরির ব্যয় বা ভাড়ায় চালালে কত খরচ হয়? পুরো দিনের আয় কেমন হয়? একটি নতুন টানা রিকশা তৈরিতে ব্যয় হয় পনের হাজার রুপি। আর পুরনো রিকশা কিনতে খরচ পরে দশ হাজার। যাদের কাছ থেকে রিকশা ভাড়া নিয়ে চালাতে হয়, তাদের বলা হয় সর্দার। একেকজন সর্দার একসঙ্গে অনেক রিকশার মালিক। তাদের রয়েছে একটি অ্যাসোসিয়েশনও। এ থেকেই নীতিমালা তৈরি হয় কিভাবে চলবে টানা রিকশা। আর সরকারের সঙ্গে এই অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে চলে দর কষাকষি। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি চালালে আয় হয় পাঁচশো টাকার মতো। সারাদিনের খোরাকিসহ খরচ হয় দুইশোর মতো। এর মধ্যে সর্দারকে দিতে হয় ভাড়া বাবদ চল্লিশ রুপি। সব বাদ দিয়ে ৩০০ রুপির মতো আয় হয়। একমাত্র পুজোর সময় আয় বেড়ে ৮০০ থেকে ১০০০ রুপি পর্যন্ত পৌঁছায়। একই রকম জীবন কাটছে টানা রিকশার চাকায় ভর করে দীনেশ, জগদীশ আর শ্যামল দাসের। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয় এ পেশায় তরুণদের একেবারেই চোখে পরেনি। টানা রিকশার চালকরা বেশিরভাগই ষাটোর্ধ। অনেকেই বিহার বা ঝাড়খণ্ড থেকে আসা। তাছাড়া বাম শাসনের একেবারে শেষদিকে টানা রিকশায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় টানা রিকশা অস্তিত্ব রক্ষায় ঠাঁই নেয় অলি-গলি।
টানা রিকশার নিজের গল্প
উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে কলকাতার রাস্তায় হাতে-টানা রিকশার চলাচল শুরু। ইতিহাস বলে এর প্রথম আবিষ্কার জাপানে। ১৮৬৭-৬৮ সালের দিকে এর সূচনা। ভারতে প্রথম টানা রিকশা আসে শিমলায় ১৮৮০ সালের দিকে। আর কলকাতায় এর পা পরে ১৯১৪ সালে। সেই হিসেবে টানা রিকশা ইতিমধ্যেই একশো বছর পার করেছে। শতবর্ষ চলা এই টানা রিকশা যেন কলকাতা শহরের আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাসের নানা বিবর্তনের সাক্ষীও এটি। সমালোচক ও সমাজকর্মীরা অমানবিক ও নিষ্ঠুরতার গল্পগুলো ফুটিয়ে তুলতে নির্বিশেষে এই মানুষ চালিত রিকশার ব্যবহার করেছেন। তৎকালীন বৃটিশ রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় তখন জাপানিজ ঘরানার এই কাঠের রিকশার প্রচলন শুরু হলেও, কলকাতার সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য ও জমিদাররা পালকিতেই চড়তেন। কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া শোভিত পালকি ছিল অভিজাত সমপ্রদায়ের আর্থ-সামাজিক স্ট্যাটাসের প্রতীক। কিন্তু খুব দ্রুতই মধ্যবিত্তের কাছে পালকির বিকল্প হয়ে উঠল হাতে-টানা রিকশা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের পরেও ভারতে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসীদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস হয়ে উঠল এই রিকশা। পুরো এশিয়া থেকে এই রিকশার অস্তিত্ব মুছে গেলেও ভারতের কলকাতায় এখনো এই হাতে-টানা রিকশার প্রচলন রয়ে গেছে। যে রিকশায় একজন মানুষ টেনে টেনে আরেকজন মানুষকে নিয়ে যাবে। আর এ কারণেই কলকাতায় রাজ্য সরকারের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া বাঁধে মানবাধিকার কর্মীদের। চীনে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে এই রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে দেয়। আর এখন শেষমেশ কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনও টানা রিকশাওয়ালাদের লাইসেন্স ‘নবায়ন’ করে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।    
টানা রিকশায় সবুজ বিপ্লবের ঘোষণা
টানা রিকশা চালানো এই যুগে অমানবিক। তাই মমতা সরকারও এ নিয়ে নতুন করে ভাবছে। শুধু নিষিদ্ধ করে টানা বন্ধ হবে না। যা বাম সরকারও পারেনি। নবান্নের হিসাব অনুযায়ী টানা রিকশা রয়েছে ছয় হাজার। আর এর সঙ্গে চালক ও মালিক মিলে যুক্ত প্রায় বার হাজার মানুষ। এদের পুনর্বাসনে মমতা সরকার চিন্তা করছে নতুনভাবে। ২০১৪ সালে টানা রিকশার একশো বছর পূর্তির ক্ষণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দিয়েছেন সবুজ বিপ্লবের। তৃণমূলের রাজনৈতিক রং সবুজ দিয়ে নতুনভাবে রিকশাকে নামানো হবে। মমতার উদ্যোগে ‘গ্রিন’ হয়ে নতুনভাবে ফিরবে টানা রিকশা। আর তা মেশিনে হবে, সৌরচালিত হবে নাকি প্যাডেল চালিত হবে তা সময়ই বলবে। তবে করণীয় নির্ধারিত হবে টানা রিকশায় যুক্ত মালিক-শ্রমিকদের সংগঠনের সঙ্গে বসেই।
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন