ইচ্ছা থাকিলেই উপায় হয়!

ফেসবুক ডায়েরি

জাহিদ আল আমীন, বার্লিন (জার্মানি) | ৭ জুন ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৫০
১. পবিত্র মাহে রমজানের সকাল-সন্ধ্যা উপবাস আত্নশুদ্ধির! শরীর ও মনের সব কালিমা-জঞ্জাল ধুয়ে-মুছে সাফ করার জন্য মুসলিমদের প্রতি মহান রবের পক্ষ থেকে এক অশেষ নিয়ামত। ভালো কিছু বোঝার ও গ্রহণ করার সৌভাগ্য সবার হয়না। এই রাহমত, নাজাত আর বারকতের গুরুত্ব বোঝা এবং উপকৃত হবার চেস্টা সেই শৈশব থেকেই করে আসছি। ৭/৮ বছর বয়স থেকে এই মধ্য তিরিশে মুসাফির বা কোন ওজর ছাড়া একটা রোজাও ভেঙ্গেছি বলে মনে পড়ছেনা। দোষে-গুণে ভরা মানুষ আমি। তবে ফরজ বিধানগুলোর প্রতি সঠিক বুঝটুকু পাওয়ার কারণে পরম প্রভুর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই শিক্ষার অনেকটাই এসেছে পরিবার থেকে।
 
২. আমার মমতাময়ী মা গত ১৭ বছর যাবৎ ব্রেইন টিউমারের রোগী। শারীরিক নানা জটিলতা থাকা স্বত্তেও কখনো রোজা ছাড়েননি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এবার রোজা রাখতে পারছেন না। একজন অসহায়, বিধবা মহিলাকে বাসায় রেখে সারা মাস খাওয়ানো-পরানো এবং নগদ অর্থ প্রদানের বন্দোবস্ত করার পরেও তার মনোকষ্ট আর আফসোস, আক্ষেপের অন্ত নেই।
 
কেউ কেউ রোজা না রাখার পক্ষে মেডিকেল সাইন্সের রেফারেন্সবিহীন উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন যে, এই দীর্ঘক্ষণের উপবাস ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ক্যন্সার সব রোগ বেড়ে যায়। সত্যিই কি তাই! সে আলোচনায় এখন না যাই।
মনে মনে চিন্তা করি, আল্লাহ যারা সুঠাম দেহের অধিকারী, নিজেদের জোর গলায় মুসলমান দাবি করছে, অথচ এই পরম নিয়ামতের মাসটিকে কাজে লাগাচ্ছে না, ঠুনকো অযুহাত বা খোড়া যুক্তিতে ভরদুপুরে ভাতের প্লেট নিয়ে বসে পড়ে, তাদের মতো দুর্ভাগা আর কয়জনা!
হয়তো এরাই 'ইফতার পার্টি' করে বেড়ায়, 'সেহরি উৎসবে' শামীল হয়, ঈদের বাজারে তাদের দু'হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ।
যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন না কেনো, সারাদিন রোজা রেখে শরীর ও মনের উপবাস যারা করেন তাদের ইফতারি আর যারা দিনভর ভর পেট খেয়ে তারপর যারা ইফতারি করবে, এতোদুভয়ের মধ্যে ফারাকটা তাহলে কোথায়? যে জন সারা মাস শুধু আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে থাকবে তার ঈদ আনন্দ আর যিনি সারা দিন রোজা, রাতে তারাবীহ, ইবাদাত-বন্দেগী করবে, ঈদে গরীব দেরকে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী যাকাত-ফিতরা প্রদান করবে, লোক দেখানো নয়, বরং খোদাভীতি ও খোদাপ্রেমের কারণে অসহায় মানুষদের নিয়ে ইফতারি, ঈদ পালন করবে, এই দুই শ্রেণীর ইফতারি-ঈদ কীভাবে সমান হবে?
 
৩. জার্মানীতে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যবীমা বাধ্যতামূলক। তাই শারিরীক ছোট-বড় যে কোন সমস্যায় ডাক্তারের কাছে যেতে কেউ দেরী করে না। কিছুদিন যাবৎ মাথায় অসহ্য রকমের ব্যথা করছিলো, ঠিকমতো ঘুমাতেও পারতাম না। মাথার বেদনায় চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়তো। গত সপ্তাহে আমার 'মা' জোর করেই বিখ্যাত এক নিওরো স্পেশালিষ্টের কাছে নিয়ে গেলেন। আজ ছিলো এমআরআই এবং অন্যান্য পরীক্ষার টারমিন। আগেভাগেই কাজ থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। আমার বাসা থেকে বেশ কিছুটা দূরে ডায়াস্টিক সেন্টারটি। রাতেই সবকিছু গুছিয়ে রেখেছিলাম যাতে খুব ভোরে রওয়ানা করতে পারি। নির্দিস্ট সময়ে বাস। একটা মিস করলে আবার দু'ঘন্টা অপেক্ষা। কিন্তু শরীর একটু বিছনায় এলিয়ে দিতেই ঘুম। একঘুমে একেবারে সকাল। এখানে সেহরি খেতে জাগিয়ে দেয়ার জন্য ঢাকার মতো মুয়াজ্জিনের সুরেলা কণ্ঠের গান আর মহল্লার উঠতি বয়েসি ছেলেদের জা-গো, জাগোরে মুসলমান মিছিল নেই। অগত্যা না খেয়েই রোজার নিয়্যত করলাম। ১৯ ঘন্টা উপবাস যাপনের প্রস্তুতি। দীর্ঘ ভ্রমণ, এমআরআই এর রেডিয়েশনের প্রতিক্রিয়ায় এক সময় মনে হচ্ছিলো নাড়ি-ভুড়ি সব গলে বের হয়ে আসবে। গলা শুকিয়ে যাচ্ছিলো। রক্তদান ও অন্যান্য টেস্ট সেরে নিজের শহরে ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে গেছে। কড়া রোদের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে বাসায় ফিরলাম। গোসল সেরে নামাজ পড়ে লম্বা একটা ঘুম দেয়ার পরেও দিন যেন শেষ হয়না। এখানে এখন সূর্য ডোবে সন্ধ্যা পৌনে ১০টায়। দিন ক্রমশ: বড় হচ্ছে! এরপরে রুটিন মাফিক গাছে জল দেয়া, নিজের ইফতারি ও রান্না তৈরি করা। অত:পর সেই কাঙ্ক্ষিত ইফতারির সময় এলো। অথচ সকাল থেকে অনেকবার মনে হয়েছে রোজাটা ভাঙ্গতেই হবে, আর হয়তো পারবো না। তবে একথাটাও ভুলিনি যে, শরীরের নাম মহাশয়, যাহা সহাইবেন, তাহাই সয়!
সে যাইহোক, নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ, মোটিভেশন, সর্বোপরি খোদার বিধানের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের কারণের জন্যই আজকে রোজাটা রাখতে পেরেছি। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা।
আল্লাহ প্রত্যেককে সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালনা করুন। আমাদের সকল ভুল-ত্রুটি এবং অপরাধগুলো মাফ করে দিন। ইহকালকে জঞ্জালমুক্ত এবং পরকালকে সুন্দর ও শান্তিময় করুন। আমীন!
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Mohammad Alamgir Qua

২০১৭-০৬-১৮ ০২:১৪:৩০

Thank you very much for a nice experience sharing. It will encourage others brothers to follow it.

অলিউর রহমান

২০১৭-০৬-০৭ ০৯:৩৭:৪৩

সুবহানাহু

আপনার মতামত দিন