জনস্বাস্থ্য সংকটে ডিজিটাল সমাধান

অ্যালেক্স রবিনসন ও রাকিব অভি

অনলাইন ৩ জুলাই ২০২০, শুক্রবার, ৪:০৫ | সর্বশেষ আপডেট: ৪:১৩

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছেন নীতি নির্ধারকরা। বাংলাদেশের জন্য মহামারিটি তীব্র মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। দেশটির বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি লকডাউনের মাঝে ধসে পড়েছে। এদেশে প্রতি ১০টি চাকরির ৯টিই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অন্তর্গত। দেশজুড়ে চালানো এক জরিপ অনুসারে, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে চরম দারিদ্রতায় বাসকারী পরিবারগুলোয় উপার্জন ৭৩ শতাংশ কমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশজুড়ে দ্রুত ঝুঁকির মুখে থাকা পরিবারগুলোকে সহায়তা দিচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সহায়ক পদ্ধতি হয়ে উঠেছে নগদ অর্থ পাঠানো। করোনা-সংশ্লিষ্ট সহায়তা প্রকল্পের ৬৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এই নগদ অর্থ প্রদান।
অর্থনীতি পুরোপুরি না চালু হওয়া পর্যন্ত চরম দারিদ্রতার মাঝে বাস করা মানুষের জন্য নগদ অর্থ বর্তমানে একমাত্র  সমাধান হয়ে উঠতে পারে। দাতব্য সংস্থা ব্র্যাক এরকম ২০ হাজার ছিন্নমূল, অতিদরিদ্র ও দিনমজুর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, অকার্যকর বাজার ব্যবস্থার মধ্যে খাদ্য বিতরণের চেয়ে নগদ অর্থ প্রদান বেশি কার্যকর।
নগদ অর্থ প্রদান দ্রুত গতিতে শুরু করতে চাইলেও, মহামারির মধ্যে বেশকিছু বাধার সম্মুখীন হয়েছে ব্র্যাক। লকডাউনে চলাফেরা সীমাবদ্ধ থাকার কারণে অর্থ প্রদানের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোয় অনেকের যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর বাসিন্দারা এ সমস্যার বেশি সম্মুখীন। এছাড়া, লম্বা লাইন ও ভীড় থেকে ভাইরাসটি সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। আর্থিক সংকট যত তীব্র হবে অর্থ বিতরণ ঘিরে গ্রাহক ও কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিও ততো বাড়বে। এক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতিতে টাকা পাঠানো বেশি কার্যকর ও দ্রুত ও কম ঝুঁকিসম্পন্ন। গ্রাহকরাও নিজেদের সুবিধামতো এ অর্থ খরচ করতে পারবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মহামারিতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ বিনিময়ের পরামর্শ দিয়েছে। কেননা, নোটের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
ব্র্যাক ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ বিতরণ শুরু করে গত এপ্রিলে। প্রাথমিকভাবে অল্প পরিসরে শুরু করলেও পরবর্তীতে ৪১ জেলাজুড়ে অর্থ প্রদান করে তারা। সংস্থাটির মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রদানকারী বিকাশ ও ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক দলের সমন্বয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করা হয় আল্ট্রা-পুর গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচির আওতায়। ২৩শে এপ্রিল পর্যন্ত ৬ হাজার ২৪২ জন ব্যক্তিকে বিকাশের মাধ্যমে ১ হাজার ৫০০টাকা করে দেয়া হয়েছে। এই অর্থ প্রদানের মাধ্যমে সংস্থাটি যা শিখেছে তা  নিম্নরুপ- 
১- গ্রাহকদের ডিজিটাল পদ্ধতির স্বাক্ষরতার যথাযথ মূল্যায়ন করা: বাংলাদেশের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কেননা, এদেশে মোবাইল ব্যবহারকারির সংখ্যা বেশি থাকলেও তাদের মধ্যে ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার বিষয়ক স্বাক্ষরতার হার কম। দেশের প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্কের কোনো ব্যাংক একাউন্ট নেই। ব্র্র্যাক বিকাশের মাধ্যমে দেশজুড়ে অর্থ বিতরণের আগে প্রাথমিকভাবে চার জেলায় ২৪২টি পরিবারের ডিজিটাল স্বাক্ষরতা মূল্যায়নে জরিপ চালায়। তাতে দেখা গেছে, ৩৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর ইতিমধ্যেই বিকাশ একাউন্ট আছে। পরবর্তীতে ব্র্যাক তাদের অর্থ পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে। সে তথ্য যাচাই করে তাদের একাউন্টে অর্থ পাঠানো হয়। ব্র্যাকের মূল্যায়নে আরো বেরিয়ে আসে যে, ৩৮টি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের কোনো মোবাইল ফোন নেই। তাদের ক্ষেত্রে, প্রতিবেশী বা কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ পাঠানো হয়।
২- যাদের কোনো একাউন্ট নেই তাদের একাউন্ট খুলে দেয়া: বিকাশের প্রাথমিক জরিপ মূল্যায়নে দেখা যায় যে, ৪৮টি পরিবারের কাছে মোবাইল ফোন থাকলেও তাদের কোনো বিকাশ একাউন্ট নেই। এক্ষেত্রে তাদের একাউন্ট খুলে দিতে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কাজ করেন বিকাশের কর্মীরা। একাউন্ট খোলার ব্যাপারে ওই ৪৮ পরিবারকে বুঝিয়ে তাদের নিকটস্থ একটি বিকাশ এজেন্টের কাছে গিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। একাউন্ট খোলার পর তাদের কাছে অর্থ পাঠানো হয়।
৩- গ্রাহকদের প্রদানকৃত তথ্য ভুল থাকার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অর্থ প্রদানে বিলম্ব এড়ানো: জরুরি ভিত্তিতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে এমন সেবা প্রদানকারী ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেটি গ্রাহকদের কাছে পরিচিত, বিস্তৃত পরিসরে সুলভ ও দ্রুত গ্রাহক অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম। বিকাশের এসকল সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অর্থ প্রদানকালে অনাকাক্সিক্ষত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল ব্র্যাক। বিকাশের জনপ্রিয়তা বিস্তৃত হওয়ার কারণে অনেকে মোবাইলে টাকা পাঠানোর অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বোঝাতেও এর নাম ব্যবহার করে থাকেন। যদিও আদতে তাদের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের একাউন্ট খোলা।
৪- ডিজিটাল সেবার সুবিধা অনুধাবনের ক্ষেত্রে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন: ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে যে, নারীরা এ ধরণের সেবা গ্রহণে পুরুষদের চেয়ে কম দক্ষ। তবে ব্র্যাকের জরিপে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। তাদের জরিপে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ নারীরই বিকাশ একাউন্ট আছে ও তারা এর মাধ্যমে লেনদেনে সম্পর্কে অবগত। নারীরা এই সেবা ব্যবহার করে বেশকিছু সুবিধা নিতে পারেন। প্রথমত, তাদের ব্যয় অধিকতর ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, এটা টাকার নোটের পাশাপাশি তাদের অর্থের নতুন উৎস। তৃতীয়ত, এমএফএস একাউন্টগুলো তাদের উন্নত আর্থিক নিরাপত্তা দেয়।
৫- জরুরি অর্থ লেনদেনে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রস্তুতি নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমর্থন নিশ্চিত: সেবাদান অব্যাহত রাখতে এমএফএস এজেন্টদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে সমর্থনের প্রয়োজন ছিল। লকডাউনে দেশজুড়ে সকল নন-এসেনশিয়াল বা অনাবশ্যক সেবা বন্ধ রাখা হয়। সেসময় বাংলাদেশের ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক খাদ্য সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবার মতো আবশ্যক সেবার পাশাপাশি এমএফএস সেবাদানকারীদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেয়। যার ফলে, এজেন্টরা সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে পেরেছে। তবে তা সত্ত্বেও, দেশজুড়ে বিকাশের সক্রিয় এজেন্টের সংখ্যা মহামারিতে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চলগুলোয় এমনটা বেশি দেখা গেছে। সেসব অঞ্চলে গ্রাহকরা একাউন্ট খোলায় জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ, অর্থ প্রদান ও গ্রহণেও নানা জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে সহায়তা প্রদান ও গ্রহণকারীরা। ওই অঞ্চলগুলোয় ডিজিটাল অর্থ লেনদেন সহজলভ্য করতে বাংলাদেশকে আরো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
মহামারি মোকাবিলায় অর্থনীতি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ অর্থ লেনদেনের নিরাপদ ও ডিজিটাল সেবা চালুর চেষ্টা করছে, যাতে দরিদ্রদের কাছে কার্যকরভাবে আর্থিক সহায়তা পাঠানো যায়। এখন অবধি ব্র্যাক ডিজটাল সেবা ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার মানুষকে সহায়তা প্রদান করেছে।
(এই নিবন্ধটি স্ট্যানফোর্ড সোস্যাল ইনোভেশন রিভিউ-তে প্রকাশিত হয়েছে।)

আপনার মতামত দিন

অনলাইন অন্যান্য খবর

ছড়া

করোনা

৩ আগস্ট ২০২০

আরব নিউজের রিপোর্ট

ঢাকা-ইসলামাবাদের শান্ত কূটনীতি

৩ আগস্ট ২০২০



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত