‘হত্যা’র আগে বিরিয়ানি খাওয়ানো হয় মোবারককে

রুদ্র মিজান

প্রথম পাতা ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:১১

মোবারক করিমকে কৌশলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মাতুয়াইলের ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে। সেখানেই ‘হত্যা’ করা হয় তাকে। ওই হাসপাতালে রাতভর আটকে রাখা হয়েছিল। হাসপাতালের সিসি টিভির ফুটেজে মোবারককে বারবার পায়চারী করতে দেখা গেছে। মোবারক যাতে হাসপাতাল থেকে বের হতে না পারেন এজন্য হাসপাতালের কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন পরিচালকরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদে সেই রাতের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

পরিচালকদের নির্দেশেই  মৃত্যুর আগে বিরানী খাওয়ানো হয় মোবারককে। পরদিন সকালে হাসপাতালের পরিচালক জামালের কক্ষে পাওয়া গেছে মোবারকের লাশ।
শরীরে ছিল আঘাতের চিহৃ। নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, কর্মস্থল থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয় মোবারককে। এ ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের দুই পরিচালক জামাল হোসেন ও আক্তার হোসেনর মামুন। এই দু’জনকে আসামি করে ডেমরা থানায় মামলা করেছেন নিহতের বড় ভাই রহুল আমিন। হত্যার অভিযোগে মামলা হলেও মোবারককে হত্যা করা হয়েছে নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারলেই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সূত্রে জানা গেছে, চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি আজ কালের মধ্যেই ডিবি পুলিশে হস্তান্তর করা হবে। মোবারক ‘হত্যার’ কারণ হিসেবে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। এ বিষয়ে বেশ কয়েক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। হাসপাতালের পরিচালক আক্তার হোসেন মামুন এলাকায় জমির দালাল হিসেবে পরিচিত। এছাড়া মামুন দাদন ব্যবসা করেন। মামুনের বন্ধু পরিচালক জামাল হোসেন। ঘটনার প্রায় দেড় মাস আগে মামুনের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা সুদে নিয়েছিলেন মোবারক করিম। মাধ্যম ছিলেন জামাল।

কথা ছিলো মাসে ২০ হাজার টাকা করে সুদ দেবেন। সুদে-আসলে ওই টাকা দেয়ার তারিখ ছিলো গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি। এজন্যই পরদিন ডেকে নেয়া হয় তাকে। ডেকে নেয়ার পরে সেখানে কি ঘটেছিলো, এই রহস্য উদঘাটন করতে তদন্ত করা হচ্ছে। মাতুয়াইলের মুসলিমনগরের একটি ৯ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার আংশিক ও তৃতীয় তলা নিয়ে ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। ঘটনার দিন কিছু সময় সেখানে ছিলেন হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. ফেরদৌস। হাসপাতালের ফুটেজে দেখা গেছে পরিচালক মামুন ও জামালের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছেন মোবারক। ১৪ই ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে ওই হাসপাতালে ছিলেন মোবারক। অনেক সময় তাকে একা একা পায়চারি করতে দেখা গেছে। এসময় তার চেহারা ছিলো বিমর্ষ। পরিচালকদের নির্দেশ ছিলো কোনোভাবেই যেনো মোবারক হাসপাতালের বাইরে যেতে না পারেন। নির্দেশ দেয়া ছিলো হাসপাতালের পাবলিক ম্যানেজমেন্ট অফিসার আব্দুল জলিলকে। তাকে হাসপাতালে আটকে রেখে টাকা আদায় করতে চেয়ছিলেন মামুন ও জামাল।

সূত্রমতে, কয়েক জনের কাছে ফোনে টাকা খুঁজেছিলেন মোবারক। টাকা শোধ করেই এখান থেকে বের হতে হবে এমনটি নিশ্চত হওয়ার পরেই টাকার জন্য অপেক্ষা করছিলেন বলেই তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা। বিকালে তাকে কলা, রুটি খেতে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু তিনি খাননি। এরমধ্যে একাধিকবার পরিচালকদের কক্ষে আসা যাওয়া করেছেন তিনি। এক পর্যায়ে তৃতীয় তলায় পরিচালক আক্তার হোসেন মামুনের সাত নম্বর কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। রাত ১০টার দিকে কক্ষের বাইরে পায়চারি করেছেন মোবারক। জিজ্ঞাসাবাদে হাসপাতালের কর্মচারীরা জানিয়েছেন, রাতে মোবারককে বিরানী খাওয়ার প্রস্তাব দেন মামুন। কিন্তু মোবারক খেতে আগ্রহ দেখাননি। হাসপাতালের একটি সূত্রে জানা গেছে, রাতে বিরানী খাওয়ানো হয় তাকে।

হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. জি এম ফেরদৌসের সঙ্গে রাত ১২টায় দেখা হয়েছিলো মোবারকের।  এ বিষয়ে তিনি জানান, প্রো অ্যাকটিভের কর্মকর্তা হিসেবেই পরিচিত হন মোবারক। তিনি কার কাছে কেন এসেছেন তখন জানতেন না বলে জানান ডা. ফেরদৌস।

পরে মোবারককে হাসপাতালে জামালের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন সকালে ওই রুম থেকে গ্রীলের সঙ্গে গলায় তোয়ালে প্যাঁচানো অবস্থায় লাশ পাওয়া যায় মোবারকের। রুম পরিস্কার করতে গেলে তা বন্ধ পান হাসপাতালের কর্মচারী দিপু। বারবার বাইরে থেকে নক করেও সাড়া পাচ্ছিলেন না। ভেতরে কে আছে জানার জন্য কৌশলে দরজার নিচ দিয়ে মোবাইলফোন নিয়ে একটি চিত্র ধারণ করেন দিপু। এটি দেখেই চিৎকার করেন তিনি। ছবিতে দেখা যায় গ্রীলের সঙ্গে ঝুলে আছেন মোবারক। তারপরই দরজা ভেঙ্গে উদ্ধার করা হয় তাকে। পুলিশ জানিয়েছে, খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

নিহত মোবারকের বড় ভাই রুহুল আমিন জানান, মোবারককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে গ্রীলের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হয়। কার কাছে কার টাকা পাওনা ছিলো এ বিষয়ে নিশ্চিত না হলেও তিনি শুনেছেন জামালের কাছে টাকা পেতো মোবারক। ওই টাকা আদায় করার চেষ্টা করতে গেলেই তার ভাইকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। রুহুল আমিন জানান, বারডেম-২ হাসপাতালের এনেস্থেশিয়া বিভাগ ছাড়াও মোবারক পার্টটাইম কাজ করতেন যাত্রাবাড়ীর প্রো অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ঘটনার দিন আড়াইটার দিকে মোবারককে সঙ্গে করে নিয়ে যান জামাল ও মামুন। রাত সাড়ে ৮টার পর থেকে বারবার মোবারকের ফোনে কল দিলেও তা রিসিভ হয়নি। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচার দাবি করেছেন নিহতের পরিবার। ডেমরা থানার পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, মামুন ও জামালকে গ্রেপ্তার করলেই পুরো রহস্য উদঘাটন হবে। তাদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, মোবারক হোসেন দক্ষিণ দনিয়ার এ কে উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন। তিনি ভোলার লালমোহন উপজেলার ধলিগৌরনগরের সোলাইমানের পুত্র। সাত মাস আগে বিয়ে করেছিলেন মোবারক।

আপনার মতামত দিন



প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

‘লকডাউন’

২৭ মার্চ ২০২০

ছুটির নোটিশ

২৬ মার্চ ২০২০

আজ ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মানবজমিন-এর সকল বিভাগ বন্ধ থাকবে। তবে ...



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত