কলকাতার কড়চা

কলকাতার শপিং তালিকায় চিরুনিও

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, কলকাতা থেকে ফিরে | ২৭ আগস্ট ২০১৭, রবিবার
 এক আজব উন্মদনা লক্ষ্য করা যায় কলকাতা নিউমার্কেটে। স্থানীয়ভাবে স্যার স্টুয়ার্ট হগ মার্কেট নামে পরিচিত। যতবার কলকাতায় গিয়েছি পরিচিত কাউকে না কাউকে পেয়েছি। পুরো নিউমার্কেট এলাকা এখন যেন বাংলাদেশিদের স্বর্গরাজ্য। আশপাশের হোটেলগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই বাংলাদেশিদের ভিড় লেগে থাকে। ১৯৯৯ সালে প্রথম কলকাতায় গিয়ে উঠেছিলাম নিউমার্কেটের পাশেই লিন্ডসে স্ট্রিটে ইন্ডিয়ান গেস্ট হাউজে। বিকালে বের হই একজোড়া স্যান্ডেল কিনতে। প্রথমবার দেশের বাইরে। একধরনের নার্ভাসনেস ছিল। আর হোটেল থেকে আমি একাই নেমে নিউমার্কেটের ফুটপাতে থাকা খোলা দোকানে জুতোর দামদর করে দশ রুপিতে এক জোড়া জুতো কিনে হোটেলে ফিরি। সমস্যাটা চোখে পড়ে তখন। তাও আমার চোখে নয়। আমার ভ্রমণ সঙ্গী ছাড়াকার আসলাম সানীর চোখে। উনি হঠাৎ চিৎকার, অই মিয়া করছো কি? তুমিতো মিয়া সর্বনাশ কইরা ফালাইছো। আমি আবার কি করলাম বলতেই, অই মিয়া দুইটা একই পায়ের জুতা। আমি খানিকটা বিব্রত। দোকানের ভূত আমার ঘাড়ে চেপেছে। কিছু করার নেই। আবার যাচ্ছি বলে হোটেল থেকে নামতে যাবো সানী ভাই হাত টেনে ধরলেন। আরে মিয়া হুন, তুমি জুতা লইছো ঠিক আছে। লস আমাগো অইছে মিয়া এক জোড়া। কিন্তু দোকানদারেরতো মিয়া লস অইবো দুই জোড়া। যাও যাও জলদি যাও। সেবারের ভ্রমণে আমাকে এ ঘটনার অনেক হাস্যরসের মুখে পড়তে হয়েছে। যা গত দেড়যুগেও শেষ হয়নি। এখন সানী ভাইয়ের সঙ্গে কোথাও দেখা হলে ভরা মজলিসে তিনি এই গল্পটি বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন। যাক সেবার ছয়দিনের ভ্রমণে আসা যাওয়ার পথে নিউমার্কেটকে চিনেছি বহুভাবে। আর কিছু করার না থাকলে নিউমার্কেটের সামনে থাকা বেঞ্চিতে বসে হাওয়া খেতাম। যদিও সে সময় বাংলাদেশিদের খুব বেশি ভিড় দেখেছি মনে পরে না। তবে তারপর যাই ২০১৩ সালে। আমরা  উঠি হোটেল সম্রাটে। এটি নিউমার্কেটের পাশেই। হোটেলটির মালিকানা বাংলাদেশের পাবনার। যতদূর শুনেছি শ্যামলী পরিবহনের মালিকের কোন এক আত্মীয়র হবে। হোটেলে উঠেই বুঝতে পেরেছি আমি আর ঢাকার বাইরে নই। এখানকার কর্মচারী থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপক প্রায় সকলেই এপার বাংলার। এর সামনেই আবার বাংলাদেশের শ্যামলী পরিবহনের বাস কাউন্টার। কাজেই দিনের বেশির ভাগ সময়ই দেখতাম দলে দলে বাংলাদেশিরা নামছেন। আবার কলকাতার পাঠ চুকিয়ে দলে দলে ফিরেও যাচ্ছেন। আর সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা যখনই বের হয়েছি কাউকে না কাউকে বলতে শুনেছি আপনারা ঢাকার কোন জায়গার? খেতে যাবো এই এলাকায় কোথাও তবু দেখি বাংলাদেশের রাঁধুনী আর কস্তুরি হাজির। তারা কলকাতায় আসা বাংলাদেশিদের ঢাকার স্বাদ দিতেই খুলেছেন এখানে হোটেল ব্যবসা। রাঁধুনীতে একবেলা খেলামও। কর্মরত হোটেল বয়রা জানাল তারা ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এখানে চাকরি করছে বছরের পর বছর। ওয়ার্ক পারমিট শেষ হলে ফিরে গিয়ে আবার অনুমতি সাপেক্ষে ফিরে আসেন। আশপাশের বেশকিছু মানি চেঞ্জার রয়েছে মার্ক্যুইজ স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট এসব এলাকায়। সবগুলোই রমরমা থাকে বাংলাদেশিদের টাকা রুপি করে। তবে সব ছাপিয়ে এখন বাংলাদেশিরা ব্যাপকহারে আলোচনায় কলকাতার শপিং ঘিরে। সেখানকার নিউমার্কেট মূল কেন্দ্রবিন্দু হলেও এর বাইরে প্যান্টলুনস, ফেব ইন্ডিয়া, ওয়েস্ট সাইড, রিলায়েন্স ট্রেড, বিগ বাজার, শপার্স স্টপ, দক্ষিণাপণ, গড়িয়া, গড়িয়া হাটা, ফোরাম, সিটি সেন্টার, কোয়েস্ট মল, বড়বাজার, চিৎপুর, টালিগঞ্জ, পার্ক সার্কাস, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, ট্রেজার আইল্যান্ড, জাকারিয়া স্ট্রিট, বেলগাছিয়া, রাজারহাট, রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড আলোচনায়। আর এই বৃহৎ শপিং মলগুলোর বাইরে শ্রী লেদার্স-এর জুতার দোকানের কথা না বললেই নয়। নিউমার্কেটের দু’টি শাখা এর বাইরে কলকাতাতেই আরও বেশক’টি শাখায় যখনই গেছি দেখেছি মানুষ লাইন ধরে জুতা কিনছে। অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে, কলকাতার ঈদবাজার এখন সাজানো হয় বাংলাদেশের ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে। দেয়া হয় বিশেষ ছাড়। অন্যদিকে রাষ্ট্রও পিছিয়ে নেই। ভারত সরকারের কথা মাথায় রেখে ক্রেতাদের ব্যাপকহারে কলকাতার বাজারে নিতে শুরু করেছে ভিসা মেলা। যেখান থেকে সহজেই ভিসা প্রাপ্তির ফলে ক্রেতারা দলে দলে ছুটছে কলকাতায় শপিং করতে। ফি বছর এই ভিসা মেলায় ঈদের আগে ভারতীয় দূতাবাস দেড় লাখ ভিসা ইস্যু করেছে। এমনও দেখা গেয়ে বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছেন খালি লাগেজ নিয়ে কিন্তু যখন ফিরছেন তখন অতিরিক্ত আরো লাগেজ বোঝাই করে পরিবার পরিজনদের জন্য পোশাক নিয়ে ফিরছেন। অনেকেই শুধু যে পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে ছুটছেন তা নয়। সেখানকার বাজার থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পোশাকসহ অন্যান্য সামগ্রী কিনে ঢাকায় এনে তা ডাবল বা তারও বেশি টাকায় বিক্রি করছেন। এটা অনেকেই করেন তাদের যাতায়াত খরচ পুষিয়ে নিতে। তাছাড়া অনেকেই আবার একঢিলে দুই পাখি মারতে ছুটছেন কলকাতায়। পরিবার নিয়ে একেতো দেশের বাইরে কোথাও বেড়ানো হলো আবার পছন্দসই কেনাকাটাও। রমজানে কলকাতার বাজারে শপিংয়ে দশজনের মধ্যে ৪ জনই বাংলাদেশের ক্রেতা। রমজানের শুরুর দিক শুরু হয়ে যায় ভিড়। এ সময় আশপাশের হোটেলগুলোতেও বাড়তি চাপ লক্ষ্য করা যায়।
দু’দেশের গণমাধ্যম ছাড়াও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশিদের কলকাতার শপিং নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি ও রয়টার্স প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, এক হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ট্যুরিস্ট ভিসায় ভারতে যাওয়ার জন্য এগারো মাসে (জুলাই থেকে মে) ৫৭ মিলিয়ন ডলার (৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার) বৈদেশিক মুদ্রা করা হয়েছে যা গত বছরের তুলনায় ১০ মিলিয়ন বেশি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪৫ মিলিয়ন ডলার নিয়ে গেছে বাংলাদেশের ট্যুরিস্টরা। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬তে তা বেড়েছে দুই মিলিয়ন। এর মাত্রা ২০১৭ সালে আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্যদিকে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে গড়ে তিন হাজার বাংলাদেশি আসা-যাওয়া করে কিন্তু তা ঈদের সময় দাঁড়ায় সাত হাজারে। অনেকেই মনে করেন, ভারতের মুদ্রা অবমূল্যায়নের ফলে রুপির সাথে বাংলাদেশি টাকার মূল্য ব্যবধানও কমে এসেছে। এতে অনেক ক্রেতাই ভারত থেকে কেনাকাটায় আগ্রহী। তাছাড়া ২৪টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চেকপোস্ট দিয়ে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসায় প্রবেশ ও প্রস্থান নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়ায় ভারতে যাতায়াত আরও সহজ করা হয়েছে।
অর্থের হিসাব বাদ দিয়ে যদি অজানা অচেনা পরিবেশ নিয়ে কথা বলি তাহলে বাংলাদেশিদের নিউমার্কেট এলাকা সবচেয়ে পছন্দের। ভাষাগত সুবিধা ছাড়াও এখানে রয়েছে বাংলাদেশিদের বেশকিছু হোটেল। যেখানে সহজেই মিলবে নানান ধরণের সহযোগিতাও। তাছাড়া আফ্রিদি, ব্রডওয়ে, আফরিন, ইন্ডিয়ান গেস্ট হাউজ, সম্রাটসহ নিউমার্কেটের আশপাশেই রয়েছে একাধিক হোটেল যেখানে সহজেই দুই থেকে তিন হাজারের মধ্যে থাকার বন্দোবস্ত রয়েছে। আর নিউমার্কেটের চারধারে রয়েছে সস্তায় নানান মুখরোচক খাবার। ইন্ডিয়ান বহুরকম ভাজাভুজি আর শরবতে শপিং যন্ত্রণার অনেকটাই উবে যায়। শেষ করতে চাই আমার প্রথম ভ্রমণসঙ্গীর একজনের কলকাতায় ভ্রমণ পাগলামির কথা দিয়ে তা হলো, প্রায় প্রতিদিনই উনাকে দেখতাম রাতে বসে হিসাব করতে কি কি কেনাকাটা বাকি আছে তার ফর্দ মেলাতে। একেবারে শেষদিন অনেক রাত করে ফেরায় প্রশ্ন করলাম কোথায় ছিলেন? বড়বাজারে। এতরাত অবধি। আর বইলোনা এক ডজন চিরুনি কিনতেই দেরি হয়ে গেল। চিরুনি কিনতে কলকাতায়? এ জিনিসতো ঢাকাতেই পাওয়া যায়। চটজলদি উত্তর মিললো, অই মিয়া এখানে যে দামে ভালো চিরুনি পাওয়া যায় তাতো আমি ঢাকাতে পাই না।
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

৮৫ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণসহ ভারতীয় নাগরিক আটক

যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ!

নবজাতকের মৃত্যু, উত্তেজনা

মিয়ানমারের অনুরোধে খবর গোপন করেছিল জাতিসংঘ

তিন দিন ধীরগতি থাকবে ইন্টারনেটে

সন্তানকে ফিরে পেতে বাবা-মায়ের আকুতি

‘সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে রোহিঙ্গা, তিস্তা ইস্যু থাকবে’

কে এই কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হরি?

রোহিঙ্গাদের জন্য ৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার সংগ্রহে ডোনার কনফারেন্স করবেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা

ইউপি চেয়ারম্যান ও আ’লীগের নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা

‘ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে সিদ্ধান্তের অধিকার সবারই আছে’

ঢাকায় আসছেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো

আবারো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র-ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান

কুয়েতে এসি বিস্ফোরণে মৌলভীবাজারের একই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যু

৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন

যুদ্ধ নয় আলোচনায় সমাধান