পথ এখনো অনেক দূর

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১৭ জুলাই ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৩৮
নানা তরিকা আর কিসিমের ভোট দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। কোনোটি প্রশংসিত, কোনোটি সমালোচিত। কোনো কোনো নির্বাচন ছিল একেবারেই গায়েবি। ব্যালট ছিনতাই, ভোট বাক্স নিয়ে দৌড়ের দৃশ্যও সবার দেখা। একাদশ সংসদ নির্বাচন এখনো বহুদূর। কিন্তু সেটা কতদূর। নানা প্রশ্ন, নানা আলোচনা। এরই মধ্যে দেশে ভোটের আওয়াজ চলছে বেশকিছু দিন ধরে। শুরু হয়েছে আগাম প্রচারণাও। নির্বাচন কমিশনও বসে নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। তবে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিয়ে তেমন কোনো আশার কথা শোনাননি হুদা কমিশন। বরং তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত নিজেদের দায় অস্বীকারই করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
বলা হয়, মুক্ত মানুষের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তিতে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে ব্যালট। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ রেফারির রয়েছে বিরাট ভূমিকা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার সঙ্গে বিএনপির তিক্ততাপূর্ণ অতীত রয়েছে। কিন্তু তারপরও দলটির সঙ্গে এ পর্যন্ত নূরুল হুদা কমিশনের একধরনের আস্থার সম্পর্কই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কমিশনের প্রতি বড় কোনো অনাস্থা দেখায়নি বিএনপি। নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রায়শই বিএনপি নেতারা কমিশনে যাচ্ছেন। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচন শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের খেলা নয়। হ্যাঁ, এটা সত্য, রাজনৈতিক দলগুলো এখানে প্রধান খেলোয়াড়। রেফারির প্রতি তাদের আস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জনগণ তাদের পছন্দসই খেলোয়াড়কে নির্বাচিত করতে পারছে কি-না? জনগণের পছন্দ বা চাহিদাই গণতন্ত্রে শেষ কথা। কিন্তু বাংলাদেশে অতীতে অনেক সময়ই জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের দেয়া ভোট গণনা হয়নি। তারা বঞ্চিত হয়েছেন। প্রভাবশালীদের কাছে হেরে গেছেন। জনগণ যেন তাদের পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন এবং তাদের ভোট যেন গণনা করা হয়- এটা নিশ্চিত করাই এখন নির্বাচন কমিশনের প্রথম এবং প্রধান কাজ। সে জন্য অবশ্য কমিশনকে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশন যে রোডম্যাপ বা পথ নকশা ঘোষণা করেছে তার ওপর বাংলাদেশের মানুষ কতটা আস্থা স্থাপন করে তাই হবে এখন দেখার বিষয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য রোডই খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি বলেছেন, রোডটা তো থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত আমরা রোড দেখতে পাচ্ছি না। সুতরাং ম্যাপ তো পরের প্রশ্ন। সে যাই হোক, আগামী সংসদ নির্বাচন কেমন হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের ওপর। অনেক সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের চরিত্র ঠিক করে দেয়। শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, আরো অনেক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এ কথা সত্য। প্রতিষ্ঠান প্রধানের ভূমিকার ওপর নির্ভর করে জনগণের আস্থা-অনাস্থা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা কোন্‌ জুতাতে পা ঢুকিয়েছেন তা অবশ্য এখনো স্পষ্ট হয়নি। সামনের দিনগুলোতে তার ভূমিকা কেমন হবে সেদিকে দৃষ্টি রয়েছে অনেকের। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের সঙ্গে কিছুদিন আগে এক বৈঠকে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, ১৫ই ফেব্রুয়ারি বা ৫ই জানুয়ারির মতো নির্বাচন আর হবে না। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপে নানা টেকনিক্যাল বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন, জনগণ শেষ পর্যন্ত টেকনিক নয়, দেখে হৃদয়।
এদিকে, গতকাল রোববার ইলেক্টোরাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা (রোডম্যাপ)’ প্রকাশ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ইসি। রোডম্যাপে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সময়ে সংসদ নির্বাচন করতে দৃঢ়তার সঙ্গে ও সুচিন্তিত পন্থায় এগিয়ে যাচ্ছে। দেশবাসী একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছেন। সার্বিকভাবে দেশে জাতীয় নির্বাচনের একটি অনুকূল আবহ সৃষ্টি হয়েছে। ইসি’র রোডম্যাপে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে অংশীজন, গণমাধ্যম, দলসহ সংশ্লিষ্টদের সামনে উপস্থাপন করে সবার মতামত নেবে। সবার মতামতের আলোকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আইনানুগ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব বলে ইসি বিশ্বাস করে। রোডম্যাপে উল্লিখিত সাতটি বিষয় হচ্ছে- আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকলের পরামর্শ গ্রহণ, সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং সরবরাহকরণ, বিধি-বিধান অনুসরণপূর্বক ভোটকেন্দ্র স্থাপন, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সকলের সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, আমাদের কী কাজ তা আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ব্যাপারে আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে। আবার সরকারের কিছু দায়িত্ব আছে। আমাদের কাজ হচ্ছে যারা নির্বাচনে অংশ নেবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইন ও ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা। সমপ্রতি একটি রাজনৈতিক দলের নেতার বাসায় আয়োজিত চা-চক্রে পুলিশি বাধার বিষয়টি উল্লেখ করে এ সম্পর্কে সিইসি’র মত জানতে চান সাংবাদিকরা। রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশে প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনো দায়িত্ব আছে কিনা জানতে চাইলে সিইসি বলেন, আমরা সব রাজনৈতিক দলকে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য আহ্বান জানাবো। নির্বাচন কমিশনের কাজ বিধিবদ্ধ বিষয়। কিভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে হবে, মনোনয়ন দাখিলের পরে তাদের প্রটেকশন নিশ্চিত করা এগুলো, ভোটাররা কিভাবে ভোট দিতে যাবে এগুলোর বিষয়ে পরিবেশ সৃষ্টি করা। পল্টনে বসে কারা সভা করতে পারলো, না পারলো তা দেখা নির্বাচন কমিশনের কাজ না।
তফসিল ঘোষণার আগে পরিবেশ তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন সরকারকে অনুরোধ করবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এটা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার না। আমরা তফসিল  ঘোষণার পর নির্বাচনী পরিবেশ বজায়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেব। এখন সরকারের কাছে কোনো অনুরোধ থাকবে না। তবে তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে অনুরোধ করা হবে।
নির্বাচনকালীন সরকার কী ধরনের হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এটা সাংবিধানিক বিষয়। তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ৯০ দিন নির্বাচনী আইন-বিধি অনুযায়ী আমরা কাজ করব। এ মুহূর্তে সরকার কিভাবে পরিচালিত হবে ও রাজনৈতিক কর্মপরিবেশের বিষয়গুলো আমাদের এখতিয়ারে নয়। সরকারের কর্মকাণ্ডে এখনই কমিশন হস্তক্ষেপ করবে না।
নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কেএম নুরুল হুদা বলেন, নির্বাচনে ভোটগ্রহণে ইভিএম ব্যবহারের দরজা আমরা বন্ধ করে দিইনি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর সরকার সহযোগিতা করলে এর ব্যবহার সম্ভব। রোডম্যাপ প্রকাশ করে সিইসি বলেন, এটি একটি সূচনা দলিল। নির্বাচনের পথে কাজের জন্য এ কর্মপরিকল্পনাই সব নয়। সংযোজন-পরিমার্জন করে সবার মতামত নিয়ে আমরা কাজ করে যাবো। দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ২০১৪ সালের ২৯শে জানুয়ারি। সেক্ষেত্রে ২০১৯ সালের ২৮শে জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে সংলাপে রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনের কাছ থেকে সুপারিশের পাশাপাশি সহযোগিতাও চান সিইসি। এক প্রশ্নের জবাবে কেএম নূরুল হুদা বলেন, শুধু সরকার কেন, রাজনৈতিক দল বা যে কোনো দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করতে পারবো আমরা। তিনি জানান, তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত কর্মপরিকল্পনার সাতটি বিষয় ধরে তারা কাজ এগিয়ে নেবেন। তফসিল ঘোষণার পর ইসি’র কাজে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা এলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনারদের না জানিয়ে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বদলিসহ বিভিন্ন পদে পদায়ন করা হয়। এ প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনাররা আন-অফিসিয়াল নোট দেন। এ প্রসঙ্গে সিইসি’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তালুকদার সাহেবের প্রোডাক্ট মনে হয়। তালুকদার সাহেবরা আমার কোনো বিষয় না। এ নিয়ে আপনাদের ঝামেলা করা ঠিক না। কমিশনের যেমন দায়িত্ব আছে তেমনি সচিবালয়ের কে কি কোথায় পদায়ন হবে সেটা তাদের দায়িত্ব। সচিবালয়ের কোথায় কাকে পদায়ন করা হবে এটা সচিবালয়ের বিষয়। নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে সমন্বয় করার দরকার নাই।
সংবাদ সম্মেলনের স্বাগত বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত সব কাজ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে করার চেষ্টা করেছেন তারা। তিনি বলেন, আমরা পরিকল্পনা ধরেই এগোচ্ছি। সুষ্ঠু, সুন্দর, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে চাই আমরা। সততা ও শক্তির স্বাক্ষর যেন আমরা রাখতে পারি, সেজন্য সবার সহযোগিতা চাই। নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম ও শাহাদত হোসেন চৌধুরী এবং অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আস্থা নেই বিএনপির

রুবির বক্তব্য আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ

মিয়ানমারকেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে

সর্বশেষ আসা রোহিঙ্গাদের মুখে নির্যাতনের বর্ণনা

হঠাৎই সব এলোমেলো

হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি

পাহাড়ে দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টা

একই চিত্র জাকিরুলের বাড়িতে

মা এখনো জানেন না

ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে বিমান বাহিনী

ফের কমলো স্বর্ণের দাম

লিবিয়ার আইএস ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান হামলা, নিহত ১৭

উল্টো পথে আবার ধরা সচিবের গাড়ি

ফের কমলো স্বর্ণের দাম

ছাত্রের হাতে শিক্ষক জখম

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ৮০ ভাগ নারী ও শিশু: কেয়ার