'ওই যে যায় করোনা দিদি'

শামীমুল হক

মত-মতান্তর ৮ এপ্রিল ২০২০, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ৭:৪৪

সর্বত্র ভয়। আতঙ্ক। গভীর রাতে কুকুরের কান্নার আওয়াজ। দিনের কাকগুলো করছে অশুভ শব্দ। মুরব্বিরা বলতেন - কোন বিপদ পশু পাখিরাই আগে দেখে। কুকুরের কান্না ভাল লক্ষণ নয়। মহাবিপদ সঙ্কেত। এমনটাই মনে করতেন পূর্ব পুরুষরা।
সকালে ঘুম ভেঙ্গেছে মাইকের আওয়াজে। ঘোষণা -সবাই আল্লাহকে ডাকুন। বেশি বেশি নামাজ পরুন। সত্যিই বাংলাদেশের আকাশে গাঁঢ় অন্ধকার। সাংবাদিক  দুলাল ঘোষের কথা -  সাবধানে থাকবেন। উৎসুক আর ধৈর্যহীনদের সংখ্যা অনেক। তাই আক্রান্তের সংখ্যা কম হওয়ার কথা নয়। চারপাশ এখনো শব্দহীন। তবু কেন যেন কানে বাজছে বিলাপের শব্দ। মানুষ এখনো তরজমা করে যাচ্ছে। হে করোনা তাদের করুনা কর। দেশে দেশে চলছে জরুরি অবস্থা। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। খবর আসছে, যুবকরা জেগে উঠছে। নিজ নিজ গ্রাম তারা স্বউদ্যোগে লকডাউন করে দিচ্ছে। মানুষ নিজ থেকেই লাঠি হাতে মাঠে নেমেছে। পিটিয়ে মানুষকে বাড়ি পাঠাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এপ্রিল মাস কঠিন সময়। রাতের পর দিন আসবেই। কিন্তু এ রাত কত দীর্ঘ? এ রাত কত ভয়ংকর? সেটাই অজানা। কলকাতার এক
নার্স ফেসবুক লাইভে এসে বলেছেন - আমরা যারা হাসপাতালের স্টাফ তারা যেন এখন সমাজে উচ্ছুৎ হয়ে গেছি। নার্সরা বাজারে গেলে সবাই দৌঁড়ে পালায়। মুখ ফিরিয়ে নেয়। বলে, ওই যে যায় করোনা দিদি। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখন তামাশার সময় নয়। বিপদ মোকাবিলার সময়। অবস্থা ভালো নয়। যখন দলে দলে আক্রান্ত রোগী আসবে। তখন আমরা বাঁচাতে পারব না। লাশের সারি লম্বা হবে। সময় থাকতে সবাই সজাগ হোন। মেডিকেলের স্টাফ হিসেবে তিনি যে কত হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন তারও করুন বর্ণনা তুলে ধরেন। হাসপাতালে চাকরি করেন বলে বাড়িওয়ালা গভীর রাতে বের করে দিয়েছেন। বাড়িওয়ালার শঙ্কা এই নার্সের মাধ্যমেই করোনা আসতে পারে তার বাড়িতে। তার মূল মেসেজ ছিল, ডাক্তার নার্সরাই শেষ পর্যন্ত সঙ্গী হবে। তাদের তামাশার পাত্র বানাবেন না। ভয়াবহ দিন আসছে। সেদিন আত্মীয় স্বজন কেউ পাশে থাকবে না। ডাক্তার নার্সরাই থাকবে।

বাংলাদেশের মানুষ একের পর এক ভুল করে যাচ্ছে। আল্লাহ সহায় না হলে এ ভুলের চরম মূল্য দিতে হবে। দেশে অঘোষিত লকডাউনের পরদিন থেকেই ত্রানদাতারা ত্রানের মাল নিয়ে মাঠে নেমে পরড়ন। শত শত মানুষ জড়ো করে ত্রান দেন। এ ছবি আবার মনের আনন্দে ফেসবুকে আপলোড করেন। এমনো ছবি দেখা গেছে, যিনি মাস্ক দিচ্ছেন অন্যকে,  তার নিজের মুখেই মাস্ক নেই। আবার একটি মাস্ক দেয়ার ছবি তুলতে দশজনের ঠেলাঠেলি। সবচাইতে বড় কথা - যখন থেকে ত্রান দেয়া শুরু হয়, তখন কি ত্রান দেয়ার আসল সময় ছিল? দেশের একজন দিনমজুরের ঘরেও এখন কমপক্ষে সাতদিনের খাবার মজুত থাকে। সময়ের আগে ত্রান দেয়া ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে নাতো? দেখা গেল যখন ত্রানের দরকার, তখন কেউ ত্রান নিয়ে এগিয়ে আসছে না। আবার শত শত মানুষ জড়ো করে ত্রান দেয়ার ফলে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া হয়নি তো? এটাতো বন্যাদুর্গতদের জন্য ত্রান নয়।  ভয়াল ঘুর্নিঝড়ে স্বর্বস্ব হারানোদের জন্যও এ ত্রান নয়। তাহলে এত দ্রুত কেন ত্রান নিয়ে নামতে দেয়া হল? এ প্রশ্ন কিন্তু এখন সচেতন সবার মুখে মুখে। কথায় বলে বাংলাদেশ অনুকরনণের দেশ। একজন এটা করছে, তাই আমাকেও করতে হবে। তাই বলে কেউ একজন দ্বিগম্বর হয়ে হাঁটলে তার দেখাদেখি আমরা সবাই কি দ্বিগম্বর হয়ে রাজপথে নামব? এ দ্বিগম্বরকে স্টাইল মনে করব? পক্ষান্তরে কিন্তু এটাই করা হচ্ছে। বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ কারো সতর্ক বার্তাই আমরা কানে নিচ্ছি না। গতকাল থেকে একটা বিষয় লক্ষ্য করছি,  আশপাশের সব ভবনের ছাদে মানুষ আর মানুষ। কেউ আড্ডা দিচ্ছে, কেউ ক্যারাম খেলছে।  তাদের কথা আমরা তো বাইরে যাচ্ছি না। বাসার ছাদে একটু সময় পার করছি। অথচ মহল্লায় মহল্লায় মসজিদে আজান দিচ্ছে। আজানের পর ঘোষনা দিচ্ছে - সবাই ঘরে নামাজ পড়ুন। মসজিদে আসবেন না। ঘর থেকে বের হবেন না। টিভির পর্দা খুললে ভেসে আসছে দেশে দেশে মহামারীর চিত্র। কোন কিছুতেই যেন বাঙালিকে আটকে রাখা যাচ্ছে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই হয়তো লিখেছেন, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।

আপনার মতামত দিন



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত