করোনা ভাইরাস

পর্যটন, ব্যবসায় বড় ধাক্কা

মিজানুর রহমান ও অনিম আরাফাত

প্রথম পাতা ২৯ জানুয়ারি ২০২০, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৩২

করোনা ভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে চীন। এক ভাইরাসের পেছনেই ছুটছে প্রভাবশালী এ দেশটি। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক- সবাইকে ভাবাচ্ছে বিষয়টি। শুধু কি তাই? প্রাণঘাতী ভাইরাসটি দ্রুত ছড়ানোর কারণে আতঙ্ক এখন বিশ্বজুড়ে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পর্যটনে এটাকে একটি বড় ধাক্কা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা থেকে কুনমিং এবং গুয়াংজুগামী ফ্লাইটে যাত্রী সংখ্যা গত দুদিনে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। গত রাতে একটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স তার পূর্ব নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল করেছে।
ফ্লাইটের বুকিং বাতিল করা ছাড়াও টিকেট কনফার্ম থাকার পরও যাত্রী বিমানবন্দরে উপস্থিত না হওয়ার (নো শো) পরিমাণ বড়ছে। চায়না সাউদানের বিমাবন্দরের দায়িত্বরত কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে বলেন, সোমবার রাতের গুয়াংজুগামী তার ফ্লাইটে ৯০ জনের কনফার্মেশেন ছিল। তারা সবাই চীনের নাগরিক। কিন্তু চূড়ান্তভাবে ৭০জন গেছেন। বাকী ২০জন চীনের নাগরিক শেষ পর্যন্ত যাননি। তারা নো শো হয়েছেন। 

মঙ্গলবারের ফ্লাইটে যাত্রী প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানান তিনি। ওই কর্মকর্তার মতে, সরকারের নির্দেশনা না পওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট চলবে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা ভাইরাস আতঙ্কে ভুগছেন। কর্মীদের ঝুকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। দায়িত্ব পালনকালে তারা মাস্ক, হেক্সাসল এবং গ্লাবস ব্যবহার করছেন জানিয়ে ডিউটি অফিসার সালাউদ্দিন বলেন, এই পরিস্থিতিতে আমরা কতটা নিরাপদ? তা নিয়ে প্রতিনিয়ত শঙ্কার মধ্যে আছি। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ মনিটরের সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, উহান ভাইরাস পুরো এশিয়ার ট্যুরিজমে দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব ফেলবে। এর ক্ষতির প্রভাবও হবে সুদূর প্রসারী। তিনি বলেন, চীনের প্রচুর ট্যুরিস্ট বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশের অনেকে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক কারণ ছাড়াও ভ্রমণে চীনকে বেছে নেন। বিশেষ করে শীতকাল বা তার কাছাকাছি সময়ে।

কিন্তু ভাইরাসের কারণে এবার সেটি বাধাগ্রস্ত হলো। ১০-১৫ দিন পর এটির প্রভাব আরও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশের এখনও নাজুক অবস্থায় থাকা পর্যটন শিল্পের জন্য এটি একটি বড় আঘাত বলে মন্তব্য করেন ওই বিশেষজ্ঞ। বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস বাংলার  মুখপাত্র কামরুল ইসলাম মনে করেন এটি কেবল বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটনে বড় ধাক্কা। ট্যুরিজম সেবা প্রতিষ্ঠান গুলশানের এওট্যেক-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঞ্জুরুল আলম নয়নের প্রাক্কলন হচ্ছে চীনা ভাইরাসের কারণে দক্ষিণ এশিয়া এবং দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের যাতাযাত ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে। তবে চীন পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে এবং মানুষের মধ্যে সৃষ্ট আতঙ্ক কাটলে এটি আরও কমে আসবে। তবে এটি যে ধাক্কা তা মানছেন তিনিও। বেইজিংয়ের ডেটলাইনে প্রচারিত রিপোর্ট বলছে, করোনাভাইরাসে চীনে মৃত্যুর সংখ্যা একশ ছাড়িয়েছে। দেশজুড়ে বহু শহরে গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এমন সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে দেশটির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, ভ্রমণ কিংবা চলাচলে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এটি আরও কড়া হচ্ছে। উহান শহর, যেখান থেকে প্রথম ভাইরাসটি ছড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছ, সেই শহরটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে চীন সরকার।

ওদিকে চীনের বাইরেও ভাইরাসটিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও জার্মানিতে নতুন আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ফ্রান্স, তাইওয়ান, নেপাল এবং যুক্তরাষ্ট্রেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। ভাইরাসের কারণে চীনা নববর্ষের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। এটি অনির্দিষ্টকালের দিকেই যাচ্ছে। নববর্ষ কেন্দ্রিক দেশটির ব্যবসা লাটে ওঠেছে। ভাইরাসটির বিস্তার রোধে উৎপত্তিস্থল হুবাই প্রদেশের সঙ্গে চীন তথা গোটা দুনিয়ার যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে বেইজিং। একটাই চাওয়া যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। বিশ্ব মিডিয়া বলছে, আচমকা ছড়িয়ে পড়া ওই ভাইরাস ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য বড় ধাক্কা! রিপোর্ট বলছে, ব্যবসা বা পর্যটনের জন্য চীন সফরের পরিকল্পনা নেয়া অনেকে ফ্লাইট ও হোটেল বুকিং বাতিল করছেন। চীনা লুনার ইয়ার উপলক্ষে প্রতিবছরই এ সময়ে পর্যটনমুখর থাকে চীনের হোটেল আর পর্যটন কেন্দ্রগুলো। পরিবারের টানে দেশে ফিরেন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা চীনা নাগরিকরা। যাত্রীসেবায় ব্যন্ত থাকে এয়ারলাইন্সগুলো। কিন্তু এ বছরের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। নববর্ষের উৎসব-আনন্দ মাটি হয়ে গেছে অনেক আগেই। ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের হুবাই প্রদেশে এখন এক ভূতুরে পরিবেশ। রিপোর্ট বলছে, নববর্ষে কয়েক লাখ পর্যটক চীন ভ্রমণ করেন। চায়না সাউদার্ন চায়না ইস্টার্ন এবং চায়না এয়ার প্রধানত যাত্রীদের অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে সেবা দিয়ে থাকে। আর চীনের বৃহত্তম অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ট্রিপ ডট কম হোটেল ও পরিবহন সেবা দিয়ে থাকে। ট্রিপ ডটকমের মুখপত্র বলছেন, পরিস্থিতির কারণে তারা পূর্বনির্ধারিত হোটেল বুকিং এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহনের টিকিটের বুকিং বাতিলের জরিমানা মওকুফ করতে বাধ্য হচ্ছে। ঘটনা ভয়াবহতায় বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের শেয়ারের দরও পতন শুরু হয়েছে বলে রিপোর্ট আসছে। রিপোর্ট বলছে, চীনের অর্থনীতির ১১ শতাংশ পর্যটন নির্ভর। এ খাতকে ঘিরে ২ কোটি ৮০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স আর স্পেনের পর বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম পর্যটনবান্ধব দেশ চীন। ২০১৮ সালে দেশটিতে পর্যটক গেছেন ৬ কোটি। ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসলে তা দেশটির অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর আগে ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল।

বিশ্ব মিডিয়ার খবর: বিবিসি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস করোনা ভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ প্রকাশ করছে। রিপোর্টগুলো বলছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য এরইমধ্যে করোনা ভাইরাসের প্রভাব টের পেতে শুরু করেছে। আর সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে চীন নিজেই। দেশটিতে বর্তমানে অন্তত ১৫টি শহর অবরুদ্ধ হয়ে আছে যেখানে বাস করেন প্রায় ৬ কোটি মানুষ। অবরুদ্ধ এই অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশটির খুচরা বাজার, ভ্রমণ বানিজ্য ও পর্যটন ক্ষাত। সেখানে এখন চন্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে সাত দিনের সরকারি বন্ধ চলছে। এই সময় জমজমাট হয়ে ওঠে ব্যবসা-বানিজ্য। মানুষজন দীর্ঘ ছুটিতে প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু করোনাভাইরাসে থমকে গেছে সব।

বেইজিং যদিও চন্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে ছুটি তিন দিন বাড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু কোমপানিগুলো বলছে তারা এবারের ছুটির মৌসুমে লাভবান হতে পারছেন না। স্টারবাকস, কেএফসি, ম্যাকডনাল্ডস ও পিজা হাটের মতো কোমপানিগুলো ঘোষণা দিয়েছে এই ছুটির মৌসুমে তাদের শাখাগুলো সব বন্ধ থাকবে। এরমধ্যে কয়েকটি কোমপানি সমগ্র চীনজুড়ে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। বাকিগুলো শুধু অবরুদ্ধ শহরগুলোতে। ডিজনি সাংহাই ও হংকং-এ তাদের পার্কগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। চন্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে এসবে ছিলো বিশেষ সব আয়োজন। প্রসাধনী কোমপানিগুলো জানিয়েছে, বছরের এই সময় সাধারণত তাদের বেচাকেনার উর্ধ্বগতি থাকে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে তাদের বেচাকেচা উলটো কমে গেছে। ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে ক্ষতিগ্রস্থ হতে শুরু করেছে চীনের অর্থনীতি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও দেশটিতে বিনিয়োগকারীরা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যবসা ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। শিল্পগুলোর সাপ্লাই চেইন ভেঙ্গে যাচ্ছে। ফলে পন্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন এক সংকটের দ্বারপ্রান্তে অর্থনীতি।

আপনার মতামত দিন



প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

ছুটির নোটিশ

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আজ মানবজমিন-এ ছুটি থাকবে। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় আগামীকাল পত্রিকা প্রকাশিত হবে। ...

সিপিডির সেমিনারের তথ্য

২০৩০ সালে দেশ থেকে অর্থ পাচার ১৪ বিলিয়ন ছাড়াবে

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কারণ ছাড়াই বাড়ছে চালের দাম

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

করোনায় মৃত্যু ২০০০ ছাড়ালো

সিঙ্গাপুরে আক্রান্ত বাংলাদেশি সংকটাপন্ন

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

করোনা নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে কারা?

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত