ভুট্টো বললেন চলুন জাহান্নামে যাই

বই থেকে নেয়া

| ২৮ জুলাই ২০১৭, শুক্রবার
ও. ফা. : তাকে মুক্তি দিয়ে আপনি কি কখনো অনুতাপ করেছেন?
জু. আ. ভু.: না, কখনো না। তিনি যাই বলুন না কেন, আমার মতো তিনিও একজন পাকিস্তানি। একাধিকবার আমরা একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছি, একই শাস্তি লাভ করেছিÑ কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমাদের একটা বন্ধন রয়েছে। জানুয়ারির একটি দিনে আমি তাকে যেমন দেখেছি সেভাবে তাকে সব সময় স্মরণ করি, তিনি আমার হাত ধরে অনুনয় করেছেন, ‘আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান।’ তার জন্যে আমি আসলেই করুণা অনুভব করি। বেচারী মুজিবÑ বেশিদিন পারবে না। আট মাস, বড় জোর এক বছরÑ এরপরই তাকে অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি হজম করতে হবে, যা তার নিজেরই সৃষ্টি।
আপনিই দেখুন, বাংলাদেশ এখন ভারতের একটি স্যাটেলাইট। শিগগিরই এটা সোভিয়েত ইউনিয়নের স্যাটেলাইট হবে। কিন্তু শেখ মুজিব কমিউনিস্ট নন। তিনি যদি গুছিয়ে উঠতে পারেন তাহলে তো কথা নেই, কিন্তু পারবেন বলে মনে হয় না। সে অবস্থায় তার পিঠের উপরে দেখবেন মাওবাদীদের, যারা যুদ্ধের আসল বিজয়ী। এখনই তারা তার বোঝা হয়ে আছে।
রাজনৈতিকভাবে মুক্তিবাহিনী হিসেবের বাইরে। তাদের না আছে কোনো আদর্শিক প্রস্তুতি, না আদর্শনিষ্ঠা অথবা শৃঙ্খলা। সামাজিকভাবে তারা গোলযোগের উৎসÑতারা কেবল জানে কিভাবে শূন্যে গুলি করতে হয়। মানুষকে আতঙ্কিত করে, চুরি করে, ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি তোলে। ‘জয়বাংলা বলে চিৎকার করে কারো পক্ষে একটি দেশ চালানো সম্ভব নয়। অপরদিকে বাঙালি মাওবাদীরা...যদিও তারা খুব প্রশিক্ষিত নয়Ñতবু মাও-এর লাল বই এর অর্ধেক পাঠ করেছে। কিন্তু তারা সুস্পষ্ট একটি শক্তি এবং ভারতীয়রা তাদের ব্যবহার করতে পারবে না। তাছাড়া আমি এটাও মনে করি না যে, তারা পাকিস্তানের ঐক্যের বিরোধী ছিল। আল্লাহ ভালো জানেন, কিভাবে এই জটিল ও বিপজ্জনক সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভবÑশুধু কল্পনা করুন, মুজিবকে এগুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাছাড়া দেশটি বড়ই দুর্ভাগা। জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ঝড় লেগেই আছে। বলা যায় একটি দুর্ভাগা তারকার নিচে দেশটির জন্ম। আমাদের ভুললে চলবে না যে, দেশটা সবসময়ই বিশ্বের মন্দ অবস্থানে ছিল। আপনি ১৯৪৭ সাল অথবা ১৯৫৪ সালের ঢাকা দেখে থাকবেন। একটি নোংরা গ্রাম, সেখানে একটা রাস্তাও ছিল না। আর এখন সবকিছু ধ্বংস করা হয়েছে। সেজন্যে মুক্তিবাহিনীর ডিনামাইটকেও ধন্যবাদ, বাংলাদেশ...।
ও. ফা.: আমি অবাক হচ্ছি, আপনি বাংলাদেশ বলছেন।
জু. আ. ভু.: অবশ্যই আমি বলছি রাগে এবং ঘৃণায়। যদিও এখনো এটি আমার কাছে পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু সঠিকভাবে অথবা ভুলেই হোক, কিংবা ভারতীয় দ্বারা সামরিক কার্যকলাপের ফলেই হোক পঞ্চাশটি রাষ্ট্র এটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাকে মানতে হবে। আমিও স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত, যদি ভারত আমাদের যুদ্ধবন্দিদের ফেরত দেয়, যদি বিহারীদের ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়, যদি পাকিস্তানের ঐক্যের পক্ষের লোকদের ওপর নিপীড়ন না করা হয়। আমরা যদি নিজেদেরকে আবার একটি ফেডারেশনে যুক্ত করি, তাহলে প্রথমেই আমাদেরকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে এবং আমার মনে হয় দশ অথবা পনের বছরের মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ একটি ফেডারেশনে যুক্ত হতে পারে। হতে পারে এবং হওয়া উচিত। তা না হলে এ শূন্যতা কে পূরণ করবে। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের  মানুষের মধ্যে অভিন্ন কিছুই নেই। পূর্ববঙ্গের বাঙালি ও আমাদের মধ্যে ধর্ম অভিন্ন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ধারণাটা ছিল চমৎকার।
ও. ফা.: আপনি চমৎকার বলছেন? দুই হাজার কিলোমিটার দূরে দু’টি জায়গা নিয়ে একটি দেশের জন্ম এবং তার মাঝখানে ভারত?
জু. আ. ভু.: এই দুটি ভূখ-ই পঁচিশ বছর একত্রে ছিল, সকল ভুল-ভ্রান্তির পরও। একটি রাষ্ট্র শুধু ভৌগোলিক বা ভূখ-ের ধারণা নয়। যখন পতাকা এক, জাতীয় সংগীত এক, ধর্ম একÑ দূরত্ব সেখানে কোনো সমস্যাই নয়। মোঙ্গলরা যখন ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল তখন এই অংশের মুসলমানরা একশ’ দিনে দেশের অপর প্রান্তে যেতো। এখন বিমানে মাত্র দু’ঘণ্টার পথ। আমার কথা কি আপনি বুঝতে পারছেন।
ও. ফা.: না, মি. প্রেসিডেন্ট। আমি বরং ইন্দিরা গান্ধীকে ভালো বুঝি যখন তিনি বলেন যে, ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ ছিল ভুল এবং ১৯৭০-এর দশকে ধর্মের নামে যুদ্ধ হাস্যকর।
জু. আ. ভ.ু: মিসেস গান্ধীর স্বপ্ন একটাইÑ গোটা উপমহাদেশ দখল করা, আমাদেরকে শাসন করা। তিনি একটা কনফেডারেশন পছন্দ করেন, যাতে বিশ্ব থেকে পাকিস্তান মিশে যায় এবং সে কারণেই তিনি বলেন, আমরা ভাইÑইত্যাদি। আমরা ভাই নই। কখনো ভাই ছিলাম না। আমাদের ধর্ম আমার আত্মার গভীর পর্যন্ত, আমাদের জীবন ব্যবস্থার মধ্যে। আমাদের সংস্কৃতি ভিন্ন, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। জন্ম থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত একজন হিন্দু ও একজন মুসলিম আইন ও রীতির অধীন, যার মধ্যে কোনো আপোষ নেই। দু’টিই শক্তিশালী ও আপোষহীন বিশ্বাস। ইতিহাসে দেখা গেছে দু’টোর কোনোটিই একে অপরের সঙ্গে আপোষে পৌঁছতে পারেনি। শুধু রাজতন্ত্রের একচ্ছত্র শাসনে-বিদেশি আধিপত্যের সময় অর্থাৎ মোঙ্গল থেকে বৃটিশ পর্যন্ত কোনো রকম জোড়াতালি দিয়ে আমাদেরকে এক রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু একটি ঐক্যবদ্ধ প্রীতির সম্পর্ক কোনোদিন গড়ে উঠেনি।
ইন্দিরা গান্ধী আপনাকে যেভাবে বলেছেন, আসলে হিন্দুরা সে রকম শান্ত বা নম্র সৃষ্টি নয়। তাদের পবিত্র গরু সম্পর্কে তারা শ্রদ্ধাশীল কিন্তু মুসলমানদের প্রতি নয়। তারা সবসময় আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার ও অত্যাচার করেছে। ১৯৪৪ সালে আমার সাথে একটি ঘটনা আমি কোনোদিন ভুলবো না। আমার আব্বা-আম্মার সাথে কাশ্মীরে ছুটি কাটাতে গেছি। অন্য বালকরা যা করে আমিও তেমনি দৌড়ে পাহাড়ে উঠছিলাম, নামছিলাম এবং এক পর্যায়ে আমি খুব পিপাসার্ত হলাম। অতএব আমি নিকটেই এক লোকের কাছে গেলাম। যে পানি বিক্রি করছিল। পানি চাইলাম। লোকটি পানির মগ ভরলো। আমার হাতে দিতে গিয়েও থেমে জিজ্ঞাসা করলো, ‘তুমি কি হিন্দু, না মুসলমান?’ উত্তর দিতে আমার দ্বিধা হচ্ছিল- ক্ষিপ্ত হয়ে পানিটা চাইলাম। শেষে বললাম, ‘আমি মুসলমান।’ লোকটি মাটিতে ফেলে দিলো পানির মগ উপুড় করে। ঘটনাটা ইন্দিরা গান্ধীকে বলবেন।
ও. ফা.: আপনারা দু’জন পাশাপাশি দাঁড়াতে পারেন না, পারেন কি?
জু. আ. ভু.: আমি তাকে শ্রদ্ধাও করি না। আমার কাছে তিনি একজন সাধারণ নারী, সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্না। তার মধ্যে বড় কিছু নেই। শুধু যে দেশটা তিনি শাসন করেন সেটা বড়। আমি বলতে চাই, সিংহাসনটার কারণে তাকে বড় মনে হচ্ছে, যদিও তিনি খুব ছোট এবং তার নামটাও। বিশ্বাস করুন, তিনি যদি শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হতেন, তাহলে আরেকজন মিসেস বন্দরনায়েক ছাড়া কিছুই হতেন না। যদি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হতেন...। অবশ্য আমি তাকে গোল্ডা মেয়ার-এর সাথে তুলনা করতে চাই না। গোল্ডা মেয়ার তার থেকে অনেক উপরে। তার একটি সুন্দর মন আছে, সুস্থ বিচারশক্তি আছে এবং তাকে ইন্দিরা গান্ধীর চেয়ে আরো অনেক কঠিন সমস্যার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। তাছাড়া গোল্ডা মেয়ার ক্ষমতায় এসেছেন তার নিজের মেধার বলে। অপরদিকে মিসেস বন্দরনায়েক ক্ষমতায় এসেছেন মি. বন্দরনায়েকের বিধবা স্ত্রী হওয়ার কারণে। ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় এসেছেন নেহেরুর মেয়ে হওয়ার কারণে। নেহেরুর মেয়ে না হলে, তার সকল শাড়িতে, কপালের লাল টিপে, সুন্দর হাসি দিয়েও তিনি কখনো আমাকে আকৃষ্ট করতে সফল হতেন না। লন্ডনে তার সাথে যখন প্রথম সাক্ষাৎ তখন থেকেই তিনি আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেননি। আমরা দু’জনই একটা ক্লাসে যেতাম এবং ইন্দিরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিস্তারিত নোট নিতেন। তাকে বলতাম, ‘আপনি কি নোট নিচ্ছেন, না থিসিস লিখছেন?’ থিসিস সম্পর্কে বলতে হয়, আমি বিশ্বাস করি না যে, অক্সফোর্ড হতে ইতিহাসে ডিগ্রি নেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। আমি অক্সফোর্ডে তিন বছরের কোর্স শেষ করেছি দুই বছরে। তিন বছরেও তার পক্ষে কোর্স শেষ করা সম্ভব হয়নি।
ও. ফা.: আপনি কি একটু বাড়াবাড়ি করছেন না, একটু অন্যায়? আপনি কি সত্যিই মনে করেন যে, তার মাঝে কিছু নেই অথবা দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছেন কি করে? অথবা বলতে চান, তার মাঝে কোনো যোগ্যতা নেই, কারণ তিনি নারী?
জু. আ. ভু. : না, না। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মহিলাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো বক্তব্য নেই, যদিও আমি মনে করি না যে, পুরুষের চেয়ে মহিলারা ভালো রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারে। ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে আমার অভিমত নৈর্ব্যক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ। জেনেভা কনভেনশনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করে এবং আমাদের যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে না দিয়ে যে কঠোর আচরণ তিনি করছেন সে ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত না হয়েই আমি তার সম্পর্কে বলছি। আমি তাকে সবসময় কিভাবে দেখি: একজন স্কুল বালিকার মতো সতর্ক ও পরিশ্রমী, কিন্তু উদ্যোগ ও কল্পনাশক্তিশূন্য একজন নারী। বলা যায় অক্সফোর্ডে পড়াশুনার সময় ও লন্ডনে নোট নেয়ার সময় তিনি যেমন ছিলেন, এখন বরং তার চেয়ে ভালো। ক্ষমতা তাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু তার সাফল্যের মাঝে সফলতা নেই। সাফল্যের প্রশ্নটির সাথে কতটা মেধা যোগ হয়েছে তার অনুপাত দেখতে হবে। পাকিস্তান ও ভারত যদি কনফেডারেশনভুক্ত দেশ হতো তাহলে মিসেস গান্ধীর পদটা লাভ করা আমার পক্ষে কঠিন হতো না। তার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্বে আমার কোনো ভয় নেই। আমি বলতে চাই, তিনি যখন যেখানে চান সেখানেই তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আমি প্রস্তুত। এমনকি দিল্লিতেও, হ্যাঁ, আমি দিল্লিতেও যেতে প্রস্তুত। ঠিক ভিয়েনার কংগ্রেসের পর ট্যালিব্যান্ডের মতো। যে বিষয়টি আমাকে পীড়া দেয় তাহলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিকট হতে গার্ড অব অনার এবং সেই ভদ্রমহিলার সাথে দৈহিক সংস্পর্শ। এ ভাবনা আমাকে পীড়িত করে। হায় আল্লাহ। এটা যেন আমাকে ভাবতেও না হয়। বরং আমাকে বলুন, মিসেস গান্ধী আমার সম্পর্কে কি বলেছেন?
ও. ফা.: তিনি বলেছেন, আপনি ভারসাম্যহীন একজন লোক। আজ এক কথা বলেন, আগামীকাল আরেকটা। কেউ বুঝতে পারে না আপনার মনে কি আছে?
জু. আ. ভু. : হ্যাঁ। আমি সরাসরি এর জবাব দিচ্ছি। দার্শনিক জন লকের একটি বক্তব্যই আমি উল্লেখ করছি: ‘ছোট মনের গুণই হলো সামঞ্জস্যবিধান।’ অন্যভাবে বলা যায়, আমি মনে করি একটি মৌলিক ধারণায় অত্যন্ত দৃঢ় থাকা উচিত। মূল ধারণার মধ্যে একজন অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করতে সক্ষম হয়। একবার এই প্রান্তে, আরেকবার অপর প্রান্তে। একজন বুদ্ধিজীবী কখনো একটিমাত্র ও সংক্ষিপ্ত ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন নাÑ তার ভাবনার নমনীয়তা থাকা উচিত। তা না হলে একটি গ-ির মধ্যে গোঁড়ামির মধ্যে তিনি নিমজ্জিত হন। একজন রাজনীতিবিদও তাই। রাজনীতি একটি আন্দোলন এবং রাজনীতিবিদকেও হতে হবে সচল। একবার তাকে ডানে, আরেকবার বামে যেতে হবে। তাকে আসতে হবে দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ নিয়ে। অব্যাহতভাবে তার পরিবর্তন হবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন, সবদিক থেকে আক্রমণ করবেন। ফলে বিরোধীর দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে আঘাত হানতে পারবেন। মূল ধারণার দিকে যিনি দ্রুত মনোযোগী হন, তার কাছেই শিখা যায়। তার কাছে শিখুন যিনি সত্য প্রকাশ করেন।
দৃশ্যত: সামঞ্জস্যতা বুদ্ধিমান মানুষের প্রধান গুণ। মিসেস গান্ধী যদি তা না বুঝেন তাহলে তিনি তার পেশার সৌন্দর্য বুঝেন না। তার পিতা এ বিষয় খুব ভালোভাবে বুঝেছিলেন।
ও. ফা. : ইন্দিরা গান্ধী বলেন, তার পিতা রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সন্ন্যাসী।
জু. আ. ভু. : মিসেস গান্ধী তার পিতা সম্পর্কে ভুল বলছেন। বরং নেহেরু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। পিতার অর্ধেক মেধা তার থাকা উচিত। দেখুন, যদিও তিনি পাকিস্তানের নীতির বিরোধী ছিলেন, তবু আমি সবসময় এই লোকটির প্রশংসা করি। আমি যখন তরুণ তখন তার দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম। পরে অবশ্য বুঝতে পারি তিনি অনেক ভুল, হতাশা, কঠোরতা ইত্যাদি দোষে দুষ্ট এবং তার মধ্যে স্ট্যালিন, চার্চিল বা মাও সেতুং-এর মতো যোগ্যতা ছিল না। মিসেস গান্ধী আর কি বলেছেন?
ও. ফা.: তিনি বলেছেন, আপনারা পাকিস্তানিরাই যুদ্ধ শুরু করেছেন।
জু. আ. ভু. : হাস্যকর। প্রত্যেকে জানে তারা আমাদেরকে আক্রমণ করেছিল। ২৬শে নভেম্বর পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে তারা আঘাত হানে। পূর্ব পাকিস্তান সম্ভবত পাকিস্তান ছিল না। ভালো করে একটু ভেবে দেখুন। কেউ যদি পালেরমো আক্রমণ করে, তাহলে আপনি কি এ সিদ্ধান্তই নেবেন না যে ইতালি আক্রান্ত হয়েছে? কেউ যদি মার্সেলিস আক্রমণ করে তাহলে কি আপনি ভাববেন না যে ফ্রান্স আক্রান্ত হয়েছে? মিসেস গান্ধী বিতর্কিত ভূখ- কাশ্মীরে আমাদের পাল্টা আক্রমণের কথা ভুলে যেতে চাইছেন। ৩রা ডিসেম্বর কাশ্মীরের ওপর হামলা হয়। আমার মনে পড়ছে ২৯শে নভেম্বর ইয়াহিয়া খানের সাথে সাক্ষাৎ করে আমি পাল্টা হামলা করতে ব্যর্থতার ব্যাপারে তাকে বলি, ‘আপনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যে পূর্ব পাকিস্তানে কিছুই ঘটেনি। কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে আপনি ভারতের খেলায়ই অংশ নিচ্ছেন। মানুষকে আপনি এ বিশ্বাসই করতে দিচ্ছেন যে, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান এক রাষ্ট্র নয়।’ কিন্তু তিনি আমার কথা শুনলেন না। পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ তিনি চারবার পরিবর্তন করেন। চতুর্থবারের সময় আমাদের জওয়ান ও অফিসাররা অধৈর্য হয়ে ট্যাংকে মুষ্টাঘাত করছিল। ঢাকা সম্পর্কে আমি বলেছিলাম, আমাদের সকল ছাউনি ঢাকায় কেন্দ্রীভূত করা হোক এবং একটি শক্তিশালী অবস্থানে নেয়া হোক দশ মাসের জন্য, এক বছরের জন্যÑ গোটা বিশ্ব আমাদের পক্ষে এসে যাবে। তার শুধু বক্তব্য ছিল ভারতীয়রা ক্ষুদ্র একটি ভূখ- দখল ও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করবে না। কিন্তু যখন তিনি নিয়াজীকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেন... হে খোদা। আমি হাজার বার মৃত্যুবরণ করলেও এর চেয়ে ভালো বোধ করতাম। মনে পড়ে, আমি নিউ ইয়র্কে ছিলাম। তিনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন একজন পর্যটক হিসেবে এবং আমি নিজেকে দেখলাম জাতিসংঘের এক অদ্ভুত অধিবেশনে।
ও. ফা. : এবং আপনি সেখানে সেই দৃশ্যের অবতারণা করেন।
জু. আ. ভু. : আমি স্বীকার করি। একটি বাস্তব দৃশ্য। আমি ক্রোধে, বিরক্তিতে পূর্ণ হয়েছিলাম। ভারতীয়দের আক্রমণাত্মক ভাব, বৃহৎ শক্তি কর্তৃক ভীতি প্রদর্শন, যারা শুধু ভারতের অনুকরণ করতে চাচ্ছিল। আমি আমার ভাবাবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। আমার বক্তৃতায় সকলকে আমি জাহান্নামে যেতে বলেছি। আমি কেঁদেছি। হ্যাঁ, আমি মাঝে মাঝে কাঁদি। যখন কোনো কিছু অন্যায়, অসম্মানজনক আবিষ্কার করি, আমি তখন কাঁদি। আমি খুবই আবেগপ্রবণ।
ও. ফা. : আবেগপ্রবণ, দুর্বোধ্য, জটিল এবং... আরো অনেক কিছু বলা হয়। আমার মনে হয়, এখন আপনার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করার সময় হয়েছে। মি. প্রেসিডেন্ট, এই লোকটি সম্পর্কে একটু বলুন, যিনি অত্যন্ত ধনবান, অথচ একজন সমাজতন্ত্রী, পাশ্চাত্যের লোকের মতো বাস করেন অথচ তার দু’জন স্ত্রী রয়েছে।
জু. আ. ভু.: আমাদের মধ্যে অনেক বৈপরীত্য রয়েছেÑআমি সে সম্পর্কে সচেতন। আমি এসবের মধ্যে আপোষের চেষ্টা করি, সমস্যা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি সফল হতে পারি না। ফলে আমি এশিয়া ও ইউরোপের অদ্ভুত মিশ্রণ হিসেবেই রয়েছি। আমার শিক্ষা খুব কম কিন্তু ইসলামী পরিবেশে বড় হয়েছি। আমার মনটা পাশ্চাত্যের কিন্তু আত্মা প্রাচ্যের। আমার দুই স্ত্রী সম্পর্কে আমি কি করতে পারি? অভিভাবকরা আমার মামাত বোনের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন তের বছর বয়সে। আমার বয়স ছিল মাত্র তের, আর আমার স্ত্রীর তেইশ বছর। এমন কি আমি জানতামও না যে একজন স্ত্রী থাকার অর্থ কি। যখন তারা আমাকে এটা বুঝানোর চেষ্টা করলো, আমি রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি কোনো স্ত্রী চাইনি। আমি ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিলাম। আমি ক্রিকেটের দারুণ ভক্ত। আমাকে শান্ত করতে আমাকে দু’টি নতুন ক্রিকেট ব্যাট দিতে হয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষ হওয়া মাত্র আমি ক্রিকেট খেলতে যাওয়ার জন্য দৌড় দিয়েছিলাম। আমার দেশে এমন অনেক কিছু আছে, যা আমাকে অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। আমাকে ভাগ্যবান বলতে হবে। তারা আমার এগার বছর বয়সী খেলার সাথীকে বিয়ে দিয়েছিল বত্রিশ বছর বয়সী এক রমণীর সঙ্গে। সে সবসময় আমাকে বলতো ‘তুমি ভাগ্যবান’।
আমি যখন আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রেমে পড়লাম, তখন আমার বয়স তেইশ বছর। সেও ইংল্যান্ডে পড়াশুনা করছিল। যদিওসে একজন ইরানী অর্থাৎ তার দেশে বহু বিবাহ একটি রীতি, আমাকে বিয়ে করার জন্য তাকে রাজি করাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। মাত্র দুটি কথা ছাড়া তাকে বুঝানোর মতো যুক্তি আমার ছিল না, ‘তাতে কি, ওসব বাদ দাও।’ আমার প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ধারণা কখনো আমার মাথায় আসেনি। সে যে আমার মামাত বোন, সে কারণে নয়, কারণ তার প্রতি আমার একটি দায়িত্ব আছে। একটি বালকের সাথে এই অবাস্তব বিয়ের কারণে, এই অবাস্তব রীতি যেখানে আমরা বড় হয়েছি- সে কারণে তার গোটা জীবনটা বরবাদ হয়ে গিয়েছিল। সে আমার লারকানার বাড়িতে বাস করে। মাঝে মাঝে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। প্রায় সবসময় সে একা কাটায়। এমনকি তার কোন সন্তানও নেইÑ আমার চারটি সন্তান দ্বিতীয় স্ত্রীর। আমি খুব অল্পসময় তার সাথে কাটিয়েছি। বড় হওয়ার পরই পড়াশুনা করতে আমি পাশ্চাত্যে চলে যাই। এটা আসলে অবিচারের একটি কাহিনী। বহুবিবাহ নিরুৎসাহিত করতে আমার পক্ষে যা সম্ভব সবকিছু করবো। বহুবিবাহ অর্থনৈতিক সমস্যাও সৃষ্টি করে। কখনো স্ত্রীরা বিভিন্ন শহরে বা ভিন্ন বাড়িতে বিচ্ছিন্নভাবে বাস করেÑ যেমনটি আমার বেলায় হয়েছে। তাছাড়া আমার যা সাধ্য তা সবার নেই। যদিও যেমনটি আপনি বলেছেন, আমি তেমন বিত্তবান নই। (চলবে)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

জিন্দাপার্ক নিয়ে দ্বন্ধের জেরে সংঘর্ষ, আহত ৫

টাইম ম্যাগাজিন নিয়ে আবার বিতর্কে ট্রাম্প

চট্টগ্রামে নারীঘটিত কারণে আইনজীবি খুন

‘নতুন বাকশাল দেখছি’

আওয়ামী লীগ নেতারা হিন্দুদের সম্পদ দখল করছে

মিশরে বিপুল সংখ্যক ‘হামলাকারী’ নিহত

বারাক ওবামাকে হত্যার পরিকল্পনাকারী গ্রেপ্তার

কীভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারকের পদ হারালো বৃটেন?

‘ডিপ্লোম্যাটিক মাইনফিল্ডে’ আসছেন পোপ, তাকিয়ে বিশ্ব

গুম আর জোর করে গুম এক নয়

‘দুর্নীতি বাড়ার জন্য রাজনীতিবিদরা দায়ী’

রংপুর ও রাজশাহীতে শীত বাড়ছে

‘ভারত ও চীন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাড়ি ঘর নির্মাণে সহায়তা করবে’

দিনাজপুরে পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত: যাত্রীদের চরম দূর্ভোগ

‘শেষ মুহূর্তে হলে সরকার সমঝোতায় আসবে’

রবি-সোমবার সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতি