নির্বাচন কমিশন ও রেডিওর বাটন

মত-মতান্তর

শামীমুল হক | ১৯ আগস্ট ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৩৩
নিশ্চিত হেরে যাচ্ছেন হিলারি। ফল এখনও ঘোষণা হয়নি। এর আগেই ফোন করলেন ডনাল্ড ট্রাম্পকে। জানালেন অভিনন্দন। এমনটি কি ভাবা যায় এদেশে? না কখনোই না। যেখানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনেই হেরে গিয়ে বলা হয় স্থ্থূল, কিংবা সূক্ষ্ম কারচুপি বা মিডিয়া ক্যু।
সেখানে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন তো মানাই অসম্ভব। এ কারণেই তো ১৯৯৫-৯৬ সালে ঢাকার রাজপথ আন্দোলনে উত্তাল ছিল। আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ অন্য দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে দিনের পর দিন হরতাল, অবরোধ এমনকি প্রেস ক্লাবের সামনে জনতার মঞ্চ করে সরকারকে চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়। তৎকালীন বিএনপি সরকার বাধ্য হয় ’৯৬-এর ১৫ই ফেব্রুয়ারির মতো একদলীয় নির্বাচন দিতে- আর সংসদে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক বিল এনে ক্ষমতা ছাড়তে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করেছিল  আওয়ামী লীগ, সেই আওয়ামী লীগ এখন তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক শব্দটিই বাদ দিয়ে দিয়েছে। আর যে দল বিএনপি ছিল এর ঘোর বিরোধী এখন তারা এর পক্ষে রাজপথে। শুধু তাই নয়, এজন্য তারা একটি নির্বাচন পর্যন্ত ছাড় দিয়েছে। অংশ নেয়নি। যে কারণে ১৫৩ আসনে কোনো নির্বাচনই হয়নি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। আর এর জন্য আওয়ামী লীগকে বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে। একথা আরো কতদিন শুনতে হয় কে জানে। আসলে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনও ইতিহাস হয়ে গেছে। যেমনটি ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এখন ইতিহাস। আসলে রাজনীতিবিদদের মধ্যে একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস আনতে পারছেন না। একে অন্যকে আস্থায় নিতে পারছেন না। আর এ জন্য দায়ী সরকারে থাকার সময়ে নিজেদের কর্মকাণ্ড। এদেশে যুগে যুগে ক্ষমতাসীনদের দাপটের কাছে বিরোধীরা অসহায়। জোর যার মুল্লুক তার- এমন অবস্থা। বাংলাদেশের প্রেক্ষিত আর আমেরিকার প্রেক্ষিত কি এক? না। কখনোই না। যোজন যোজন পার্থক্য। যে দেশে ফল ঘোষণার আগেই হার মেনে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে অভিনন্দন জানায়, নিজের পরাজয়ে কাবু হয়ে উল্টাপাল্টা না বলে, একসঙ্গে দেশকে এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার করে- সে দেশ এগুবে নাকি বাংলাদেশ এগুবে। এতদূর আমেরিকা কেন পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকালেই আমরা কি দেখি। সেখানেওতো গত নির্বাচনে কট্টর হিন্দু মৌলবাদী দল বিজেপির জয়কে স্বাগত জানিয়েছে ধর্ম নিরপেক্ষ হিসাবে পরিচিত দল কংগ্রেস। এটাই রাজনীতির শিক্ষা। কিন্তু এদেশে আস্থা আর অনাস্থার দোলাচলে দোলবে আর কতদিন? নির্বাচন কমিশন যতই বলুক তারা স্বাধীন এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ সরকারের কর্মকর্তাদের উপর তারা এখনও নির্ভরশীল। তাদের নিজস্ব সচিবালয় যেমন নেই, তেমন তাদের নিজস্ব লোকবলও নেই। ফলে সরকারি আমলারাই তাদের ভরসা। আর সরকারি আমলাদের চাকরি ন্যস্ত সরকারের হাতে। কাজেই সরকার যেভাবে বলবে তারাও সেভাবেই কাজ করবেন-এটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলই এটা ভালো করে জানে। আর জানে বলেই তারা একে অন্যকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু বিশ্বাসে আনার মতো কোনো উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে না। কারণ একটাই। পরাজয় মেনে নেয়ার সংস্কৃতি নেই। সাহস নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার একেএম নুরুল হুদা ধারাবাহিক সংলাপের আয়োজন করেছেন। বুধ ও বৃহস্পতিবার দুদিন গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বসেন। তিনি সবার কথা শুনেন। আবার নিজেও বলেন। তার বক্তৃতায় বলেছেন, নির্বাচনে কোনো দলকে আনার জন্য তিনি মধ্যস্থতা করবেন না। ভয়াবহ তথ্য। তিনি সিইসি। তার কাজ হলো সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়া। সেটা না করে তিনি সংলাপের শুরুতেই বলে দিলেন এটা করব না। তাহলে উনার দরকার কি? নির্বাচন কমিশনেরই দরকার কি? সরকারই নিজ উদ্যোগে নির্বাচন করে নিতে পারেন। এ ব্যাপারে অবশ্য সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, মধ্যস্থতা করা নির্বাচন কমিশনের কাজ নয় ঠিক। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে কমিশনকে আস্থা অর্জন করতে হবে। সত্যিইতো কমিশন যদি আগেই হেরে বসে থাকেন তাহলেতো রাজনৈতিক দলগুলো সন্দেহ করবেই। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। ১২ জন সিইসি এ পর্যন্ত  নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন। এদের কেউ কেউ নিন্দিত হয়েছেন। আবার কেউ নন্দিত হয়েছেন। দেশের প্রথম সিইসি ছিলেন বিচারপতি মো. ইদ্রিস। তিনি ৭ই জুলাই ১৯৭২ সাল থেকে ৭ই জুলাই ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ৮ই জুলাই ১৯৭৭ সালে দায়িত্ব নেন বিচারপতি একেএম নুরল ইসলাম। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত। একই দিন দায়িত্ব নেন বিচারপতি চৌধুরী এটিএম মাসুদ। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। একই দিন দায়িত্ব নেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। পরদিন ২৫শে ডিসেম্বর দায়িত্ব নেন বিচারপতি মো. আব্দুর রউফ। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ১৮ই এপ্রিল ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। এরপর ২৭শে এপ্রিল ১৯৯৫ সালে দায়িত্ব নেন বিচারপতি একেএম সাদেক। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ৬ই এপ্রিল ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। তার সময়েই হয় বিতর্কিত ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। ৯ই এপ্রিল ১৯৯৬ সালে সিইসি হিসাবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ আবু হেনা। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ৮ই মে ২০০০ সাল পর্যন্ত। এরপর দায়িত্ব নেন সাবেক সচিব এমএ সাঈদ। তিনি ২৩শে মে ২০০০ থেকে ২২শে মে ২০০৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২৩শে মে ২০০৫ সালে দায়িত্ব নেন বিচারপতি এমএ আজিজ। তিনি তীব্র আন্দোলনের মুখে ২১শে জানুয়ারি ২০০৭ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০০৭ সালে দায়িত্ব নেন ড. এটিএম শামসুল হুদা। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ সাল পর্যন্ত। ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০১২ সালে দায়িত্ব নেন কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সাল পর্যন্ত। সর্বশেষ গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি নানা বিতর্কের মধ্যে সিইসি হিসাবে দায়িত্ব নেন একেএম নূরুল হুদা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে তার অধীনেই। আর তাই এখন থেকেই তিনি প্রস্তুতি শুরু করেছেন। এরই অংশ হিসাবে সুশীল সমাজের সঙ্গে তার সংলাপ চলমান রয়েছে। বুধ ও বৃহস্পতিবার গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের শেষ দিনে তিনি যা বলেছেন তা নিয়ে এখন আলোচনা তুঙ্গে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে আনার জন্য মধ্যস্থতা করতে হবে কেন? তিনিতো তার কর্মকাণ্ড দিয়ে বুঝিয়ে দেবেন তিনি নিরপেক্ষ। তার কর্মই রাজনৈতিক দলগুলোকে তার দিকে টেনে নেবে। তার অধীনে উৎসাহ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে। আর তিনি যে সরকারের আজ্ঞাবহ নন তিনি তার কাজ দিয়েই বুঝিয়ে দেবেন। উনার লক্ষ্য থাকতে হবে সব দলকে নিয়ে সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দেয়া। যেন দেশবাসী তাকে সম্মানের সঙ্গে চিরদিন মনে রাখেন। তিনি কেন ঢোল বাজিয়ে বলবেন, কোনো রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে আনতে মধ্যস্থতা করব না। এটা আমাদের কাজ নয়। কথা হলো- আপনাদের কাজটুকুই শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে করুন। সিইসির কথায় নির্বাচন ভণ্ডুল হলে তার দায় তাকেই নিতে হবে। সরকারকে নয়। সরকার তখন চিৎকার করে বলবে- নির্বাচন করা ইসির কাজ সরকারের নয়। এর দায়ও ইসির। কাজেই সাবধান। কথা কম বলে কাজ করে দেখান। দেশবাসী যে আস্থার সংকটে ভুগছে তা থেকে তাদের বের করে আনুন। আর তা না করে নির্বাচন কমিশন ঠুুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকতে চাইলে তাও পারবেন। মুকুটহীন রাজাও সাজতে পারবেন। কথা একটিই, ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপিত হবেন। এখানে এসে  সেই গল্পটির কথাই মনে পড়ে গেছে। এক লোকের বড় শখ রান্না শেখার। এজন্য তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। রেডিও কিনেছেন। প্রতিদিন দুপুরে রেডিওর রান্না-বান্নার অনুষ্ঠান শুনে তিনি রান্না করেন। একদিন দুপুরে পাশের রুমে রেডিও রেখে রান্না করতে  গেছেন।  রেডিওতে উপস্থাপক বলছেন, এখন চুলায় পাতিল দেন। একটু গরম হলে এতে তেল ঢালুন। নির্দেশনা অনুযায়ী লোকটি কাজ করছেন। এবার উপস্থাপক বলছেন, তেল গরম হয়ে গেলে পিয়াজ ঢালুন। আস্তে  আস্তে নাড়তে থাকুন। পিয়াজের রঙ লালচে হয়ে উঠলে এতে মরিচ, হলুদ, ধনেগুঁড়া পানিতে মিশিয়ে ঢেলে দিন। এবার নাড়তে থাকুন। বেচারা নাড়ছে। ওদিকে তার ছেলে দৌড়ে বাসায় এসেছে। ছেলের শখ হলো ব্যায়াম করা। রুমে ঢুকে  রেডিও’র বাটন অন্য চ্যানেলে ঘুরিয়ে দেন।  সেখানে ব্যায়াম শেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে এবার পা সামনের দিকে বাড়ান। রান্নাঘরে ওই ভদ্রলোক পা সামনের দিকে বাড়ালেন। এবার বলা হলো, জোরে একটি লাথি দিন। সঙ্গে সঙ্গে বেচারা চুলার উপরে রাখা পাতিলে জোরে লাথি দিলেন। আর যায় কোথায়? তার পা পুড়ে গেছে। সব কিছু সাজিয়ে এনে শেষ মুহূর্তে রান্নাও ভেস্তে গেছে। নির্বাচন কমিশনকে কেউ যাতে বাটন ঘুরিয়ে অন্য পথে নিয়ে যেতে না পারে সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

শিফাত জামিলুর রব

২০১৭-০৮-১৯ ০৬:৫২:৩৬

নির্বাচন কমিশন যদি আগে থেকেই বাটন ঘোরানো দশায় থাকে তবে আর অরণ্যে রোদনে লাভ কী?

আপনার মতামত দিন

জিন্দাপার্ক নিয়ে দ্বন্ধের জেরে সংঘর্ষ, আহত ৫

টাইম ম্যাগাজিন নিয়ে আবার বিতর্কে ট্রাম্প

চট্টগ্রামে নারীঘটিত কারণে আইনজীবি খুন

‘নতুন বাকশাল দেখছি’

আওয়ামী লীগ নেতারা হিন্দুদের সম্পদ দখল করছে

মিশরে বিপুল সংখ্যক ‘হামলাকারী’ নিহত

বারাক ওবামাকে হত্যার পরিকল্পনাকারী গ্রেপ্তার

কীভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারকের পদ হারালো বৃটেন?

‘ডিপ্লোম্যাটিক মাইনফিল্ডে’ আসছেন পোপ, তাকিয়ে বিশ্ব

গুম আর জোর করে গুম এক নয়

‘দুর্নীতি বাড়ার জন্য রাজনীতিবিদরা দায়ী’

রংপুর ও রাজশাহীতে শীত বাড়ছে

‘ভারত ও চীন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাড়ি ঘর নির্মাণে সহায়তা করবে’

দিনাজপুরে পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত: যাত্রীদের চরম দূর্ভোগ

‘শেষ মুহূর্তে হলে সরকার সমঝোতায় আসবে’

রবি-সোমবার সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতি