হঠাৎ ঘড়ঘড় আওয়াজ তারপর চলে যাওয়া

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, কলকাতা থেকে ফিরে | ১৮ আগস্ট ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৩৬
দূর পরবাস থেকে কলকাতাকে চেনার উপায় কী? চোখ বন্ধ করে একটা কথাই মনে হবে, ট্রাম। ট্রামের শহর কলকাতা। আদতে কি তাই? এখন চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। আগের মতো ট্রামের সেই জৌলুশ নেই। পড়ন্ত দুপুরে অফিস ফেরত নানান পরিবহনজটেও ট্রাম চলেছে একাকী। যাত্রীশূন্য এই ট্রামগুলো এখন নামকাওয়াস্তে পথে নামে প্রতিদিনই।
তিনবারের কলকাতা ভ্রমণে আমি প্রথম যাই ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে। তখন কলকাতা ছিল বাম শাসনে। সবকিছু ছিল একধরনের নীতি-নৈতিকতা নির্ভর। কলকাতায় বসবাসের খরচ ছিল একেবারেই কম। পুঁজির কোনো আওয়াজ তখন ছিল না। দুই দশকের দেখা কলকাতাকে চেনা সত্যিই কঠিন। তিন দশকের বাম শাসনের অবসানে কলকাতা এক নতুনরূপে এগিয়ে চলেছে। দাদার শহর এখন দিদির দখলে। সবকিছুতেই দিদির নির্দেশিত রঙের ছোঁয়া। পুরো শহরে সাদা আর নীলের রঙে ছেয়ে যাওয়া। দমদমে সুভাষ বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে এগুতে থাকলেই চোখে পড়বে কেবলই দিদির একচ্ছত্র রাজত্ব। তিন দশকের বাম শাসনের ছিটেফোঁটাও এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে গিয়ে কলকাতাকে একেবারেই অচেনা মনে হচ্ছিল। বাম শাসনের সময়ে যে মূল্যবোধ নির্ভর এক সমাজ ছিল, এখন তা মিইয়েছে। শহর খুব দ্রুত পথ চলছে। প্রভাতের রবির কর থেকে মধ্যরাতের চাঁদমণি পর্যন্ত এই শহর ছুটছে। আর প্রতি ঘণ্টায় রঙ বদলে যাচ্ছে এই শহরের। এই শহর যেন এক তারুণ্যের দুর্বিনীত ছুটে চলা। প্রতিটি অলিগলি যেন ছুটছে। তবে সকলেই এক অদৃশ্য নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রথম কলকাতা ভ্রমণে ধর্মতলা থেকে মহাত্মা গান্ধী রোড ধরে কলেজ স্ট্রিটে চলে গিয়েছিলাম ট্রামে করে। ট্রামের চলার মজাই আলাদা। হঠাৎ রাস্তায় নেমে যাওয়া আবার এভাবেই ঝড়ো হাওয়ায় উঠে পড়া যায়; যা অন্য কোনো বাহনে একেবারেই অসম্ভব। এবারও একটিবার ট্রামে চড়বো ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ট্রামের বেশকিছু পথ সংক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ায় ওঠা হয়নি। আর যখনই সামনে দিয়ে ট্রামের চলে যাওয়া দেখেছি, প্রায় যাত্রীশূন্য দেখেছি। ওবের আর ওলার যুগে, মেট্রোরেলের নীরব বিপ্লবের কালে কে আর অপেক্ষায় থাকে ধীরগতি ট্রামের। তাইতো ট্রামের কন্ডাকটররা খুচরো পয়সার ঝোলা কাঁধে নিয়ে হতাশ বদনে ট্রামের দরোজায় নির্বিকার ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। ভেতরে একজন-দুজন বৃদ্ধ বা অবসরে যাওয়া নীরস সময় কাটানো মানুষেরাই চলছে ট্রামে। একাধিক কলকাতাবাসীর সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, ট্রামে এখন আর তেমন একটা চলাচল নেই। কে অপেক্ষায় থাকবে এই বৃদ্ধ সিংহের জন্য। তাইতো হঠাৎ আড়মোড়া ভাঙার মতো দিনে অল্প কিছু রুটে চলে ট্রাম। দিন যত যাচ্ছে এর প্রয়োজনীয়তা তত কমছে। বড় বড় উড়াল পথ আর মেট্রোরেলের হাজার কোটি টাকার বাজেটের দাপটে ট্রাম তার পথ গুটিয়ে নিচ্ছে নীরবে। তবু ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকরা কলকাতার পথে ট্রাম দেখতে চান। খুঁজে ফেরেন তাদের কল্পনা বিলাসী এই বাহনটিকে। ইতিহাসের পেছন ফিরলে দেখা যায়, ১৮৭৬ সালে ঘোড়ায় চালিত ট্রাম চলে কলকাতা শহরে। পরে ১৯০২ সালে যুক্ত হয় বিদ্যুৎচালিত ট্রাম। চলেছিল এসপ্ল্‌্যানেড বর্তমানে ধর্মতলা থেকে খিদিরপুর রুটে। তখন পুরো ভারতের মধ্যে কলকাতার ট্রাম ছিল অভিজাত বাহনের একটি। এই শহরের পথ ধরে ভারতের আরও বেশকিছু বড় শহরে ট্রাম শুরু হয়েছিল। সেসব শহরের ট্রাম এখন বিলুপ্ত । কলকাতা শহরের বেশকিছু ট্রাম লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, কলকাতায় ট্রামের ৭টি ডিপো রয়েছে। এগুলো হলো- বেলগাছিয়া, রাজাবাজার, পার্ক স্ট্রিট, গড়িয়াহাট, টালিগঞ্জ, কালীঘাট ও খিদিরপুর। আর টার্মিনাল রয়েছে ৯টি। এগুলো হলো- শ্যামবাজার, গালিফ স্ট্রিট, বিধাননগর, বালিগঞ্জ, এসপ্লানেড, বিবাদীবাগ ও হাওড়া ব্রিজ। ট্রাম থাকবে না থাকবে- এ বিতর্ক রয়েছে খোদ রাজ্য সরকারসহ নাগরিক মহলে। অনেকেই ঐতিহাসিক ও পর্যটন গুরুত্বের জন্য ট্রাম রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। বাম সরকারের বিদায়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসে ঘোষণা দিয়েছিল, এসি ট্রাম সার্ভিস চালু করবে। আর এই ট্রামগুলোকে চলমান রেস্তেরাঁর আদল দেয়া হবে। যেখানে পর্যটকদের জন্য থাকবে বাড়তি সুবিধা। তারা কলকাতা শহর ঘুরে দেখার পাশাপাশি সুবিধা পাবেন চা কফিসহ মুখরোচক নানান খাবার প্রাপ্তির।
কলকাতার গর্বের ট্রামকে বাঁচাতে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী মেলবোর্ন থেকে ছুটে এসেছিলেন কলকাতায় মিক ডগলাস। নিজে তিনি চারুশিল্পী। চারুশিল্পের স্পর্শে রঙিন করে তুলেছিলেন ট্রামকে। ট্রামযাত্রার সূচনাও করেছিলেন মেলবোর্ন ও কলকাতাকে বুকে ধরে। মেলবোর্নে এখনও সগর্বে চলছে ট্রাম।
ট্রামকে নিযে কলকাতার প্রবীনেরা কত স্মৃতি ধরে রেখেছেন। অবশ্য কলকাতায় ট্রামের এই সুদীর্ঘ ইতিহাসে সে সাক্ষী থেকেছে এক ট্রাজিক ঘটনার। রাসবিহারী এভেনিউয়ে এক পড়ন্ত বিকেলে আনমনে ট্রামলাইনের পথ পেরোতে গিয়ে ট্রামের চাকায় পিস্ট হয়ে মৃত্যু বরণ করেছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। সেই ক্ষত ভোলার নয়।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Iqbal

২০১৭-০৮-১৭ ২১:৪৭:১২

Excellent.

আপনার মতামত দিন

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা

বিছানায় তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেসুতের বড়ছেলের মৃতদেহ

গোয়া: যৌন ব্যবসায়ও আধার কার্ড

ট্রাম্প শিবিরের হাজার হাজার ইমেইল মুয়েলারের হাতে

পেট্রলবোমায় দুজন দগ্ধ

যেভাবে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হন আকায়েদ উল্লাহ

ঝন্টুর পেশা রাজনীতি

রিয়াল মাদ্রিদই চ্যাম্পিয়ন

‘জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা অবশ্যই বাতিল করতে হবে’

উড়ে গেল টটেনহ্যমও

ছায়েদুল হকের জানাজা সম্পন্ন

ভারতে 'ছয় মাসের মধ্যে' ধর্ষকদের ফাঁসির দাবি করলেন নারী অধিকারকর্মী

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিক পাচার চক্র, কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে ৬০০ কর্মকর্তা বদলি

জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে নোটিশ জারিতে ইন্টারপোলের অস্বীকৃতি

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ