লাশ গুমের অভিযোগ সিলেটের পাথর কোয়ারিতে

তিন বছরে ৭৬ শ্রমিকের মৃত্যু

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে

এক্সক্লুসিভ ২৪ জানুয়ারি ২০২০, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:২২

সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে শ্রমিক মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। বেলার হিসাব মতে, পাথর কোয়ারিগুলোতে গত তিন বছরে ৭৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। পাথরখেকো সিন্ডিকেটরা শ্রমিকের লাশের উপর দিয়েই এসব কোয়ারি থেকে লুট করেছে শ’শ কোটি টাকার পাথর। প্রশাসনও আগের মতো এখনো নির্বিকার। বরং মাঠ পর্যায়ের পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা টাকার বিনিময়ে পাথরখেকোদের হয়ে কাজ করার বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। পাথরখেকোদের তাণ্ডবে পাহাড়, টিলা, সরকারি রাস্তা, সংরক্ষিত স্থাপনা, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে। এদিকে পাথর কোয়ারিগুলোতে শ্রমিক মৃত্যু রোধ ও পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সিলেটের পরিবেশকর্মী ও বিশিষ্টজনরা। কোম্পানীগঞ্জের শারপিন টিলা।
দেশজুড়ে আলোচিত এক নাম। এক সময় শারপিন টিলা ছিল ৫০-৬০ ফুট উঁচু এক পাহাড়। এই পাহাড়ের এখন আর অস্তিত্ব নেই। লুটেপুটে শারপিন টিলাকে সাবাড় করে দেয়া হয়। এখন শারপিন আর টিলা নয় বিশাল এলাকা পরিণত হয়েছে গহিন গর্তে। কালিবাড়ির লিলাইবাজারের একটি সরকারি রাস্তার প্রায় ৫০০ ফুট রাস্তা নিচিহ্ন করে দিয়েছে পাথরখেকোরা। গত কয়েকদিন ধরে পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে কোটি টাকা পাথর লুট করলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এ ব্যাপারে কালিবাড়ি গ্রামের নুরুল ইসলাম (সাবেক মেম্বার) পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করলেও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। রাস্তা কেটে পাথর উত্তোলনের ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। সিলেটের জাফলং ইসিএ এলাকা। সংরক্ষিত এলাকা হওয়ার পরও পাথরখেকোরা জাফলংয়ে পাথর উত্তোলন করেছে। এতে গত দু্‌ই বছরে অন্তত ১৫ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। প্রায় দুই মাস আগে নদীতে পাথর উত্তোলনে বাধা দেয়ায় জাফলংয়ের নয়াবস্তি এলাকার প্রতিবাদী যুবক সালাম মিয়াকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছে পাথরখেকোরা। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদের নির্দেশে বর্তমানে জাফলংয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। মৃত্যুর মিছিল চলছে কানাইঘাটের লোভাছড়া পাথর কোয়ারিতেও। প্রায় ৬ মাস আগে লোভাছড়ায় এক দিনে ৬ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় দেখা দিয়েছে। এবার মৌসুম দেখা দিয়েছিল অনেক আগেই। এর মধ্যে কোম্পানীগঞ্জের কালাইরাগ এলাকায় যন্ত্রদানব বোমা মেশিনের বেল্টে জড়িয়ে নির্মমভাবে এক শ্রমিক মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবার শারপিন টিলায় পাথরখেকো চক্রের অন্যতম হোতা আইয়ূব আলীর গর্তে পড়ে লিটন মিয়া নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। তারা শারপিন টিলায় দিনভর অভিযান চালিয়ে হাওরের পানি ঢুকিয়ে দিয়েছে সৃষ্টি হওয়া বিশাল গর্তে। এদিকে- গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে সিলেটের বেলা ও বিশিষ্টজনেরা জরুরি ভিত্তিতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার পৃষ্ঠা ১৭ কলাম ৪
জন্য সরকার ও রাজনৈতিক উচ্চমহলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রহণের দাবি জানান। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আক্তার স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়- গত ১৫ই জানুয়ারি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কালাইরাগ একজন ও ২০শে জানুয়ারি শাহ আরফিন টিলায় এক জন পাথর শ্রমিক নিহত হন এবং দু’জন আহত হন। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকালে শাহ আরেফিনটিলা, জাফলং, বিছনাকান্দি ও লোভাছড়া ও বাংলাটিলাতে শুধু ২০১৭ সালের ২৩শে জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৬ জন পাথর শ্রমিক নিহত এবং ২১ জন আহত হন। কিন্ত সরকারী হিসেব অনুযায়ী- নিহত ৩৫ এবং আহত ১১ জন (২০১৭ সালের ২৩শে জানুয়ারি থেকে ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত) এবং একই সময়ে বেলা কর্তৃক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবার, এলাকা ও ঘটনাস্থল ও অন্য শ্রমিকদের নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শ্রমিক মৃতের সংখ্যা ৭২ আহত ১৭ জন। বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়- গত ২১শে জানুয়ারি উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। সে সময় উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিজিবি, কোম্পানীগঞ্জ থানা ও বেলা কর্তৃক যৌথভাবে শাহ আফ্রিনটিলা এলাকা পরিদর্শন করা হয়। সার্বিক অবস্থাদৃষ্টে বলা যায়, এভাবে চলতে থাকলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শুধু টিলার অস্তিত্বই বিলীন হবে না এ ভূখণ্ডটিও হারিয়ে যাবে। সুতরাং পাথর উত্তোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শ্রমিক মৃত্যু থামানো যাবে না, রক্ষা করা যাবে না ভূখণ্ড। বিবৃতিদাতারা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন থেকে লক্ষ্য করছি যে, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকালে শ্রমিক হতাহতের সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না এবং এ কারণেই পাথর ব্যবসায়ী কর্তৃক মৃত শ্রমিকদের লাশ গুম করার মতো প্রবনতা বেড়েই চলছে। তারা এ ব্যাপারে সরকার ও রাজনৈতিক উচ্চমহলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। বেলা সিলেটের সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার ছাড়াও অন্য বিবৃতি দাতারা হলেন, সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ মাহমুদ চৌধুরী, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন, সিলেট প্রেস ক্লাব সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, ব্লাস্টের সমন্বয়ক মো. ইরফানুজ্জামান চৌধুরী, সনাক সভাপতি আজিজ আহমেদ সেলিম, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, সিলেটের সমন্বয়ক সৈয়দা শিরীন আক্তার ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম।

আপনার মতামত দিন



এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

করোনা ভাইরাসে

নতুন চিকিৎসা ১২ ঘণ্টায় সফলতা!

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

সাক্ষাৎকারে মানারাত ইউনিভার্সিটির ভিসি

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ জ্ঞান সৃষ্টি করা

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত