রকেট খুন, গ্রেপ্তার ৯

সরাইল থমথমে, চরম উত্তেজনা

সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি

অনলাইন ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শুক্রবার, ৫:১৪ | সর্বশেষ আপডেট: ৭:২৪

সাবেক ই্উপি সদস্য হত্যার ঘটনায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে সরাইলে। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে সর্বত্র। এ ঘটনায় পুলিশ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে সরাইল সদর ইউপির সাবেক সদস্য আবু বক্কর সিদ্দিক রকেটকে। সরাইল সদরে হঠাৎ কয়েকটি মটর বাইক, একাধিক মাইক্রোবাস ও সিএনজি চালিত অটোরিকশার মহড়া। পরপর পাঁচটি ককটেলের বিস্ফোরণ।

তাৎক্ষণিক চলে যায় বিদ্যুৎ। ১০-১২ মিনিট পর বিদ্যুৎ আসে।
ধূঁয়ায় আচ্ছন্ন গোটা এলাকা। চারিদিকে আতঙ্ক। দুইদিক থেকে ১৫-২০ জন লোক ঘেরাও করে রেখেছে সাবেক ইউপি সদস্য রকেটকে (৫৪)। তাদের হাতে চাপাতি, চাইনিজ কুড়াল, দা, লোহার রড ও লাঠি। সড়কের পাহাড়ায় চলে যায় ১০-১২ জন। অন্যরা প্রথমে কূঁপিয়ে রকেটের ডান পা ও হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। পরে এলোপাতাড়ি কূপ ও রডের আঘাতে মাটিতে পড়ে যান রকেট। রকেটের চিৎকারে লোকজন এগিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু খুনিদের বেরিকেট ভেঙ্গে কেউ আসতে সাহস পায়নি। আপন ভাতিজা ওয়াসিম চাচার জীবন বাঁচাতে এগিয়ে এসে গুরুতর আহত হয়েছে। হাতে পায়ে ও মাথায় কূপের আঘাতে এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ওয়াসিম। তান্ডব চালিয়ে ঘাতকরা চলে গেলে রকেটকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে সরাইল ও পরে জেলা সদর হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায়। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সরাইল সদরের সকাল বাজার এলাকায় রকেটের নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে এ হত্যা কান্ডের ঘটনা ঘটে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মালিগাঁও গ্রামের নান্নু মিয়া নামের এক ব্যক্তিসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘটনাস্থলে পুলিশ অবস্থান করছে। পুলিশ, নিহতের স্বজন ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বেপারি পাড়া গ্রামের ধনু মিয়ার ছেলে ইউপি সদস্য শাহআলম ও সাবেক ইউপি সদস্য চমক মিয়ার ছেলে রকেট। তাদের দুই গোত্রের বিরোধ শতাধিক বছরের। পূর্ব বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্ধন্ধী প্রার্থীদের সমর্থনকে কেন্দ্র করে বর্তমান ইউপি সদস্য শাহ আলম ও সাবেক ইউপি সদস্য রকেটের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নতুন করে বিরোধ চলে আসছে। তাদের সমর্থকরা একে অপরের উপর একাধিকবার হামলা করেছে। উভয় পক্ষের সংঘর্ষে কিরন নামের এক ব্যক্তিকে খুনের অভিযোগে মামলাও হয়েছে। ওই মামলায় তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান শের আলম মিয়াকে আসামীও করা হয়েছে। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মার্চ নির্বাচনে রকেট আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রফিক উদ্দিন ঠাকুরকে সমর্থন করেন। শাহআলম সমর্থন দেন আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শের আলম মিয়াকে। নির্বাচনের দিন শাহআলমের লোকজনের খুরের আঘাতে গুরুতর আহত হয় রকেট। গত কোরবাণী ঈদের আগের দিন শাহআলমের ভাইসহ দুইজনকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে রকেটের লোকজন।

এর জেরে রকেটের বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলাও হয়েছে। রকেট তিন মাস কারাভোগের পর কিছুদিন আগে জামিনে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন রকেট। তার নিজের দোকানের সামনে যাওয়া মাত্র ১৫-২০ জন লোক তাকে চতুর্দিকে ঘিরে ফেলে। তাদের প্রত্যেকের হাতে চাপাতি, দা, ছুঁড়া, চাইনিজ কুড়াল, লোহার রড সহ অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র। প্রথমে তারা কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাসের সৃষ্টি করে। বাজারের ব্যবসায়ি ও পথচারিরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ফিল্মি ষ্টাইলে ১০-১২ জন চলে যায় পাহাড়ায়। অন্যরা রকেটের উপর পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে ঠান্ডা মাথায় হামলা চালায়। তারা প্রথমেই কূঁপিয়ে রকেটের ডান পা ও হাতটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এ সময় লোকজন রকেটকে রক্ষার চেষ্টা করলে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেয় অপারেশনে অংশ নেয়া পাহাড়াদাররা। পরে অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে রকেটকে এলোপাতাড়ি ভাবে কূঁপিয়ে গুরুতর জখম করে শাহ পাড়া ও বিকাল বাজারের দিকে পালিয়ে যায় ঘাতকরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রকেটকে জেলা সদর হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায়। রকেটের মৃত্যুর খবরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বেপারী পাড়া এলাকায়। সার্কেল এসপি মো. মাসুদ রানা ও অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে পুলিশ অবস্থান নেয় নিহতের বাড়ির সামনে।

রকেটের বাড়িতে আসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.এস.এম মোসা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই এলাকায় পুলিশের পাহাড়া চলছিল। নিহতের পারিবারিক সূত্র জানায়, ভাইয়ের নির্মম হত্যার খবরে লন্ডন থেকে রকেটের বোন আসছেন। এ জন্য দাফনে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান চালিয়ে জেলা শহরের কান্দিরপাড় এলাকা থেকে ৮ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। আর নিহতের ছেলে রনি (২৫) ও স্বজন মনির (২৬) বলেন, এ হত্যা কান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হচ্ছে শাহআলম, শের আলম মিয়াসহ আরো কয়েকজন। আমরা হত্যার সাথে জড়িত সকল অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। এ বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার চেষ্টা করেও শাহআলম ও শের আলম মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সরাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)  মো. শাহাদাত হোসেন টিটো বলেন, পূর্ব বিরোধের জেরেই এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যেই হত্যাকান্ডের হোতা ও জড়িতদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি।  কোন অপরাধীই রেহায় পাবে না।

পুত্রের পথেই পিতার প্রস্থান: ২০০৩ সালে রকেটের শিশু পুত্র রক্সিকে (১২) খুন করে বস্তায় ভরে ট্যাংকির ভিতরে ফেলে রেখেছিল ঘাতকরা। হত্যাকারীরা ছিল তারই আশপাশের স্বজন। আসামী ছিল কামাল, আলাল ও জাহাঙ্গীরসহ কয়েকজন। একজনের ফাঁসি ২-৩ জনের যাবজ্জীবন জেলের রায় হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতে আপীল করে রক্ষা পেয়ে যায় অপরাধীরা। ১৮ বছর পর সন্তানের পথেই প্রস্থান করতে হয়েছে পিতা রকেটকে।

১০ মিনিট কেন বিদ্যুৎ বিহীন?  এতদিন তো এমন সময় বিদ্যুৎ যায়নি। ককটেল বিস্ফোরণের পর কেন বিদ্যুৎ চলে গেল। আবার ১০-১২ মিনিট পরই বা কেন বিদ্যুৎ আসল। এর পেছনে কোন রহস্য আছে কিনা তা নিয়ে চুলচেড়া বিশ্লেষণ করছেন লোকজন।

গোটা গ্রামে মাতম: রকেটের নির্মম বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে স্তদ্ধ হয়ে গেছে সরাইল। আর গোটা বেপারী পাড়ায় চলছে শোকের মাতম।

বাজারে মাছের আকাল: রকেট হত্যার কারণে আজ মাছের আড়ত ছিল বন্ধ। সরাইলে পাইকারী ভাবে মাছ ক্রয় বিক্রয় হয়নি। তাই গতকাল সরাইলে ছিল মাছের আকাল। দামও ছিল চড়া। সকাল বাজার বন্ধ: রকেট হত্যার পর সকাল বাজারের সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। দৈনিক যে হাট বসত সেটিও বসেনি গতকাল।

আপনার মতামত দিন



অনলাইন অন্যান্য খবর

নওগাঁয় ট্রাকচাপায় নিহত ৩

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

দিনাজপুরে যুবক খুন

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কী আছে পাপিয়ার ভিডিও ক্লিপে?

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পাপিয়ার বিরুদ্ধে মামলা

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত