কিসিঞ্জার শিরার মতো অভিনাশী ক্যান্সারের মতো দূরারোগ্য

বই থেকে নেয়া

| ৩০ জুলাই ২০১৭, রবিবার
তিনি খ্যাতিমান, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অতি সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। তাকে বলা হয় সুপারম্যান, সুপারস্টার। বহু অসাধ্য সাধন করেছেন তিনি, অসম্ভব চুক্তিতে উপনীত হয়েছেন। যখন ইচ্ছা মাও সে তুং-এর সাথে সাক্ষাৎ বা ক্রেমলিনে প্রবেশ করেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের শয়নকক্ষে গেছেন প্রয়োজনে এবং নিদ্রা থেকে জাগ্রত করেছেন। তার কর্মকুশলতার কাছে জেমস বন্ডকেও আকর্ষণহীন মনে হয়।
জেমস বন্ডের মতো তিনি গুলি করেননি, চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়েননি, কিন্তু যুদ্ধ সম্পর্কে মন্ত্রণা দিয়েছেন, যুদ্ধ সমাপ্ত করেছেন। তিনি স্বনামখ্যাত হেনরী কিসিঞ্জার।
১৯২৩ সালে জার্মানির ফুরথে এক ইহুদি পরিবারে হেনরী কিসিঞ্জারের জন্ম। তার পিতা লুইস কিসিঞ্জার ছিলেন স্কুলশিক্ষক। মায়ের নাম পওলা কিসিঞ্জার। তাদের পরিবারের চৌদ্দজন সদস্য কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে মারা যাবার পর হেনরী কিসিঞ্জার তার পিতা-মাতা ও ভাই ওয়াল্টারের সাথে ১৯৩৮ সালে পালিয়ে আসেন লন্ডনে এবং সেখান থেকে নিউ ইয়র্কে। তখন তার বয়স পনের এবং জার্মান নাম ছিল হেইনজ। আমেরিকায় আসার পর তার পিতা পোস্ট অফিসে কাজ করতেন এবং মা একটা বেকারি চালু করেছিলেন। হেনরী পড়াশুনায় এতটা ভালো ছিলেন যে, তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান এবং স্পেঙ্গলার, টয়েনবি ও কাণ্টের উপর থিসিস লিখে অনার্সসহ ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি হার্ভার্ডেই প্রফেসর হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর তিনি জার্মানিতে গিয়েছিলেন এবং সামরিক বাহিনীতেও যোগ দেন। মেধা ও বিচক্ষণতার কারণে তাকে জার্মান শহর ক্রেফেলড-এর সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়। এখানেই রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট কেনেডি ও প্রেসিডেন্ট জনসনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সময় তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় শক্তিধর ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। তাকে ছাড়া নিক্সনের ভূমিকা ছিল না। সে জন্যে কিসিঞ্জারের দ্বিতীয় নাম দাঁড়িয়েছিল নিক্সিঞ্জার। নিক্সনের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্তে কিসিঞ্জারের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। তিনি একাধারে অ্যামব্যাসেডর, সিক্রেট এজেন্ট, মুখ্য আলোচক, প্রকৃত প্রেসিডেন্ট, যিনি হোয়াইট হাউসকে ব্যবহার করতেন নিজের বাসভবন হিসেবে।
কিসিঞ্জার হোয়াইট হাউসে ঘুমাতেন। কিন্তু বাইরে তাকে দেখা যেতো অভিনেত্রী, সংগীত শিল্পী, মডেল, মহিলা সাংবাদিক, নর্তকী এবং ধনী মহিলাদের সঙ্গে। বলা হয়, মেয়েদের তিনি তেমন তোয়াক্কা করতেন না। নারীসঙ্গের আবশ্যকতা তার কাছে প্রমোদনের জন্যেই। এ ব্যাপারেও তিনি আমেরিকায় আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন। চশমার মোটা কাঁচ, কোঁকড়া চুল, ধূসর স্যুট এবং নীল নেকটাই ছিল তার ফ্যাশনের অংশ। প্রেসিডেন্ট নিক্সন যখন লজ্জায় ও ধিক্কারে পদত্যাগ করেন, তখন অনেকে বলেছিলেন, কিসিঞ্জারেরও পতন হবে। তা হয়নি। তিনি যেখানে ছিলেন সেখানেই থাকলেন প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের ক্ষমতাশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে। কোনো কম্পন তাকে স্পর্শ করেনি। শিরার মতোই তিনি অবিনাশী অথবা ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য। আসলে কিসিঞ্জার নিজেই এক রহস্য। তার সবকিছুই যেন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে। সচরাচর ঘটে যে, কেউ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠে, তার সম্পর্কে যতো জানা যায়, তাকে উপলব্ধি করা যায় ততো কম। ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার তিনি দেন না। শুধু প্রশাসন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন। আমি শপথ করে বলছি, আমি কোনোদিন বুঝবো না যে কেন তিনি আমার সাথে সাক্ষাৎকারে সম্মত হলেন। আমার চিঠি পাওয়ার তিনদিন পর তিনি এ সম্মতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন যে, ১৯৬৯ সালে হ্যানয়ে জেনারেল গিয়াপের সাথে সাক্ষাৎকারের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। হতে পারে। কিন্তু রাজি হওয়ার পরও তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টে একটি শর্তে আমাকে সাক্ষাৎকার দিতে চাইলেন যে, তিনি আমাকে কিছুই বলবেন না। যা হোক, সাক্ষাৎকারের সময় স্থির হলো ১৯৭২ সালের ২রা নভেম্বর বৃহস্পতিবার। আমি তাকে আসতে দেখলাম নিরাসক্তভাবে, মুখে হাসির লেশমাত্র নেই। বললেন, “গুড মর্নিং, মিস ফ্যালাচি।” তাকে অনুসরণ করে প্রবেশ করলাম তার সুসজ্জিত অফিসে। বইপত্র, টেলিফোন, কাগজপত্র, বিমূর্ত চিত্রকর্ম, নিক্সনের ছবি সে কক্ষে। আমার উপস্থিতি মুহূর্তে বিস্মৃত হয়ে উল্টো দিকে ফিরে একটা রিপোর্ট পড়তে শুরু করলেন। কক্ষের মাঝখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা বিরক্তিকর। তদুপরি তিনি পেছন ফিরে আছেন। রীতিমতো অভদ্র আচরণ। ভালো হলো, আমাকে বুঝে উঠার আগে আমি তাকে বুঝতে পারলাম। আমি আবিষ্কার করলাম, কিসিঞ্জার আকর্ষণীয় নন। খাটো, স্থ’ূলকায় এবং মেষের মতো বড় মাথাবিশিষ্ট। কারো মুখোমুখি হতে তিনি সময় নেন।
রিপোর্ট পাঠ শেষ করে তিনি আমার দিকে ফিরলেন এবং বসতে বললেন। তার বসার স্থান আমার থেকে উঁচুতে। মনে হলো একজন প্রফেসর তার ছাত্রের সাথে কথা বলছেন, যার উপর তার আস্থা কম। তাকে দেখে আমার অঙ্ক ও ফিজিক্স শিক্ষক লিসেও গ্যালিলির কথা মনে পড়লো, যাকে আমি ঘৃণা করি। চশমার আড়াল থেকে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি আমার ভয় উৎপাদন করতেন। কিসিঞ্জারের প্রতিটি প্রশ্নে আমার মনে হচ্ছিল, আমি কি উত্তরটা জানি? তার প্রথম প্রশ্ন ছিল জেনারেল গিয়াপ সম্পর্কে। “আমি তো তোমাকে বলেছি, কখনো আমি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার দেই না। তোমাকে সুযোগটা দেয়ার কারণ, আমি গিয়াপের সাথে তোমার সাক্ষাৎকার পড়েছি। চমৎকার। আচ্ছা, গিয়াপ দেখতে কেমন?” আমি উত্তর দিলাম, “আমার কাছে মনে হয়েছে ফরাসি ইতর। ক্ষ্যাপা লোক। আসলে লোকটা বৃষ্টিমুখর দিনের মতোই বিরক্তিকর। গিয়াপ সাক্ষাৎকার দেয়নি, বক্তৃতা দিয়েছে। তবে যাই বলুক, তার কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছে।”
“কোন্টা সত্য?” আমি বললাম যে, গিয়াপ ১৯৬৯ সালেই ঘোষণা করেছিলেন যে, ১৯৭২ সালে কি ঘটবে?
“যেমন?”
“এই ধরুন, তার কথা ছিল, আমেরিকানরা ধীরে ধীরে ভিয়েতনাম থেকে গুটিয়ে নেবে এবং যে যুদ্ধের বিপুল ব্যয় শিগগিরই আমেরিকাকে মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি করবে।”
পনের মিনিট কথাবার্তার পর আমি ক্ষুব্ধভাবে আমার নখ কামড়ে ভাবছিলাম, কেন কিসিঞ্জারের সাথে এই অসম্ভব সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। একটু পর তিনি একজন আগ্রহী রিপোর্টারের মতো জানতে চাইলেন যেকোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে আমার সাক্ষাৎকার সবচেয়ে আনন্দদায়ক হয়েছে বা কোনো রাষ্ট্রপ্রধান আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছেন। তিনি ভুট্টো সম্পর্কে মতৈক্যে পৌঁছলেন, “অত্যন্ত বিচক্ষণ, মেধাসম্পন্ন।” কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে তার অভিমত ভিন্ন, “সত্যিই কি তাকে তোমার ভালো লেগেছে?” ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তিনি নিক্সনকে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন সে ব্যাপারে সাফাই দেয়ার চেষ্টা না করে তিনি পাকিস্তানিদের পক্ষে বললেন, যারা যুদ্ধে হেরে গিয়েছিল। অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের কারো সম্পর্কে যখন বললাম যে, আমার কাছে তাকে বুদ্ধিমান মনে না হলেও তাকে আমার ভালো লেগেছে, তখন কিসিঞ্জার বললেন, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য বুদ্ধি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রপ্রধানের যোগ্যতা বিচারের মাপকাঠি হচ্ছে শক্তি। সাহস, ধূর্ততা ও শক্তি।
এই বক্তব্য থেকে কিসিঞ্জারের বৈশিষ্ট্য, তার ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠে। সবার উপরে তিনি ভালোবাসেন শক্তি। বিচক্ষণতা তাকে কমই আগ্রহী করে। যদিও তিনি নিজে বিচক্ষণ এবং তার সাথে যোগ হয়েছে ধূর্ততা। শেষদিকে তিনি যে প্রশ্নটা করলেন, আমি তা আশা করিনি, “যুদ্ধ বিরতি হলে ভিয়েতনামে কি ঘটবে বলে তোমার ধারণা?”
বিস্মিত হলেও আমি সত্য কথাটাই বললাম, “একটা বড় ধরনের রক্তপাত ঘটবে। দু’পক্ষেই এবং যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। আর এই রক্তপাত শুরু করবে আপনার বন্ধু থিউ।” তিনি প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, একটু আহত হলেন, “আমার বন্ধু। কিন্তু কেন?”
“ভিয়েতকংরা রক্তপাত শুরুর পূর্বে থিউ কারাগারগুলোতে গোপনে হত্যাকা- চালাবে। যুদ্ধ বিরতির পর অস্থায়ী সরকার গঠনের মতো নিরপেক্ষ বা ভিয়েতকং পাওয়া যাবে না।”
“কিন্তু সেখানে তো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা থাকবে।”
“ড. কিসিঞ্জার, ঢাকায়ও ভারতীয় ছিল। কিন্তু তারা বিহারিদেরকে হত্যা করা থেকে মুক্তিবাহিনীকে বিরত করতে পারেনি।”
কিসিঞ্জার আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাৎকার দেয়ার দিন স্থির করলেন দুইদিন পর ৪ঠা নভেম্বর, শনিবার। এক ঘণ্টা সময় দেবেন তিনি। শনিবার সকাল সাড়ে দশটায় আমি হোয়াইট হাউসে তার অফিসে প্রবেশ করলাম সম্ভবত সবচেয়ে অস্বস্তিকর ও বাজে সাক্ষাৎকার আরম্ভ করার জন্য। প্রতি দশ মিনিট অন্তর টেলিফোন বেজে উঠছিল। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের টেলিফোন। নিক্সন কিছু চাচ্ছিলেন, জিজ্ঞাসা করছিলেনÑ মায়ের নিকট থেকে দূরে যেতে পারে না যেন এমন শিশু। কিসিঞ্জার প্রতিবার উত্তর দিচ্ছিলেন শান্তভাবে, মনোযোগ দিয়ে। আমাদের আলোচনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল বারবার। তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে চমৎকার কথাটা বলার মুহূর্তেই ফোন বাজলো। প্রেসিডেন্ট কয়েক মুহূর্তের জন্য তাকে ডেকেছেন। তিনি আমাকে অপেক্ষা করতে বলে কক্ষের বাইরে গেলেন। দু’ঘণ্টা অপেক্ষার পর তার অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে জানালেন, প্রেসিডেন্ট ক্যালিফোর্নিয়া যাচ্ছেন এবং কিসিঞ্জারকেও যেতে হবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পূর্বে তিনি ওয়াশিংটন ফিরবেন না। আমার সন্দেহ হলো সাক্ষাৎকার সমাপ্ত করতে পারবো কিনা। আমি নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলে হয়তো অনেক কিছুই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যেতো।
ভিয়েতনাম সম্পর্কে তিনি আমাকে বেশি কিছু বলতে পারেননি। তার বক্তব্য পুরোটাই বলেছেন। যুদ্ধ সমাপ্ত হবে অথবা অব্যাহত থাকবে তা শুধু কিসিঞ্জারের উপর নির্ভর করতো না। অপ্রয়োজনীয় কথা বলে সবকিছু আপোষ করে ফেলার বিলাসিতা তার ধাতে সয় না। যখনই তাকে স্পষ্ট কিছু জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি বাইন মাছের মতো পিছলে গেছেন। বরফের চেয়েও শীতল সে বাইন মাছ। ঈশ্বর, এমন শীতল মানুষও হয়। সাক্ষাৎকারের সময়েও তার প্রকাশ ছিল অপরিবর্তিত। কঠোর দৃষ্টি, বিষাদপূর্ণ কণ্ঠস্বর, একঘেয়ে। সাধারণত প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের সাথে টেপ রেকর্ডারের কাঁটা নড়ে উঠে উচ্চ লয় থেকে নিচু লয়ে। কিন্তু কিসিঞ্জার যখন বলছিলেন কাঁটা নড়েনি। একাধিকবার আমাকে চেক করতে হয়েছে যে, রেকর্ডার চলছে কিনা। ছাদের উপর বৃষ্টি পড়ার শব্দ যেমন অবসান আনে, তার কণ্ঠস্বরও তেমন। এবং তার চিন্তার ক্ষেত্রে কোনো ইচ্ছা, কৌতুক, ভ্রান্তির উত্তেজনা কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। তার সবকিছু যেন সুপরিকল্পিত, স্বয়ংক্রিয় পাইলট চালিত বিমানের মতোই নিয়ন্ত্রিত। তার প্রতিটি বাক্য যেন পরিমাপ করা। তিনি যাই বলেন, সবই কাজের কথা। দাবা খেলোয়াড়ের মতো স্নায়ু ও মস্তিষ্ক কিসিঞ্জারের।
হেনরী কিসিঞ্জার একজন ইহুদি ও জার্মান। তিনি এমন এক দেশে বাস করেন যে দেশ ইহুদি ও জার্মানদের এখনো সন্দেহের চোখে দেখে। তিনি বয়ে বেড়ান স্ববিরোধিতার বোঝা, ক্ষোভ এবং সম্ভবত লুকায়িত মানবতা। আমাদেরকে বিস্মৃত হলে চলবে না যে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যর্থ ও নিন্দিত প্রেসিডেন্টের আমলেই কিসিঞ্জারের সাফল্য এসেছে। নিক্সন একজন প্রবঞ্চক ও মিথ্যাবাদী। রুগ্ণ স্নায়ু ও অসুস্থ মনের ব্যক্তি। ভুললে চলবে না যে, কিসিঞ্জার আসলে নিক্সনেরই সৃষ্টি। নিক্সনের অস্তিত্ব যদি না থাকতো, তাহলে আমরা হয়তো জানতামই না যে, কিসিঞ্জারের জন্মই হয়েছিল। তিনি বহু বছর ধরে আরো দু’জন প্রেসিডেন্টের সাথে কাজ করেছেন। কিন্তু তাদের কেউই তাকে অতোটা গুরুত্ব দেননি। তিনি এমন একজন গভর্নরের পছন্দনীয় ছিলেন, যিনি বুদ্ধি বিবেচনায় খ্যাতিমান ছিলেন না, বিপুল অর্থবিত্তের কারণে রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছিলেনÑ নেলসন রকফেলার। পরে রকফেলারই তার সম্পর্কে নিক্সনের কাছে সুপারিশ করেন। কিন্তু নিক্সনের যখন দুর্দিন, তখন অবলীলায় কিসিঞ্জার পরিত্যাগ করেছিলেন নিক্সনকে। ক্যালিফোর্নিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নিক্সনকে দেখতেও যাননি। বরং তল্পিতল্পাসহ তার উত্তরাধিকারী ফোর্ডের কাছে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কিসিঞ্জার তার কাজ অব্যাহত রাখেন।
কথাটা এভাবেও বলা যায়Ñ কিসিঞ্জার একজন উচ্চাভিলাষী বুদ্ধিজীবী। কিন্তু তার সাফল্য আকস্মিক। তার দেয়া সমাধান, আশাবাদ কোথাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তার বড় ধরনের ভুলও ধরা পড়েছে। ভিয়েতনামে তার শান্তি প্রচেষ্টা সমস্যা নিষ্পত্তি বা যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। কম্বোডিয়ায় তার শান্তি চুক্তি ভুয়াÑ নিক্সনের মুখরক্ষার জন্য করা হয়েছিল। আরব ও ইসরাইলের মধ্যে তার মধ্যস্থতা মধ্যপ্রাচ্যের দুঃখজনক পরিস্থিতিকে বিন্দুমাত্র লাঘব করতে পারেনি। যখন তিনি মধ্যপ্রাচ্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলেন তখন উত্তেজনা রূপ নিলো যুদ্ধে। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ইয়াসির আরাফাতকে অভ্যর্থনা জানান হলো জাতিসংঘে। বাদশাহ হোসেনকে পশ্চিম তীরের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো। কিসিঞ্জারের কারণে সাইপ্রাস পরিস্থিতি বিস্ফোরিত হয়েছিল। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের হারিয়েছেন।
ওরিয়ানা ফ্যালাচি: আমি খুব বিস্মিত হবো যদি আপনি আমাদের মতো হতাশায় ভোগেন। মি. কিসিঞ্জার, সত্যিই কি আপনি হতাশ?
হেনরী কিসিঞ্জার: হতাশ? কেন? এমন কি ঘটেছে যে, আমাকে হতাশ হতে হবে?
ও. ফা.: কিছু বিষয় তো নিশ্চয়ই সুখের নয়। যদিও আপনি বলেছিলেন, উত্তর ভিয়েতনামের সাথে একটি চুক্তি হয়েছে। কিন্তু শান্তি আসেনি। যুদ্ধ আগের মতোই চলছে বরং পরিস্থিতি আরো খারাপ।
হে. কি.: শান্তি আসবেই। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বা তারও কম সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। গত কয়েক মাস ধরে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তোমরা রিপোর্টাররা আমাদের বিশ্বাস করছো না। তোমরা বলছো ওরা আলোচনায় আসবে না। এরপর হঠাৎ করেই চিৎকার শুরু করলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে। এখন বলছো, শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। একথা বলার মাধ্যমে তোমরা প্রতিদিন আমাদের তাপমাত্রা পরিমাপ করছো, দিনে চারবার এবং এটা করছো হ্যানয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে। মনে রেখো, হ্যানয়ের দৃষ্টিকোণ আমি জানি। উত্তর ভিয়েতনামীরা চেয়েছিল, আমরা ৩১শে অক্টোবরের চুক্তিতে স্বাক্ষর করি যেটা একই সময়ে যৌক্তিক এবং অযৌক্তিক। না, এ ব্যাপারে আমি কোনো বিতর্কে যেতে চাই না।
ও. ফা.: কিন্তু আপনি তো ৩১শে অক্টোবরের চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।
হে. কি.: ওরা তারিখটার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করছিল। আমরা সে সময়ের মধ্যে আলোচনাটা শেষ করতে চেয়েছিলাম। আসলে আমরা এমন একটা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে চাইনি যা অস্পষ্ট। কিন্তু আমি হতাশ নই। হ্যানয় যদি চুক্তি ভঙ্গ করে বা চুক্তির কিছু পরিবর্তনে অস্বীকৃতি জানায় তাহলেই আমি হতাশ হবো।
ও. ফা.: কিন্তু মনে হচ্ছে তারা সত্যি সত্যিই অনড় মনোভাব গ্রহণ করেছে। কঠোর পথ নিয়েছে এবং আপনার বিরুদ্ধে মারাত্মক, প্রায় অপমানজনক সব অভিযোগ তুলছে।
হে. কি.: ওগুলো অর্থহীন। আগেও এমন ঘটেছে, কিন্তু আমরা গুরুত্ব দেইনি। কঠোর পন্থা, মারাত্মক অভিযোগ, এমনকি অপমান-সবই স্বাভাবিক পরিস্থিতির অংশ। ৩১শে অক্টোবর থেকে আমরা চুপচাপ বসে আছি। রিপোর্টাররা প্রশ্ন করছে রোগী দুর্বল কিনা? কিন্তু আমি তো কোনো দুর্বলতা দেখি না। কমবেশি পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে। আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শান্তি আসবে। কয়েক মাস অথবা কয়েক সপ্তাহ।
ও. ফা.: কিন্তু কখন শুরু হবে সে আলোচনা? সেটাই প্রশ্ন।
হে. কি.: যখনই লি ডাক থো আমার সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা পোষণ করবেন তখন। আমি তার আহ্বানের প্রতীক্ষা করছি। কিন্তু ভিয়েতনাম প্রসঙ্গে আমি বেশি বলতে চাই না। আমার মুখ থেকে একটা শব্দ বেরুলে সেটাই সংবাদ হয়ে যায়। শোন, নভেম্বরের শেষদিকে আবার আমাদের সাক্ষাৎ হলে কেমন হয়?
ও. ফা.: ড. কিসিঞ্জার, বিষয়টা এখনই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ থিউ আপনার সাথে কথা বলতে সাহস করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের ক্লিপিংটা দেখুন। থিউ-এর উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে এতে, ‘কিসিঞ্জারকে জিজ্ঞাসা করুন যে, কোন্ প্রশ্নে আমরা বিভক্ত। আমি যে দিকগুলো গ্রহণ করিনি সেগুলো কি?’
হে. কি. : আমাকে দেখতে দাও...। না, আমি তার প্রশ্নের উত্তর দেব না। তার এই আমন্ত্রণের প্রতি মনোযোগই দেব না।
ও. ফা. : থিউ নিজেই তার উত্তরটা দিয়েছেন ড. কিসিঞ্জার। তিনি বলেছেন, উত্তর ভিয়েতনামী সৈন্যরা দক্ষিণ ভিয়েতনামে থাকবে। আপনি কি মনে করেন থিউকে বুঝাতে সক্ষম হতেন? আপনি কি মনে করেন, আমেরিকা হ্যানয়ের সাথে পৃথক একটি চুক্তিতে পৌঁছবে?
হে. কি. : আমাকে সে প্রশ্ন করো না। দশ দিন আগে আমি প্রকাশ্যে যা বলেছি এখনো আমাকে সে কথাই বলতে হবে। যা ঘটতে পারে বলে আমি মনে করি না সে ধরনের কোনো অনুমান আমি বিবেচনায় আনতে চাই না। এটুকু বলতে পারি, আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ এবং যেকোনোভাবে আমরা শান্তিতে উপনীত হবো। থিউ যা খুশি বলতে পারে। সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার।
ও. ফা. : মি. কিসিঞ্জার, আমি যদি আপনার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে জানতে চাই যে, থিউ ও লি ডাক থো’র মধ্যে আপনি কার সঙ্গে নৈশভোজ পছন্দ করবেনÑ আপনার জবাব কি হবে।
হে. কি.: এ প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি অপারগ।
ও. ফা. : উত্তরটা যদি আমিই দেই যে, আমার মনে হয় লি ডাক থো’র সাথে নৈশভোজই আগ্রহ আপনার বেশি হবে?
হে. কি. : এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই।
ও. ফা.: তাহলে নিশ্চয়ই এ কথার জবাব দেবেনÑ আপনি কি লি ডাক থো’কে পছন্দ করেন?
হে. কি. : হ্যাঁ, অবশ্যই। তাকে দেখেছি তার লক্ষ্যের প্রতি উৎসর্গীকৃত। তিনি দৃঢ়চেতা। সাহসী এবং বরাবরই ভদ্র ও বিনয়ী। কখনো বা অত্যন্ত কঠোর, আলোচনা করাও শক্ত হয়ে উঠে। সে জন্যে তার প্রতি সবসময় আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। আমাদের সম্পর্কটা অত্যন্ত পেশাগত। তবু আমরা হাসি-ঠাট্টা করতেও সক্ষম হয়েছি। আমরা একথা বলেছি যে, একদিন হয়তো আমি হ্যানয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াবো এবং লি ডাক থো হার্ভার্ডে আসবেন মার্ক্সবাদ- লেনিনবাদ শিক্ষা দিতে। আমাদের সম্পর্ককে ভালোই বলতে হবে।
ও. ফা.: থিউ-এর ব্যাপারেও কি আপনি একথাই বলবেন?
হে. কি. : হ্যাঁ, থিউ-এর সঙ্গেও আমার সম্পর্ক ভালো।
ও. ফা.: দক্ষিণ ভিয়েতনামীরা বলে যে, আপনারা, প্রথমে পরস্পর ভালো বন্ধুর মতো আচরণ করেননি।
হে. কি.: আমাদের পরস্পরের যে দৃষ্টিভঙ্গি তা অনিবার্যভাবেই অভিন্ন নয়।
ও. ফা. : থিউ-এর সমস্যার ব্যাপারে আপনি কি আশাবাদী?
হে. কি. : তা তো বটেই। এখনো আমার অনেক করণীয় আছে। আমি নিজেকে ক্ষমতাহীন মনে করি না। নিরুৎসাহী ভাবি না। আমি প্রস্তুত এবং আস্থাবান।
ও. ফা. : আজকের সংবাদপত্রে নিহত এক ভিয়েতকং তরুণের ছবি ছাপা হয়েছে। ঘটনাটা ৩১শে অক্টোবরের দু’দিন পরের। ভিয়েতকংদের মর্টারের গোলায় ভূপাতিত হেলিকপ্টারের ২২ জন আমেরিকান সৈন্য নিহত। এ ঘটনা ৩১শে অক্টোবরের তিন দিন পরের। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর থিউকে অস্ত্রশস্ত্রের নতুন চালান পাঠাচ্ছে। হ্যানয়ও একই কাজ করছে।
হে. কি.: এটা অনিবার্য। যুদ্ধবিরতির পূর্বে সবসময় এ ধরনের ঘটনা ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যেও যুদ্ধবিরতির পূর্বক্ষণে এ ঘটনা ঘটেছিল এবং কমপক্ষে দু’বছর ধরে তা অব্যাহত ছিল। আমরা যখন সায়গনে আরো অস্ত্র পাঠাচ্ছি, তখন উত্তর ভিয়েতনামও দক্ষিণ ভিয়েতনামে অবস্থানরত তাদের বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ দিচ্ছে। এর তেমন কোনো তাৎপর্য নেই। আশা করি ভিয়েতনাম সম্পর্কে তুমি আমাকে কথা বলতে আর পীড়াপীড়ি করবে না।
ও. ফা.: আপনি কি এ ব্যাপারেও কথা বলতে চান না যে, আপনি এবং নিক্সন যে চুক্তিটা মেনে নিয়েছেন, অনেকের কাছে সেটা হলো হ্যানয়ের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া?
হে. কি.: এ ধরনের অভিযোগকে আমি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। আর ভিয়েতনাম নয়। তার চেয়ে মেকিয়াভেলী, সিসেরো সম্পর্কে আমরা কথা বলতে পারি। ভিয়েতনাম ছাড়া যে কোনো বিষয়।
ও. ফা. : তাহলে চলুন, যুদ্ধ সম্পর্কে কথা বলি। ড. কিসিঞ্জার, আপনি কি শান্তিবাদী?
হে. কি.: আমার মনে হয় না যে, আমি শান্তিবাদী। যদিও আমি প্রকৃত শান্তিবাদীদের শ্রদ্ধা করি। যুদ্ধনির্ভর করে কিছু শর্তের উপর। যেমন, হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কোনো জাতিকে যুদ্ধ করতে হয় তাদের বীরত্ব, স্বকীয়তা, বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার জন্য। এগুলো বজায় রাখতে জাতিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।
ও. ফা.: তাহলে ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? আমার বিশ্বাস আপনি কখনো ভিয়েতনামের যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন না।
হে. কি. : কি করে বিরুদ্ধে থাকতে পারি। আমার বর্তমান অবস্থানের পূর্বেও এই যুদ্ধের বিরোধী ছিলাম না। কখনো না।
ও. ফা. : তাহলে কি আপনি শ্লেসিঞ্জারের বক্তব্যকে সঠিক মনে করেন না যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুধু এটাই প্রমাণ করতে সফল হবে যে, পাঁচ লক্ষ আমেরিকান তাদের সকল প্রযুক্তিসহ কালো পাজামা পরা অনুন্নত অস্ত্রধারী লোকদের পরাভূত করতেও অক্ষম।
হে. কি. : সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। যদি প্রশ্নটা এমন হয় যে, ভিয়েতনামে যুদ্ধ জরুরি ছিল কিনা, অথবা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ কিনাÑ তাহলে ইতিহাসই সে রায় দেবে। যখন কোনো রাষ্ট্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন তার পক্ষে এটা বলাই যথার্থ নয় যে, যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত। যুদ্ধ শেষ করতে হলেও কিছু নীতিমালা অনুসারেই করতে হবে। যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সঠিক ছিল এই বক্তব্য থেকে এটা ভিন্নতর।
ও. ফা.: চীনের সাথে যোগসূত্র স্থাপনে আপনার অভিযান সফল হয়েছে। রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগেও আপনি সফল হয়েছেন। ভিয়েতনামেও শান্তি আসছে। এখন আমার একটা প্রশ্ন আছে, যে প্রশ্নটা আমি চন্দ্র অভিযানকারী নভোচারীদেরও করেছিলাম, ‘এরপর কি? চাঁদের পর আপনারা কি করবেন? নভোচারী হিসেবে কাজের বাইরে আপনাদের আর কি করার আছে?’
হে. কি. : নভোচারীরা কি উত্তর দিয়েছিল?
ও. ফা.: তারা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, ‘আমরা দেখবো... আমরা জানি না।’
হে. কি. : আমিও জানি না। এরপর যে কি করবো জানি না। কিন্তু নভোচারীদের মতো আমি দ্বিধাগ্রস্ত নই। আমার জীবনে অনেক কিছু দেখেছি করার মতো।
ও. ফা. : আপনি কি হার্ভার্ডে ফিরে যাবেন?
হে. কি. : যেতেও পারি। তবে খুব সম্ভব যাবো না। আমি কোনোভাবেই এ সিদ্ধান্ত নেইনি যে, বর্তমান পদটা ছেড়ে দেব। এই কাজটা আমি খুব পছন্দ করি এবং তা তোমার জানা।
ও. ফা.: অবশ্যই। ক্ষমতা সবসময় লোভনীয়। ড. কিসিঞ্জার ক্ষমতা আপনাকে কতটুকু প্রভাবিত করে? দয়া করে সত্যি কথাটাই বলবেন।
হে. কি. : তোমার যখন ক্ষমতা থাকবে এবং দীর্ঘদিন ধরে তখন মনে হবে এটা তোমার প্রাপ্যই ছিল। আমি নিশ্চিত যে, আমার এই পদ ছেড়ে যাওয়ার পর আমি ক্ষমতাহীন বলে অনুভব করবো। তবু ক্ষমতাকে অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করার কথা কখনো ভাবিনি। এ ধরনের চিন্তা আমাকে আনন্দিত করে না যে, আমার জন্যে একটা বিমান, চালকসহ গাড়ি সব সময় অপেক্ষমাণ। ক্ষমতা থাকলে অনেক ভালো কাজ করা যায়। অবশ্য ক্ষমতার জন্যে আকাক্সক্ষা আমাকে এই পদে টেনে আনেনি। আমার রাজনৈতিক অতীত দেখলেই বুঝতে পারবে নিক্সন আমার পরিকল্পনা নির্দেশ করেন না। তিনটি নির্বাচনে আমি তার বিরুদ্ধে ছিলাম।
ও. ফা.: আমি জানি। এমনকি একসময় একথাও বলেছিলেন যে, ‘নিক্সনের প্রেসিডেন্ট হবার যোগ্যতা নেই।’ এটা কি নিক্সনের সাথে আপনাকে কখনো অপ্রস্তুত করে?
হে. কি.: নিক্সনের বিরুদ্ধে ঠিক কি বলেছিলাম তা আমার মনে পড়ছে না। তবু ওরকম কিছুই বলেছি। তা যদি বলেই থাকি তাতেও প্রমাণিত হয় যে, সরকারের উঁচু পদ লাভের পরিকল্পনাতেও নিক্সনের সাথে আমার যোগসূত্র ছিল না। অপ্রস্তুত হবার তো প্রশ্ন উঠে না। তখন আমি নিক্সনকে চিনতামই না। তিনি যখন আমাকে দায়িত্ব দিতে চাইলেন, আমি তখন তার সম্মুখে যাইনি। তার প্রস্তাবে আমি হতবাক হয়েছিলাম। কারণ তিনি জানতেন যে, আমি কখনো তার প্রতি বন্ধুত্ব বা সমবেদনার ভাব দেখাইনি। সত্যি তিনি আমাকে ডেকে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।    (চলবে)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

জিন্দাপার্ক নিয়ে দ্বন্ধের জেরে সংঘর্ষ, আহত ৫

টাইম ম্যাগাজিন নিয়ে আবার বিতর্কে ট্রাম্প

চট্টগ্রামে নারীঘটিত কারণে আইনজীবি খুন

‘নতুন বাকশাল দেখছি’

আওয়ামী লীগ নেতারা হিন্দুদের সম্পদ দখল করছে

মিশরে বিপুল সংখ্যক ‘হামলাকারী’ নিহত

বারাক ওবামাকে হত্যার পরিকল্পনাকারী গ্রেপ্তার

কীভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারকের পদ হারালো বৃটেন?

‘ডিপ্লোম্যাটিক মাইনফিল্ডে’ আসছেন পোপ, তাকিয়ে বিশ্ব

গুম আর জোর করে গুম এক নয়

‘দুর্নীতি বাড়ার জন্য রাজনীতিবিদরা দায়ী’

রংপুর ও রাজশাহীতে শীত বাড়ছে

‘ভারত ও চীন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাড়ি ঘর নির্মাণে সহায়তা করবে’

দিনাজপুরে পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত: যাত্রীদের চরম দূর্ভোগ

‘শেষ মুহূর্তে হলে সরকার সমঝোতায় আসবে’

রবি-সোমবার সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতি