টক-ঝাল-তেতো (মিষ্টি) বাজেট: অত:পর অর্থমন্ত্রী...

মত-মতান্তর

ফারুক মেহেদী | ২৪ জুন ২০১৭, শনিবার
শেষ বয়সে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দেয়া ১১তম বাজেটটি (অর্থমন্ত্রীর ভাষায় শ্রেষ্ঠ বাজেট) নিয়ে এতো টক-ঝাল-মিষ্টি আলোচনা এর আগে হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। ঘোষণার দিন থেকে আলোচনার মেরুকরণ শুরু হয়ে এখন তা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
একটু পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সবচেয়ে বেশি সমালোচনা-বিতর্ক হয়েছে ব্যাংকে এক লাখের বেশি জমা টাকার ওপর আবগারি শুল্কের হার বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে। এর পরই আছে নতুন আইনে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর আভাস। ঘোষণা দিয়েও ব্যক্তির করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানো ও করপোরেট কর না কমানোসহ বেশ কিছু বিষয়ে সমালোচনার ঝড় কেবল বেড়েছেই। আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্কের মাঝে কখনও কখনও ঘি ঢেলেছেন অর্থমন্ত্রী নিজেও। সংবাদপত্রে, টেলিভিশনে, সভা-সেমিনারের পাশাপাশি সংসদেও সরস আলোচনায় ঘুরে ফিরে বিষয়গুলো টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে কম বেশি প্রায় সব মন্ত্রীই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।
সবশেষ সরকারদলীয় নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম অর্থমন্ত্রীকে থামতে বলেছেন। ঠিক এক দিন আগে অর্থমন্ত্রী বাজেট পাশের সময় আবগারি শুল্কের বিষয়ে ইতিবাচক কিছু বলবেন বলে আভাস দিলেও সমালোচনা থেকে শেষ রক্ষা হলো না তাঁর। সংসদে শেখ সেলিম তাকে একেবারে থামিয়েই দিলেন! সরকারি দলের অপর সদস্য মাহবুবুল আলম হানিফতো আরও এক ধাপ এগিয়ে। অর্থমন্ত্রী যেখানে বড় অংকের নির্বাচনমুখী বাজেট দিয়েছেন বলে মহাআত্মতৃপ্তিতে; সেখানে মাহবুবুল আলম হানিফ বাজেটকে বলছেন নির্বাচনবিমুখ। বলা যায়, অর্থমন্ত্রীকে রীতিমত উড়িয়েই দিলেন সরকারি দলের প্রভাবশালি এমপিরা। নমনীয় বিরোধীদল জাতীয় পার্টির এমপিরাও সুযোগে তুলোধুনা করেন অর্থমন্ত্রীকে। এমপি জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুতো এক পর্যায়ে তাকে পদত্যাগেরও দাবি তুলেন! যদিও তোফায়েল আহমেদের মত বর্ষিয়াণ রাজনীতিকরা শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন।
তো, বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বর্তমান প্রতিক্রিয়া কী? এখন তিনি একে শ্রেষ্ঠ বাজেট বলবেন কিনা-আপাতত হয়তো তা আর জানা যাচ্ছে না! তবে একটা বিষয় এর মধ্য দিয়ে পরিস্কার হয়েছে যে, ব্যাংকে জমা টাকায় প্রস্তাবিত বাড়তি আবগারি শুল্ক হয়তো তিনি বিবেচনা করবেন। তবে ভ্যাটের ব্যাপারে কী হবে? তাহলে কী নতুন আইনে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সবস্তরে বহাল থাকছে? চারপাশে যখন এমন প্রশ্ন, তখন অর্থমন্ত্রীর কৌশলী জবাব-জানা যাবে ২৮ জুন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে!
বাজেটের আগে ভ্যাট নিয়ে যে আলোচনা, সমালোচনা-বিতর্ক ছিল; তার রেশ কমে আসে বাজেটের পর। অর্থাৎ বাজেটের আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল আবগারি শুল্ক নিয়ে। ফলে ভ্যাটের মত একটি বড় বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পায়নি। অবশ্য এটা অর্থমন্ত্রী সচেতন ভাবেই করেছেন কিনা- আমরা কেউই তা জানিনা। বাজেটের আগে তাকে ভ্যাট আইন নিয়ে বেশ তোপের মুখেই পড়তে হয়েছিল। পরামর্শক সভায় ব্যবসায়ীরা তা প্রতিহত করারও ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতির পর সবাই মনে করেছিলেন, বাজেটে ভ্যাট নিয়ে নমনীয় কোন ঘোষণা থাকবে। তা হয়নি, বরং ১৫ শতাংশ ভ্যাট হারই বহাল রাখলেন। তবে নতুন ইস্যু দিলেন ব্যাংকে জমা টাকায় বাড়তি আবগারি শুল্ক।
আর যায় কোথায়? সবাই হামলে পড়লেন অর্থমন্ত্রীর নতুন ইস্যু আবগারি শুল্কে। অফিসে, কফিশপে, বাসে-ট্রেনে সর্বত্র একই আলোচনা। ভ্যাট আইনটি ক্রমে পড়ে গেল পেছনে। হয়তো অর্থমন্ত্রী মনে মনে হাসছেন এই ভেবে যে-যাক বাবা...ভ্যাট আইনটি তাহলে অনায়াসেই শুরু করে দেয়া যাচ্ছে! আবগারি শুল্কের চাপায় ভুলিয়ে ভালিয়ে তাহলে নতুন ভ্যাট আইনটি কার্যকর করে দেয়া যাচ্ছে!
আমার মনে হচ্ছে অর্থমন্ত্রী এটিকে শ্রেষ্ঠ বাজেট বলার স্বার্থকতা খুঁজে পাবেন! শেষ পর্যন্ত মাত্র কয়েশো কোটি টাকার আবগারি শুল্কের গোলকধাধায় মানুষকে ভুলিয়ে যদি হাজার কোটি টাকার যুগান্তকারী নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করে ফেলতে পারেন, তবে এর চেয়ে সফল বাজেট আর কোনটি!
অর্থমন্ত্রীকে আমরা এখন অনেকেই অনেক কিছু বলছি। বিভিন্ন অভিধায় সিক্ত করছি তাকে। তবে তিনি যদি পরিকল্পনা করে থাকেন যে, আবগারি শুল্কের ঢামাঢোলে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করবেন; তাহলে তো তিনি রাষ্ট্রের অনুকুলেই কাজ করেছেন! রাজস্ববান্ধব পদক্ষেপ সফল ভাবে বাস্তবায়ন করেছেন! এরপর তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন-বেলা শেষে তিনিই হাসবেন এটাই স্বাভাবিক।
তবে আমার উদ্বেগ অন্য জায়গায়। অনেক টক-ঝাল-মিষ্টি আলোচনার পরও সাধারণ ভোক্তার কী হবে? তাদের তো ফোরাম নেই; সংগঠিতও নয় অন্যদের মত। তাহলে তাদের ভোগান্তির বিষয়গুলো রাষ্ট্র কীভাবে সমাধান করবে?
আবগারি শুল্কের ডামাডোলে না হয় নতুন ভ্যাট আইনটি কার্যকর হলোই। আমরাও সরকারের একটি নতুন পদক্ষেপকে স্বাগত জানাচ্ছি। তবে ১ জুলাই থেকে যদি দোকানদার তার পণ্যের জন্য ১৫ শতাংশ বেশি ভ্যাট দাবি করেন, তখন কোন উপায়ে তাকে চ্যালেঞ্জ করা হবে? এমন প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। প্রমাণ আছে আরও। যেমন... এটা যে ১৫ শতাংশ নয়; রেয়াত নেয়ার পর প্রকৃতপক্ষে তাকে যে এর চেয়ে কম দিতে হবে-এটা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? বলা হচ্ছে, ৩৬ লাখের নিচে যেসব ব্যবসায়ীর টার্নওভার, তাদের ভ্যাট দিতে হবে না। তো ভোক্তা কীভাবে বুঝবেন যে কার কত টার্নওভার? সব দোকানদারই তো ১৫ শতাংশ ভ্যাট চাইতে পারেন। এটা ঠেকানোর কী উপায়? টার্নওভার ৩৬ লাখ, না তারচেয়ে বেশি এটা তো বোঝা যাবে বছর শেষে রিটার্ন দেয়ার সময়। অন্য দিকে, যাদের ৩৬ লাখ টাকা টার্নওভার নেই, তাদেরতো ভ্যাট দিতে হবে না। ধরে নিলাম, তারা ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাট নেবে না। তখন একই পণ্য সে কিছুটা কমে বিক্রি করবে। আর যারা ভ্যাটের আওতায় তারা ভ্যাট আদায় করবে। ফলে একই পণ্য ভিন্ন দুই জায়গা থেকে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হলে বাজারে শৃঙ্খলা নষ্ট হবে কিনা? প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হবে কিনা?
জুলাইর প্রথম দিন থেকেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট কাটার আপাত সিদ্ধান্ত রয়েছে, যদিও শেষ মুহুর্তে তা না হবারও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ সবাই সমান সচেতন নয়। সবার শিক্ষাও সমান নয়। সব ব্যবসায়ী সৎ এটাও বলা যাবে না। তাই ভোক্তা হিসেবে তাদেরকে দোকানীরা ঠকাবেন না –এ নিশ্চয়তাও কেউ দিতে পারেন না। এমন এক পরিস্থিতিতে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর কতটা প্রস্তুতি নিয়েছে-এ ব্যাপারেও আমার সন্দেহ রয়েছে।
বলা হয়েছিল, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের সময় অন্তত দশ হাজার প্রতিষ্ঠানকে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার বা ইসিআর দেয়া হবে। বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। ইসিআর মেশিন কী এসেছে? আমার জানামতে, এখনও তা আসে নি। খুব সহসাই যে তা ব্যবসায়িদের হাতে তুলে দেয়া যাবে-তারও নিশ্চয়তা নেই।
ভ্যাটে অন্তত এগারোশত পণ্য ভ্যাটমুক্ত ঘোষণা দেয়া হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে ঠিকই আরোপ করা হয়েছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। বিশেষ করে কৃষিপণ্যে। বাংলাদেশের কৃষি একটি সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সনাতনী পদ্ধতি থেকে বের হয়ে ক্রমেই কৃষিতে ছোয়া লাগছে প্রযুক্তির। যে কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে কৃষককে সহায়তা করা হয় প্রতিবছর; আর এবার রুপান্তরপর্বে কৃষি প্রযুক্তিপণ্যে বসানো হয়েছে উচ্চ হারের ভ্যাট ও শুল্ক।
খোঁজ নিয়ে জানলাম-জমি চাষে যে ট্রাক্টর ব্যবহার করা হয় তার বর্তমান বাজারদর ১০ লাখ থেকে সাড়ে ১৬ লাখ টাকা। ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপে এর দাম বাড়তে পারে দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত। পাওয়ার টিলারে বাড়তে পারে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। জমি চাষের যন্ত্র রোটাভেটরে ৩০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এখন কৃষিতে ব্যবহার হচ্ছে রিপার, হারভেস্টার, রাইস প্লান্টার ইত্যাদি। এসবের প্রতিটির দামই দেড় হাজার টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকা পযর্ন্ত বাড়তে পারে। এসব পণ্য বর্তমানে সরকার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পযর্ন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে। এমন অবস্থায় সরকারের উদ্দেশ্য বিভ্রান্তিকর। বিদ্যুতে ভ্যাট বসানো হয়েছে। এনবিআর বলছে ভ্যাট বাড়বে না। অথচ খোদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী সংসদে বললেন, বিদ্যুৎ বিলে ভোক্তার বাড়তি দিতে হবে ৭ শতাংশ। এরকম অসংখ্য উদাহরণ স্পষ্ট হচ্ছে ধীরে ধীরে। জনমনে প্রতিক্রিয়াও তৈরি হচ্ছে। রাজস্বের প্রয়োজনে নতুন পদ্ধতি চালু করা যেমন অত্যাবশ্যক তেমনি নতুন কিছু পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার জন্যও প্রয়োজন সুষ্ঠু কাঠামো। এ কাঠামোটি মাঠ পর্যায়ে তৈরি হয়নি। না বিক্রেতা বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানে; না ভ্যাট আদায়কারী সংস্থা যথাযথ ভাবে জানাতে পেরেছে। সবকিছুতেই যেন গোলকধাধা!

ফারুক মেহেদী
বিজনেস এডিটর,
চ্যানেল টোয়েন্টিফোর
ই-মেইল: fmehedy@yahoo.com

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আস্থা নেই বিএনপির

রুবির বক্তব্য আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ

মিয়ানমারকেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে

সর্বশেষ আসা রোহিঙ্গাদের মুখে নির্যাতনের বর্ণনা

হঠাৎই সব এলোমেলো

হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি

পাহাড়ে দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টা

একই চিত্র জাকিরুলের বাড়িতে

মা এখনো জানেন না

ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে বিমান বাহিনী

ফের কমলো স্বর্ণের দাম

লিবিয়ার আইএস ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান হামলা, নিহত ১৭

উল্টো পথে আবার ধরা সচিবের গাড়ি

ফের কমলো স্বর্ণের দাম

ছাত্রের হাতে শিক্ষক জখম

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ৮০ ভাগ নারী ও শিশু: কেয়ার