যমুনায় নাব্যতা সংকট ভরসা ঘোড়ার গাড়ি

প্রতীক ওমর, বগুড়া থেকে

এক্সক্লুসিভ ২৮ জানুয়ারি ২০২০, মঙ্গলবার

যমুনা সেতু তৈরি ও নদী শাসন করে পশ্চিম পাড়ে বাঁধ, গ্রয়েন, হার্ডপয়েন্ট নির্মার্ণের ফলে চরম নব্য সংকটে যমুনা। মানুষের চলাচলের জন্য এখন একমাত্র বাহন হিসেবে চলছে ঘোড়ার গাড়ি। চরের কৃষিপণ্য, রোগী বহন থেকে শুরু করে সব কিছুর জন্যই এই বাহনের বিকল্প কিছু নেই। চরের অধিকাংশ এলাকাজুড়ে বালি। ফলে এখানে অন্যকোন যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়। কিছু কিছু জায়গায় লক্ষ্য করা গেছে বালির উপর খড়কুটা বিছিয়ে কোন রকমে চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।
১৯৯৮ সালের পর থেকে যমুনা সেতুর উজানে নদী ভরাট হয়ে চর জাগতে শুরু করে। এখন যমুনা সেতুর উজানে সিরাজগঞ্জ থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত ২৩০ কি.মি. নদীতে ছোট বড় চরের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার।
নতুন আরো এক হাজার চর জেগে ওঠার অপেক্ষায় আছে।
একসময়ের প্রমত্তা যমুনা নদী এখন নাব্যতা হারিয়ে বিভিন্ন রুটে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। যমুনার বুকে এখন ধূ ধূ বালু চর। মাইলের পর মাইল হেঁটে চরে বসবাসরত মানুষকে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
যমুনা সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে শুরু করে উত্তরপ্রান্ত কুড়িগ্রাম পর্যন্ত যমুনার অববাহিকায় দেড় হাজারের বেশি চর জেগেছে। এইসব চরের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক চরে মানুষ বসবাস করে। শিক্ষার আলো, স্বাস্থ্য সেবা, সড়ক সেবাসহ প্রায় সব ধরনের নাগরিক সেবা বঞ্চিত বরাবরই এই মানুষগুলো। বালির মাঝেই চাষাবাদ এবং গরু ছাগল পালন এদের প্রধান পেশা। এখন অবশ্যই অনেক চরে মরিচ, আলু, বাদাম, গোম, ভুট্টাসহ প্রায় সব রকমের ফসলের চাষ হয়। তার পরেও এই চারের কৃষিকরা বঞ্চিত কৃষি সেবা থেকেও। কিছু না পেলেও এই মানুষগুলোর না পাওয়ার কোন অভিযোগ নেই। সাঘাটার দিঘলকান্দি চরের বাসিন্দা মির্জা নূরুন্ননবী বলেন, আমরা চরের মানুষ অনেক সুখে আছি, ভালো আছি। আমরা কারো কাছে কিছু চাই না। জনবসতি এসব চর এলাকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য চর হচ্ছে, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, টেংরাকান্দি, গাবগাছি, পারুল, খাটিয়ামারি, গলনা, খোলবাড়ি, সাঘাটা উপজেলার দিগলকান্দি, পাতিলবাড়ি, গুয়াবাড়ি, গাড়ামারা, হরিচন্দ্র, এজেন্ডাবাড়ি, বগুড়ার ধুনটের, বৈশাখী, ভান্ডাবাড়ি, মাঝিরারচর সারিয়াকান্দি উপজেলার ধারাবর্ষা, শংকরপুর, চন্দনবাইশা, চরলক্ষিকোলা, ডাকাতমারাচর, ইন্দুরমারিরচর, চরকর্নিবাড়ি, তালতলা, বেনুপুর, পাকুরিয়া, চরমানিকদাইর, চরদলিকা, শিমুলতাইড়, চরকালুয়াবাড়ি, চরবিরামেপাচগাছি, নয়াপাড়া, জামথল, চরবাকিয়া, ময়ূরেরচর, চরদেলুয়াবাড়ি, কুড়িপাড়ারচর, চরশালিকা, করমজাপাড়া, টেকামাগুড়ারচর। এসব চর ছড়াও যমুনাপড়েরর আরো অসংখ্য চর আছে। এই সব চরের মানুষরা আধুনিক বাংলাদেশ থেকে অনেক দুরে এখনো অবস্থান করছে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। বিদ্যুৎ তাদের কল্পনার বিষয়। সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, দীন দুনিয়ার অনেক তথ্য থেকে তারা এখনো অনেক ব্যবধানে আছে ।
এসব বালুচরের কারণে বর্ষা মৌসুমেও নৌকা চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। এছাড়াও উজান থেকে নেমে আসা সামান্য ঢলের পানিতেই নদী পরিপূর্ণ হয়ে নদীতে অকাল বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পর পরেই নদীতে নতুন নতুন চর জেগে উঠায় নৌকা আর চলে না। ফলে উৎপাদিত কৃষি পণ্য সহজে বাজারজাত করা যায় না। আবার বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে হাট-বাজার, অফিস আদালত, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজে সময়মত আসা তাদের জন্য দূরহ হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। নদী নাব্য হারিয়ে যাওয়ায় চরে তাদের বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নদীতে না চলছে নৌকা আবার ধূ ধূ বালুতে না চলছে কোন যানবাহন। মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুতে না যাচ্ছে হেঁটে পথ চলা।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, যমুনার মূল উৎপত্তি পাশের দেশ ভারতে। উৎপত্তিস্থল থেকে যখন পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করে তখন এর গতি থাকে অনেক। পানির গতির কারণে ভরতের অংশের মাটি বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন টন আমাদের নদীতে পরে। এর ফলে ক্রমান্বয়ে নদী ভরাট হতে থাকে। নদীর গভীরা কমে বর্ষা মৌসুমে অল্প পানিতেই বন্যার সৃষ্টি হয়। অপর দিকে সরকারি ভাবে নদী ড্রেজিং সেভাবে চোখে পরে না।
অন্য দিকে ইউরিয়া সার ও অন্যান্য মালামাল বোঝাই নৌকা কালিতলা ঘাটে ভিড়ছে না। তবে এসব পণ্যবাহি নৌকা সদর থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে গজারিয়া ঘাটে ভিড়ছে। এতে সময় ও খরচ পড়ছে বেশি। স্থানীয় চরবাসীরা জানায়, আগে এ যমুনা নদীর পথে নিয়মিত দেশের বিভিন্ন বন্দর থেকে তেল সারসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে জাহাজ চলাচল করায় এটা জাহাজ গড়ান নদী হিসাবে সবার কাছে পরিচিত রয়েছে। নদীর গভীরতা হারিয়ে যাওয়ায় আর কোন জাহাজ কার্গো উত্তর দিকে যাতায়াত করছে না। এখন নদীর এমন অবস্থা জাহাজ তো দূরের কথা পণ্য বোঝাই নৌকা নিয়ে হাটে ঘাটে যাওয়াই কঠিন।
কাজলা ইউনিয়নের চকরথিনাথ চরের সাহের আলী, বেণীপুর চরের আব্দুস সালাম, নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পায়ে হেঁটে বালু পথ পাড়ি দেয়া দুরূহ্‌ হয়ে পড়েছে। সারিয়াকান্দি সদরে আসতে আগে সকালে বাড়ি হতে বের হয়ে আবার দুপুরের মধ্যেই বাড়ি ফেরা যেত। আর এখন সকালে বাড়ি হতে বের হয়ে রাতের আগে বাড়ি ফেরা যায় না।একারনে আমরা সাত আট মাস ধরে সারিয়াকান্দি হাটে আসা যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। নয়াপাড়া চরের সেকেন্দার আলী জানান, বাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়ায় আগে বাড়ি থেকেই স্কুলে লেখাপড়া করত। কিন্তু এখন অনেক পথ হেঁটে চর পাড়ি দিয়ে স্কুলে পৌঁছা কঠিন হয়ে পড়ায় ছাত্রছাত্রীদের অন্যের বাড়িতে রেখে পড়া শিখাতে হচ্ছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলার গণমাধ্যমকর্মী ইমরান হোসাইন রুবেল বলেন, এই উপজেলায় কমপক্ষে ৫’শর মতো ঘোড়ার গাড়ি বিভিন্ন চরে যাতায়াত করছে। নদীতে পানি না থাকায় এক চর থেকে অন্য চরে ছুটে চলছে এসব ঘোড়ারগাড়ি। কর্ণিবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আজাহার আলী মন্ডল বলেন, এসময় চরে জনপ্রিয় বাহন হচ্ছে ঘোড়ারগাড়ি। নান্দিনাচর, ডাকাতমারাচর, ইন্দুরমারাচর ও পূর্ব শনপোচাচরে নিয়মিতভাবে চলাচল করে এসব গাড়ি। উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার নাইম হোসেন বলেন, দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যর সাথে টমটম বা ঘোড়ার গাড়ি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শহরে দেখা না গেলেও চরে আজও চলে ঘোড়ার গাড়ি।

আপনার মতামত দিন



এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

করোনা ভাইরাসে

নতুন চিকিৎসা ১২ ঘণ্টায় সফলতা!

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

সাক্ষাৎকারে মানারাত ইউনিভার্সিটির ভিসি

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ জ্ঞান সৃষ্টি করা

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত