ফুলের গ্রাম সাবদি পর্যটন এলাকা ঘোষণা

নূরুজ্জামান মোল্লা, বন্দর (নারায়ণগঞ্জ) থেকে

বাংলারজমিন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শনিবার

ফুলের গন্ধে ঘুম কেড়ে নেয়ার মতোই একটি গ্রাম সাবদি। যেদিকে দু’চোখ যায় দেখা যায় ফুল আর ফুল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই চোখ জুড়িয়ে আসতে চায়। ফুলের সুবাস যেন মন ভরিয়ে দেয়। এমন ফুলের রাজ্যে যেতে চাইলে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। ঢাকার কাছেই নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় সাবদি গ্রাম। এ গ্রামের আশপাশের সব জমি ও বাড়ির আঙ্গিনায় কাঠমালতি, গাঁদা, ডালিয়াসহ হরেক রকমের ফুলের বাগান। বাড়ির আঙ্গিনায় বসে কাঠমালতির কলি দিয়ে গাজরা ও লহর বানাতে ব্যস্ত গৃহবধূ-মেয়ে ও ছেলেরা।
বাড়ির পাশে বিস্তীর্ণ মাঠে রঙবেরঙের ফুল। এক অন্যরকম দৃশ্য ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউপির সাবদি গ্রাম। সাবদি গ্রাম পুরোটা এখন ফুলের গ্রাম। এ গ্রামের কৃষকরা অন্য ফসল বাদ দিয়ে ঝুঁকছে ফুল চাষে। সাবদি গ্রাম ছাড়াও দীঘলদি,  সেলশারদি, মাধবপাশা ও আইছতলাসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে এ ফুল চাষ করা হচ্ছে। গলাগাছিয়া ইউনিয়নের এসব গ্রামের ১৫-১৬ হাজার নারী-পুরুষ এ ফুল চাষে এখন স্বাবলম্বী। প্রায় দেড়শ’ হেক্টর আবাদি জমিতে ২৪-২৫ ধরনের ফুল চাষ হচ্ছে। বসন্তের ভালোবাসা দিবস ও ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা ও শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে ৪-৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা করছেন এখানকার ফুল চাষিরা। ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত নারী-পুরুষ ভিড় জমান সাবদি গ্রামে। সাবদির সবচেয়ে বড় ফুল বাগানের মালিক মো. জাকির হোসেন বছরের বারো মাসই তিনি ফুল চাষ করেন। তার বাগানে চাষ করা হচ্ছে- গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, বাগানবিলাস, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, কসমস,  দোলনচাঁপা, নয়নতারা,  মোরগঝুঁটি, কলাবতী, বেলি, জিপসি, চেরি, কাঠমালতি, আলমন্ডা, জবা, রঙ্গন, টগর, কাঠগোলাপ, রক্তজবা ও ক্যালেন্ডুলা। তিনি আরো বলেন, ফলন ভালো হলে লাভ বেশি হয়। তবে ফুল চাষের জন্য মানসম্পন্ন বীজ, চারা ও টিস্যু কালচারের জন্য গবেষণাগার নেই। স্বল্প সুদে ঋণের সুবিধা পাওয়া যায় না। উৎপাদিত ফুল সংরক্ষণে কোনো হিমাগার এবং বাজারজাত করারও ভালো ব্যবস্থা নেই। এসব সমস্যার সমাধান হলে এ গ্রামে ফুলের চাষ আরো বাড়বে, আগ্রহী হবে কৃষকরা। সেলশারদি গ্রামের ফুল চাষিরা বলেন, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকাসহ  দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভালোবাসা দিবস, পহেলা বৈশাখ, ২১শে ফেব্রুয়ারিসহ নানা দিবস ছাড়াও বিয়ে, জন্মদিন পূজা-পার্বণে ফুলের বেশ চাহিদা থাকে। এ সময় দামও ভালো পাওয়া যায়। দীঘলদি গ্রামের বেকার যুবক সুধেব চন্দ্র দাস প্রথম এ গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ শুরু করেন। পরে আরো কয়েকজন যুবক ওই গ্রামে সুধেবের দেখাদেখি ফুলের চাষাবাদ শুরু করেন। ওই গ্রামের রহমতউল্লাহ ১৯৯২ সালে ডেমরার বাওয়ানী জুটমিল থেকে তার চাকরি চলে যায়। জীবিকা নির্বাহে রাজধানী ঢাকায় ফেরি করে ফুলের ব্যবসা করতেন। পরে গ্রামের আরেক ফুল ব্যবসায়ীর উৎসাহে ১৯৯৫ থেকে ৯৬ সালে তিনি গ্রামে এসে অন্যের জমি ইজারা নিয়ে ফুল চাষ শুরু করেন। ফুল চাষ করে রহমতউল্লাহ এখন ২০ বিঘা জমির মালিক। ফুলে ফুলে মালা গেঁথে ঘরে বসেই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বাড়তি আয় করে সংসারে সহায়তা করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। ফুল শ্রমিকরা বলেন, এখানকার নারীরা সাংসারিক সুখ-দুঃখের আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে ডালা ভরে ফুলকলি তুলে যার যার বাড়িতে ফিরে আসে। কাঠমালতির ফুল দিয়ে ‘গাজরা’ ও ফুলকলির লহর বানাতে ব্যস্ত থাকে পুরো এলাকার নারীরা। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও সকালে কলি তুলে স্কুলে যায়। তারা আবার বিকালে বাড়ি ফিরে ফুলের লহর বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারহানা সুলতানা জানান, বছরের বারো মাসই বন্দরের কয়েকটি গ্রামে ফুল চাষ করা হয়। পহেলা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এ তিনটি দিবসেই প্রায় ৫-৬ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ব্যস্ত ফুল চাষি ও ব্যবসায়ীরা। বন্দর থানা বহুমুখী ফুল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাওলাদ হোসেন বলেন, সারা বছর ফুলের ব্যবসা হলেও বিশেষ বিশেষ সময়ে বেশি ভালো হয়। বিভিন্ন দিবসে ফুল বিক্রির ধুম পড়ে যায়। চীন থেকে আসা কৃত্রিম ফুল বাংলাদেশে আমদানি সরকার বন্ধ করলে এ ব্যবসায় আরো সাফল্য আসবে। নারায়ণগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক ড. গোলাম মোস্তফা জানান, ফুল চাষ লাভজনক। নারায়ণগঞ্জে বিশেষ করে বন্দরে ফুল চাষ ব্যাপকতা লাভ করেছে। বন্দর উপজেলা সাবদি গ্রামের পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব তীরে সোনারগাঁ উপজেলার সম্ভুপুরা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে এবং রূপগঞ্জ উপজেলার মাসুমাবাদ ও ভোলাব গ্রামে ফুল চাষে স্বাবলম্বী অনেকে।

সম্প্রতি, বন্দরের দীঘলদি এলাকায় একটি মন্দিরের উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে গিয়ে সাবদিকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। তিনি বলেছেন, ‘এই এলাকার চারপাশে ফুলের ক্ষেত। অপরপাশে ব্রহ্মপুত্র নদ। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসেন এ গ্রামে। তাই এটিকে সম্পূর্ণভাবে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ এতে সব থেকে বেশি সহযোগিতার প্রয়োজন হবে স্থানীয় এলাকার জনগণের।

আপনার মতামত দিন



বাংলারজমিন অন্যান্য খবর

কুমিল্লায় গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ২ যুবক কারাগারে

৯ এপ্রিল ২০২০

‘সাবেক আইনমন্ত্রী ও কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের এমপি এড.আবদুল মতিন খসরু করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার বঙ্গবন্ধু ...

কোটচাঁদপুরে টিসিবি’র পণ্য বিক্রির নামে ডিলারদের নাটক

৯ এপ্রিল ২০২০

কোটচাঁদপুরে ডিলারদের মাধ্যমে টিসিবি’র সয়াবিন তৈল, মসুর ডাল ও চিনি বিক্রি শুরু হয়েছে। কিন্তু ডিলারদের ...

চট্টগ্রামে আরও ৬০ জনের পরীক্ষা, তিনজনের করোনা শনাক্ত

৮ এপ্রিল ২০২০

বুধবার দুপুরের পর চট্টগ্রামে আরও ৬০ জনের নমুনা পরীক্ষা করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ...

লাকসামে অঘোষিত লকডাউন

৮ এপ্রিল ২০২০

নাঙ্গলকোটে গত দুই দিনে পর পর দুইজনের মৃত্যু হওয়ায় লাকসাম-নাঙ্গলকোট প্রধান সড়ক ও বিভিন্ন মহাসড়ক ...



বাংলারজমিন সর্বাধিক পঠিত



বঙ্গবন্ধুর খুনি গ্রেফতার প্রসঙ্গ পররাষ্ট্রমন্ত্রী-

করোনা সংকটের মধ্যেও আমরা খুশির একটা খবর পেলাম