ডেথ সার্টিফিকেটের জন্য এক কাশ্মীরি পরিবারের লড়াই

মানবজমিন ডেস্ক

এক্সক্লুসিভ ২০ জানুয়ারি ২০২০, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:০৪

ভারতশাসিত কাশ্মীরে ২০১৮ সালের ৫ই আগস্টের বিকাল অস্বাভাবিক রকমের উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। ১৭ বছর বয়সী কিশোর ওসাইব আলতাফ মারাজি বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে বাড়ি ছেড়ে গিয়েছিল। কিশোর থেকে যুবক হওয়ার পথে থাকা ওসাইব জানতো না, খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাই তার প্রাণ কেড়ে নেবে। সে আর কখনো বাড়ি ফেরেনি। সেদিন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার অঞ্চলটির বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেয়। অবরুদ্ধ করে দেয়া হয় পুরো অঞ্চল। মোতায়েন হয় অসংখ্য সেনা।

ওসাইবের লাশ পরবর্তীতে ঝিলুম নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।
তার মা, সালিমা বানু আজও ছেলের মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি। পাঁচ মাস ধরে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছেন। তিনি বলেন, সবাই আমায় বলে সহ্য করতে। কিন্তু যে ছেলে সর্বক্ষণ আমার সামনে থাকতো, তার কথা আমি কীভাবে ভুলবো।

সালিমা সেদিনের ঘটনা স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাকে বলেছিলাম দুপুরের খাবার খেয়ে বাইরে না যেতে। কিন্তু সে জোর করে বেরিয়ে যায়। বলেছিল, দ্রুতই ফিরে আসবে।’ তখনই শেষবারের মতো নিজের ছেলেকে দেখেছিলেন সালিমা।

ওসাইবের মৃত্যু তার পরিবারকে এক নির্মম যাত্রায় যেতে বাধ্য করে। তার মৃত্যু প্রমাণ করে একটি ডেথ সার্টিফিকেট আনার জন্য রীতিমতো কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হয়। চার মাস ধরে প্রত্যাখ্যানের পর কাশ্মীর পুলিশ অবশেষে স্বীকার করে নেয় যে, কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়ার শুরুতেই মারা যায় ১৭ বছর বয়সী ওসাইব।

গত বছরের ৫ই আগস্ট সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদের মাধ্যমে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার হরণ করে নেয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে মোতায়েন হয় কয়েক লাখ সেনা। বন্ধ করে দেয়া হয় রাস্তা। মোড়ে মোড়ে স্থাপন করা হয় ভারতীয় আধা-সামরিক বাহিনীর চেকপয়েন্ট। চারদিকে তখন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। মোবাইল সেবা থেকে শুরু করে সব ধরনের যোগাযোগ সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। কাশ্মীরিরা যাতে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না পারে তাই এসব কঠোর ব্যবস্থা নেয় নয়াদিল্লি। গণতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকে অঞ্চলটিতে। আর এসবের মধ্য দিয়ে ছেলের মৃত্যুর শোক সহ্য করে যেতে হয় মারাজি পরিবারকে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য
ওসাইবের বাড়ি শ্রীনগরের উপকণ্ঠে অবস্থিত পালপোরা গ্রামে। তার বড় ভাই সুহেইল আহমেদ মারাজি ৫ই আগস্ট বাড়ি ছিলেন না। পরবর্তীতে তার ভাইয়ের সঙ্গে কী হয়েছিল সে বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য জোগাড় করেন।
ঘটনার দিন সে বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে বের হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর ভারতীয় আধা-সামরিক বাহিনী তাদের ঘিরে ধরে। সুহেইল বলেন, ওসাইবরা ১০ জন ছিল। হাঁটতে হাঁটতে তারা একটু ফুটওভার ব্রিজের ওপর পৌঁছালে সিআরপিএফ (সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স) সদস্যরা ব্রিজের উভয় দিক থেকে তাদের দিকে দৌড়ে আসে। ভয় পেয়ে তারা নদীতে লাফ দেয়।

ওসাইব সাঁতার জানতো না। সুহেইল বলেন, ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা অন্যান্য ছেলেরা আমাদের বলেছে যে, ওসাইব ব্রিজের পাশ ধরে কয়েক মুহূর্ত ঝুলে ছিল। এরপর সেনারা লাঠি দিয়ে তার মাথা ও হাতে বাড়ি দেয়। হাত ফসকে পানিতে পড়ে ওসাইব। এটা খুন ছিল।

সেদিন সালিমা বাড়িতে ঘরের কাজ করছিলেন। পাড়ার ছেলেরা দৌড়ে এসে তার ঘরের জানালায় কড়া নেড়েছিল। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, তারা বলেছিল, ওসাইব শহীদ হয়ে গেছে। আমি তার জন্য প্রত্যেক দিন অপেক্ষা করে থাকি। রাতের খাবার দেয়ার সময় তার নাম ধরে ডাকি। সে একা ঘুমাতে ভয় পেতো। এক মুহূর্তের জন্যও আমি তার মুখ ভুলতে পারি না।

ওসাইবের লাশ দাফনের জন্য পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো ডেথ সার্টিফিকেট দিতে অস্বীকৃতি জানায়। হাসপাতালের কর্মকর্তারা তার পরিবারকে বলেছিল একটি এফআইআর দায়ের করতে, যাতে ওসাইবের মৃত্যু দলিলবদ্ধ হয়। তখন থেকে শুরু হয়েছিল ডেথ সার্টিফিকেট নিশ্চিত করার কয়েক মাসব্যাপী লড়াই।

সুহেইল বলেন, হাসপাতাল থেকে আমি এক থানায় যাই, সেখান থেকে আরেক থানায়। উভয় জায়গায় আমায় বলা হয়েছিল, তারা এফআইআর দায়ের করতে পারবে না। কারণ, ঘটনাস্থল তাদের এখতিয়ারের বাইরে পড়ে। অসহায় এক পরিস্থিতিতে ছিলাম।

অপ্রাপ্ত বয়স্কদের বন্দি
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে শিশু অধিকারকর্মী ইনাক্ষী গাঙ্গুলি ও শান্তা সিনহা কাশ্মীরে শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা খতিয়ে দেখতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করে। আদালত কিশোর বিচার কমিটিকে কাশ্মীরে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের আটকে রাখার অভিযোগ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়। পুলিশ সে সময় ওই কমিটির কাছে লিখিতভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছিল যে, তারা ১৪৪ জন অপ্রাপ্ত বয়স্ককে আটকে রেখেছে। কিন্তু ওসাইবের মৃত্যুকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তার পরিবারের জন্য এটা বড় ধরনের আঘাত ছিল।

পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওসাইব আলতাফের ঘটনা ভিত্তিহীন। এমন কোনো মৃত্যুর ব্যাপারে পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। এ ছাড়া তদন্তেও এর কোনো সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
ওসাইবের পরিবার এরপর নিম্ন আদালতে এফআইএর আবেদন করে। সুহেইল মারাজি বলেন, আমরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। কারণ, তারা কীভাবে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর কথা অস্বীকার করতে পারে? তার মৃত্যু প্রমাণের জন্য আমাদের লড়াই করতে হয়েছিল। এটা আমাদের জন্য হৃদয়বিদারক ছিল। তার মৃত্যুর শোকে থেকেও প্রতি সপ্তাহে আমাদের আদালতে যেতে হয়েছিল।

গত মাসে পুলিশ অবশেষে আদালতে ওসাইবের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে আদালতে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। পারিমপুরা থানার ওই প্রতিবেদনে লেখা ছিল, গত ৫-৮-১৯ তারিখে ২৪ বছর বয়সী মৃত ওসাইব মারাজি ঝিলুম নদীতে ডুবে মরার অভিযোগ রয়েছে।

কিন্তু ওসাইবের স্কুলের রেকর্ড হিসাবে, তার বয়স ২৪ নয়, ১৭। সে এক স্থানীয় স্কুলে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছিল। সুহেইল বলেন, এখানে কেউ ন্যায়বিচার পায় না, আমরাও পাওয়ার আশা করি না। কিন্তু আমরা চাই যে, আমাদের অন্তত ডেথ সার্টিফিকেটটা দেয়া হোক। সুহেইল আরো বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দানিশ একইভাবে ২০১৬ সালে খুন হয়েছিল। তারাও ন্যায় বিচার পায়নি। পুলিশ আমাদের কাশ্মীরের সন্তানদের হত্যার নতুন উপায় পেয়েছে। তিনি জানান, তারা সার্টিফিকেটের জন্য লড়াই জারি রাখবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি আওতাধীন কাশ্মীর কর্তৃপক্ষ অঞ্চলটির স্বায়ত্তশাসন হরণের প্রাক্কালে কোনো হত্যার কথা স্বীকার করেনি। কিন্তু স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর কোয়ালিশন অব সিভিল সোসাইটি (জেকেসিসিএস) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, সশস্ত্র বাহিনীর হাতে অন্তত ছয় বেসামরিক খুন হয়েছেন। এর মধ্যে একজন হচ্ছে, ১৭ বছর বয়সী আরসার ফিরদৌস খান। তার পরিবারের দাবি, ৬ই আগস্ট বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার সময় সেনারা তার মাথায় বেশ কয়েকবার গুলি করে তাকে হত্যা করে।

আরসারের মেডিকেল রিপোর্ট অনুসারে, খুলিতে পেলেটের আঘাত থেকে তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের ভাষ্য, অন্য কারো ছোড়া এক পাথরের আঘাতে মারা গেছে আরসার। তবে কে সে পাথর ছুড়েছে তা জানায়নি পুলিশ।

ওসাইবের পরিবার তার মৃত্যু প্রমাণের চেষ্টা জারি রাখবে। কিন্তু তার মা নিজের দুঃখ ও শোক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমার ইচ্ছে করে ছেলেকে খুঁজতে নিজের হৃদয় ছিঁড়ে ফেলি। মনে হয়, আমার চোখের আলো হারিয়ে গেছে।

আপনার মতামত দিন



এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

আইসিস বধূ শামীমা এখন যেমন

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৫ রঙের ফুল এখন গাজীপুরের গবেষণা মাঠে

লিলিয়াম চাষে নতুন সম্ভাবনা

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

আরো কিছু কথা

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত