নাকচ

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

প্রথম পাতা ২৯ জুলাই ২০২০, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:২৮

দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমছে। আমরা এখন পিক টাইমে নাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এরকম দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে করোনার সংক্রমণ একইভাবে চলছে। বাংলাদেশে করোনার পিক হয়নি। কখনো বাড়ছে। কখনো বা কমছে। কৃত্রিমভাবে পিক দেখানো হয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।

দেশে করোনা সংক্রমণ কমতির দিকে এবং আমরা এখন পিকে নাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এরকম দাবি প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক মানবজমিনকে বলেন, আমি এই বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করি। দেশে সংক্রমণ বাড়ছে। বন্যা, ঈদে গরুর হাট বসানো এবং যাতায়াত বৃদ্ধির কারণে সংক্রমণ আরো বেড়ে যাবে। এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, টেস্টের ফি নির্ধারণের কারণে টেস্ট কমে গেছে। উপসর্গ নিয়ে যারা ঘুরছেন, নমুনা দিতে আসছেন না- তাদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। ফলে সত্যিকারের সংক্রমণ সংখ্যা আমরা জানতে পারছি না। অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক আরো জানান, করোনা রোগী যারা শনাক্ত হচ্ছেন, তাদের সংস্পর্শে যারা আছেন তাদেরকে কোয়ারেন্টিনে নেয়ার ব্যাপারে সরকারের মনোযোগ নেই। ফলে সংক্রমণ বাড়তে থাকবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইইডিসিআর’র উপদেষ্টা ডা. মুস্তাক হোসেন এ ব্যাপারে মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশে বেসিকেলি কোনো পিকই হয়নি। এখানে সংক্রমণের হার বাড়ছে-কমছে। উঠানামার মধ্যে রয়েছে। চীনের দিকে তাকালে বুঝতে পারা যাবে বিষয়টি। ২রা জুলাইর শনাক্তের সংখ্যা (৪ হাজার ১৯ জন, সর্বোচ্চ) এবং ৩রা জুলাই শনাক্তের সংখ্যা (৩ হাজার ১১৪ জন) পাশে রাখলে  বোঝা যাবে- এটাই হচ্ছে কৃত্রিমতা। বাংলাদেশে করোনার পিক হয়েছে বলা যাবে না। টেস্টের ফি নির্ধারণ এবং বন্যার কারণে মানুষ কম নমুনা দিচ্ছেন। কিন্তু শনাক্তের হার ঠিকই বেশি। শনাক্তের হার ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সংক্রমণ পর পর তিন সপ্তাহ কমলে বলা যাবে কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সে রকম পরিস্থিতি এখনো হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশে মহামারির প্রবণতা বিশ্লেষণে সরকার গঠিত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন এ ব্যাপারে মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশে সংক্রমণ একইভাবে চলছে। শনাক্তের হার বেশি। এটা কমাতে হবে।
দেশে করোনা সংক্রমণ কমতির দিকে এবং আইইডিসিআর’র তথ্যও বলছে আমরা পিক টাইমে নাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানার এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান)-এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা মানবজমিনকে বলেন, সংক্রমণ তুলনামূলক কমেছে। একটুখানি কম। এখন স্থিতিশীল রয়েছে। এটা ধরে রাখতে চাই। টেস্টও কমেছে। কিছু কিছু জায়গায় স্থিতিশীল। কিছু জায়গায় বাড়ছে। কিছু এলাকায় কমেছে। মানুষ যেন মাস্ক পরে, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধৌত করে, দূরত্ব বজায় রাখে এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যায়। সেদিকে গুরুত্ব দেন তিনি।
এদিকে, দেশে করোনা সংক্রমণের বিস্তার সর্বত্রই। শনাক্তের হারও বেশি। প্রতি ৪ জনে একজন করোনা রোগী চিহ্নিত হওয়ার প্রতিদিন তথ্য দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু পরীক্ষা কম হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কথায়ও কান দিচ্ছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। সংস্থাটি বলেছে টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট। দেশে ইতিমধ্যেই আক্রান্ত সোয়া দু’লাখ ছাড়িয়েছে। বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। এ অবস্থায় এলাকাভিত্তিক বড় পরিসরে লকডাউন দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল করোনা সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি কমিটি। সর্বশেষ আসন্ন কোরবানির ঈদে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে পশুর হাট স্থাপন না করার পরামর্শ দিয়েছিল জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। কিন্তু রাজধানীসহ উল্লিখিত জেলায় হাট বসেছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ বিস্তার প্রতিরোধে ঈদের ছুটির সময় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম থেকে অন্যান্য স্থানে যাতায়াত বন্ধও রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। করোনা নিয়ন্ত্রণে জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির দফায় দফায় সুপারিশ দিয়েছে নানা বিষয়ে। কিন্তু এসব সুপারিশ কমই আমলে নিয়েছে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ।
গতকাল সংক্রমণের ১৪৩তম দিনে মৃত্যু তিন হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। এ পর্যন্ত মোট শনাক্ত হলেন দুই লাখ ২৯ হাজার ১৮৫ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। এখন পর্যন্ত শনাক্তের হার ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৫৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সংক্রমণ শুরুর ১৩৩ দিনের মাথায় (১৮ই জুলাই) দেশে শনাক্ত দু’লাখ ছাড়িয়েছে। দেড় লাখ থেকে দু’লাখ হতে সময় লেগেছে ১৬ দিন। ১১৭ দিনের মাথায় শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৭৭ জন। শনাক্ত এক লাখ থেকে দেড় লাখ হতে সময় লেগেছিল ১৪ দিন। ১০৩ দিনের মাথায় দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ২৯২ জন। প্রকোপ শুরুর পর প্রথম ৫০ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৮৭ দিনের মাথায় এরপর তা ১ লাখে পৌঁছাতে সময় লেগেছে মাত্র ১৬ দিন। গত ৮ই মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় এবং মারা যায় প্রথম ১৮ই মার্চ। ৩০শে জুন সর্বোচ্চ সংখ্যক ৬৪ জন রোগীর মৃত্যু হয় দেশে। ২৮শে জুন জারি করা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুসারে, বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হলে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা এবং নির্ধারিত নমুনা সংগ্রহ বুথ বা সরকারি হাসপাতালে নমুনা দেয়া হলে ২০০ টাকা ফি দিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য জনপ্রতি তিন হাজার ৫০০ টাকা করে নিয়ে থাকে। যদি কারো নমুনা বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা হয় তবে এই ফি চার হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়।
বর্তমানে সারা দেশে ৮১টি প্রতিষ্ঠান কোভিড-১৯ পরীক্ষা করছে। এই ৮১টি ল্যাবে গড়ে দৈনিক পরীক্ষার সক্ষমতা ১৩ হাজার থেকে ১৯ হাজার। গত রোববার (২৬শে জুলাই) ভারতে সাড়ে চার লাখ পরীক্ষা করা হয়। সেখানে ওইদিন বাংলাদেশে টেস্ট হয়েছে ১০ হাজারের কিছু বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখে দুই হাজার ৪১২ জনের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হচ্ছে। যা ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক কম।
প্রসঙ্গত, ২৭শে জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ কমতির দিকে। তিনি আরো বলেন, আইইডিসিআর’র তথ্যও বলছে আমরা পিক টাইমে নাই। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম এতে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা আরো বলেন, দেশে কোভিড-১৯ কেস এখন কমতির দিকে। কারণ রিয়েল যারা তাদেরই টেস্ট হচ্ছে। যেকোনো উপসর্গ থাকলে বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলে পরীক্ষা করান। কিন্তু মানুষের পরীক্ষা করার আগ্রহ একটু কম কারণ কেস একটু কমেছে। আমরা এখন পিকে নাই, আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান)-এর তথ্যও বলছে আমরা পিক টাইমে নাই। টেস্ট তুলনামূলকভাবে কমেছে। তবে আমরা যে পর্যায়ে গিয়েছিলাম, প্রায় ১৯ হাজারের কাছাকাছি সে তুলনায় কম। তিনি আরো বলেন, একইসঙ্গে ঘনবসতি, বস্তিতে কেস কম, নাই বললেই চলে। উপজেলা-জেলা সব জায়গায় নমুনা নেয়ার ব্যবস্থা আছে। তাই আমরা অনুরোধ করছি, কারও উপসর্গ থাকলে যেন টেস্ট করতে আসেন। এখন সরকার নির্ধারিত একটা ফি আছে, সে কারণে অনেকে টেস্ট করতে আসছে না- এটা হতেও পারে। ফি-এর বিষয়টি যেহেতু মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত সে বিষয়ে আমাদের কিছু করার নাই। ফি দিয়েই পরীক্ষা করতে হবে।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

সিনহার মায়ের কান্না

এটাই যেন শেষ ঘটনা হয়

১১ আগস্ট ২০২০

ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি

কোতোয়ালি থানার ওসি’র বিরুদ্ধে মামলা

১১ আগস্ট ২০২০

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেছেন ...

পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তথ্য

কাছ থেকে ৪টি গুলি করা হয়েছিল সিনহাকে

১০ আগস্ট ২০২০

সাবমেরিন ক্যাবলে জটিলতা ইন্টারনেটে ধীরগতি

১০ আগস্ট ২০২০

দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের (সি-মি-উই-৫) পাওয়ার ক্যাবল কাটা পড়ায় দেশে ইন্টারনেটে ধীরগতি বিরাজ করছে। পটুয়াখালীতে সাবমেরিন ...



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত