সিরাজদিখানে স্কুলের ডিজিটাল হাজিরা মেশিন ক্রয়ে পুকুরচুরি

সিরাজদিখান (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি

বাংলারজমিন ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শনিবার

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সারা দেশের ন্যায় সিরাজদিখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন (ডিজিটাল সিস্টেম হাজিরা মেশিন) ক্রয় করা হয়েছে। উপজেলার ১২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন ক্রয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশই মানা হয়নি। আইন বহির্ভূতভাবে ডিজিটাল মেশিনগুলো প্রায় দ্বিগুণ দামে ক্রয় করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অমান্য করে ও মেশিন ক্রয়ে পুকুরচুরির অভিযোগের প্রেক্ষিতে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাহী বি বদরুদ্দোজা চৌধুরী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মালামাল ক্রয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের আদেশে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন ক্রয়ের নিয়ম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাজার থেকে যাচাই করে সাশ্রয়ী মূল্যে নিজেদের পছন্দমতো ডিজিটাল হাজিরা মেশিন ক্রয় করে স্কুলে স্থাপন করবে। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন সেই নির্দেশ অমান্য করে তার পছন্দ মতো কোম্পানি থেকে মেশিন ক্রয় করেন। তার পছন্দ মতো ২-৩ জন শিক্ষক নেতাদের সহযোগিতায় উপজেলার ১২৮টি বিদ্যালয়ে সেগুলো পাঠিয়ে দেন। সে কোনো বিদ্যালয় সভাপতি বা কমিটিকে না জানিয়ে নিজেই একাজ করেন।
এ ব্যাপারে উপজেলার বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল হাজিরা মেশিনের মডেল, ক্রয় মূল্য ও ফিটিং চার্জের ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে জানান। শিক্ষা কর্মকর্তা উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্লিপের ফান্ড থেকে এ মেশিন ক্রয় বাবদ ১২৮টি স্কুলের প্রতিটি স্কুল থেকে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কেটে নিয়েছে। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা জানান, এ মেশিনের বাজারমূল্য আনুষঙ্গিকসহ খরচ পড়ে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা। গত মে মাসে এসব মেশিন লাগানোর পর মূল্য দেখে পর তোলপাড় শুরু হয়। কিন্তু বায়োমেট্রিক হাজিরা সিস্টেম চালু করার সময় পার হলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এখনো কার্যক্রম চালু হয়নি। আরো খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাশের উপজেলা শ্রীনগরের বিদ্যালয়গুলোতে একই মেশিন ১৫ হাজার টাকার মধ্যেই ক্রয় করা হয়েছে।
সিরাজদিখান উপজেলার রশুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোকশানা বেগম, জানান, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমাদের স্লিপের টাকা থেকে ৩৩ হাজার টাকা নিয়েছে ডিজিটাল শিক্ষক হাজিরা মেশিন ক্রয়ের ব্যাপারে। আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন প্রথমে ভিসতা কম্পিউটার কোম্পানির মাধ্যমে আমাদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেন গত মে মাসে। ঐ কোম্পানির প্যাডে উল্লেখ ছিলো ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু গত সেপ্টেম্বর মাসে আবার প্রত্যাশা কমিউনিকেশন এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম কোম্পানির মাধ্যমে ৩২ হাজার ৯শ’ ৪৫ টাকার বিল পাঠায়। কিন্তু ডিজিটাল মেশিন ক্রয়ের পূর্বে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি এই শিক্ষা কর্মকর্তা। আরমহল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজন ব্যানার্জি জানান, কত সমস্যা কী বলবো। উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশ মোতাবেক আমাদের কাজ করতে হয়। তিনি আমাদের প্রধান। এই মেশিন ছাড়া এর আগে বইসহ নানা ঘটনা আছে। আমরা তো সব বলতে পারি না। কালীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সানোয়ারা বেগম জানিয়েছেন, তিনি বালুচর ক্লস্টারের নিকট থেকে ৩২ হাজার ৯শ’ স্লিপের টাকা দিয়ে এ মেশিন নিয়েছেন। এ ব্যাপারে উপজেলার গুয়াখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি সামসুজ্জামান পনির, সতুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি এডভোকেট মো. রুহুল আমিন, চরবিশ্বনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মো. আতাউর রহমান বলেন, আমাদের বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকদের সঙ্গে কোনোরূপ যোগাযোগ না করে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নিজের পছন্দের কোম্পানির মাধ্যমে ডিজিটাল শিক্ষক হাজিরা মেশিন আমাদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেন। এ ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের চাপের মধ্যে রাখে। তার নির্দেশ অমান্য করলে আমাদের চাকরির অসুবিধা হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তাই চাকরির ভয়ে আমরা তার কথা মতো কাজ করছি। তার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ করে বলেন, এই কর্মকর্তা টানা পাঁচ বছরের অধিক সময় এই উপজেলায় কর্মরত আছেন। কিন্তু নিয়মানুযায়ী একজন কর্মকর্তার দুই বছরের বেশি একই উপজেলায় থাকার নিয়ম নেই। অথচ এত অভিযোগ তার বিরুদ্ধে থাকা সত্ত্বেও তার বদলি হয় না। তার বিরুদ্ধে গত ৬ মাস আগে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে জেলা কর্মকর্তার বদলি হয়েছে। আর আমরা তো সাধারণ শিক্ষক।
শিক্ষক নেতা ও কৃষ্ণনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাজী মো. মহসিন জানান, উপ-পরিচালক, জেলা শিক্ষা অফিসার, কোম্পানির কর্মকর্তার আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা ব্যাংকে টাকা জমা দিয়েছি ৩২ হাজার ৯শ’ টাকা। আমাদের স্কুলে হাজিরা মেশিন লাগিয়ে দিয়েছে গত ২০১৯ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে।
এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, এসব ক্রয়ের ব্যাপারে জেলা অফিসে যান, তারা বলতে পারবে, আমার জানামতে উপ-পরিচালক জেলা কর্মকর্তা, কয়েকটি কোম্পানি দরপত্র দিয়েছে। ওখান থেকে যে কোম্পানি পেয়েছে তারাই এগুলো দিচ্ছে। এর বেশি তিনি বলতে পারবেন না বলে জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশফিকুন নাহার বলেন, এ ব্যাপারে স্থানীয় মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মাহী বি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নির্দেশে শিক্ষা কর্মকর্তার এই দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে উপজেলা পরিষদ ভাইস-চেয়ারম্যান মঈনুল হাসান নাহিদকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আপনার মতামত দিন



বাংলারজমিন অন্যান্য খবর

করোনা সন্দেহে বাসাইলে আরো ১ বাড়ি লকডাউন

১ এপ্রিল ২০২০

টাঙ্গাইলের বাসাইলে জ্বর-কাশি নিয়ে হানিফ খান (৩৫) নামের এক ব্যক্তি ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরায় করোনা ...

সীতাকুণ্ডে চাঁদাবাজির সময় কনস্টেবলসহ আটক ৩

১ এপ্রিল ২০২০

সীতাকুণ্ডে পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর পরিচয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজির সময় সোহেল রানা নামক সিএমপির এক ...



বাংলারজমিন সর্বাধিক পঠিত