গাম্বিয়ার প্রতি নৈতিক সমর্থন ১৪ সদস্যের বাংলাদেশ দল শুনানি পর্যবেক্ষণে

কূটনৈতিক রিপোর্টার

প্রথম পাতা ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:১৬

রোহিঙ্গাদের ওপর বর্মীদের চালানো গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডস্থ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিজে) করা মামলার শুনানি পর্যবেক্ষণে ঢাকা থেকে একাধিক টিম যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত প্রায় ১৪ সদস্যের ওই সরকারি প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দিবেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক। এতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদ্য সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, মিয়ানমারে বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার এম. সুফিউর রহমান, ইরানে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত গৌসুল আজম সরকারসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক মহাপরিচালক ও পরিচালক রয়েছেন। শুনানি পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রতিনিধি দলে নাগরিক সমাজের দু’জন প্রতিনিধিও থাকছেন। এর মধ্যে একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ, অন্যজন গণহত্যা বিষয়ক গবেষক।

মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গার প্রতিনিধি হিসাবে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া তিনজন রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষও নেদারল্যান্ডস গেছেন। গতকাল সন্ধ্যায় তারা ঢাকা ছেড়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। গাম্বিয়ার ওই মামলায় ওআইসির ৫৭ রাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে। শুনানিতে গাম্বিয়ার প্রতি নৈতিক সমর্থন দেবে বাংলাদেশ।
আগামীকাল থেকে আইসিজে’র শুনানি শুরু হচ্ছে। গত ১১ই নভেম্বর ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থনে আইসিজেতে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলাটি করে। গাম্বিয়া গণহত্যা সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। আইসিজের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য মতে, নেদারল্যান্ডসের পিস প্যালেসে অবস্থিত আইসিজেতে আগামীকাল গাম্বিয়ার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মামলাটির শুনানি শুরু হবে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে ১১ই ডিসেম্বর বক্তব্য উপস্থাপন করবে বিবাদি মিয়ানমার। ১২ই ডিসেম্বর হবে যুক্তিতর্ক। প্রথমে গাম্বিয়া যুক্তি দেবে, পরে মিয়ানমার তা খন্ডনের সূযোগ পাবে। মিয়ানমারের পক্ষে আদালতের বক্তব্য এবং যুক্তি খন্ডন করবেন দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। দ্য হেগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ৩ দিনের ওই শুনানীর পুরো সময়ই আদালতের বাইরে রাখাইনে গণহত্যাসহ বর্মী নৃশংসতার প্রতিবাদে নানা কর্মসূচি পালনে সোচ্চার থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে রোহিঙ্গারা। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত রোহিঙ্গারা এ জন্য হেগে জড়ো হচ্ছে। এদিকে ওই বিচার নিয়ে বৃটেনের অনলাইন দ্য টেলিগ্রাফ একটি আগাম প্রতিবেদন করেছে।

নিকোলা স্মিথের প্রতিবেদনে বিচার প্রক্রিয়াটি মিয়ানমার কিভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তার একটি ধারণা দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সুচি নিশ্চিতভাবেই অত্যাচারি সেনাদের পক্ষ নেবেন তার রাজনীতি বাঁচানোর জন্য। প্রতিবেদনে এর প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে- মিয়ানমারের বেসামরিক নেত্রী অং সান সুচিকে একদা মানবাধিকারের ‘হিরোইন’ আখ্যা দিয়েছিল পশ্চিমারা। রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে। তাদের পক্ষেই সাফাই গাইতে সুচি এখন নেদারল্যান্ডসের পথে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলাকে দেখা হয় আন্তর্জাতিক সবচেয়ে উঁচু মাত্রার একটি আইনিগত মামলার অন্যতম হিসেবে। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে জাতিনিধনের উদ্দেশে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নৃশংসতা শুরু করে।

এর ফলে কমপক্ষে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হন। তারা এখন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। সেনাবাহিনীর নৃশংসতার ফলে উঠে আসা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মিয়ানমার। মঙ্গলবার নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে অভিযোগের প্রথম শুনানি হবে। সেখানে নিজের দেশের নবীন গণতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন ব্যক্তিগতভাবে সুচি। ওই শুনানিতে তিনি ‘জাতীয় স্বার্থের পক্ষ’ অবলম্বন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এটা করার মাধ্যমে তিনি সেই সেনাবাহিনীর পক্ষ অবলম্বন করবেন, যারা তাকে এক সময় ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্য বছরে পর বছর গৃহবন্দি করে রেখেছিল। উদ্বেগকে একপাশে সরিয়ে রাখার যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন তাতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংসতাকে সমর্থন দেয়া হয়। এতে আন্তর্জাতিকভাবে তার সুনাম বর্তমানে যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার চেয়ে আরো বেশি কলঙ্কিত হবে।

বিচারে কি হতে পারে: মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা গাম্বিয়ার মামলার বিচার কবে শেষ হবে তা একান্তই আদালতের ওপর নির্ভর করছে। তবে বাদি গাম্বিয়া চাইছে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা চেয়ে আদালতের একটি অন্তবর্তী আদেশ। যার মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যাসহ সব ধরনের নিপীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেয়া। তাদের বাড়িঘর ও সম্পদ ধ্বংস বন্ধ রাখার পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার ওপর হুমকি বন্ধ করা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, সামারিক, আধাসামরিক বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গণহত্যা থেকে নিবৃত্ত রাখতে কড়া নির্দেশনা এবং গণহত্যার আলামত নষ্ট না করার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া। রোহিঙ্গা সঙ্কটের ভিকটিম হিসাবে ঢাকাও আশা করছে হয়ত আদালত একটি অন্তবর্তী নির্দেশনা দিবেন। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় গণহত্যার অভিযোগে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সালের ২০ মার্চ মামলা হয়েছিল। আর আইসিজে ওই বছরের ৮ এপ্রিল যুগোস্লাভ সরকারকে বসনিয়ার মুসলমানদের সুরক্ষায় বাড়তি পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই প্রসঙ্গ টেনে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গাম্বিয়ার মামলায় মিয়ানমারকে কয়েক মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে আইসিজে।

আদালতের নির্দেশনা মানার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাছাড়া রায় না মানলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তখন ব্যবস্থা নিতে পারবে। কারণ, মিয়ানমার ১৯৫৬ সালে জাতিসংঘের গণহত্যা সনদে সই করেছে। এই সনদে স্বাক্ষরকারী কোনো দেশ আইসিজের নির্দেশনা অমান্য করে চলতে পারে না। ঢাকা ও হেগের কূটনীতিকরা বলছেন, আদালতের তরফে অন্তবর্তী কোন নির্দেশনা এলে মিয়ানমার বড় ধরনের চাপে পড়বে এটা নিশ্চিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ সালের দ্বিতীয়ার্ধে মিয়ানমারে নির্বাচন রয়েছে। ওই নির্বাচনে নিজের ও দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দেশ ও সরকারের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করা ছাড়া সু চির সামনে কোনো পথ নেই। ওই নির্বাচনে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং লায়েংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা। রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছে জেনারেল লায়েংয়ের নির্দেশে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমের শক্তিগুলো তাঁর ওপর ভ্রমণসহ বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

উভয় পক্ষেই প্রস্তুতি: বৃটেনের অনলাইন দ্য টেলিগ্রাফ এর প্রতিবেদন মতে, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়াকে মামলায় সমর্থন দিচ্ছে ৫৭ জাতির সংগঠন ওআইসি। মামলায় গণহত্যা, ধর্ষণ সহ জাতিনিধনের অভিযোগ আনা হয়েছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। গাম্বিয়ার পক্ষে মামলা লড়বেন বৃটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত আইনমন্ত্রী আবুবাকর তামবাদোউ। তিনি ১৯৯৪ সালে রোয়ান্ডায় গণহত্যার মামলায় এক দশকের বেশি সময় লড়াই করেছেন। বাংলাদেশের কক্সবাজারে গাদাগাদি করে অবস্থান করা শরণার্থীর শিবির পরিদর্শন করে, সেখানকার মানুষদের ধর্ষণ, হত্যা ও শিশুদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বর্ণনা শুনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করতে ব্যক্তিগত এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ওআইসির সমর্থন চেয়েছিলেন তামবাদোউ । গাম্বিয়ার রাজধানী বানজুলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, এসব কাহিনীর মধ্যে আমি গণহত্যা দেখতে পেয়েছি।

গাম্বিয়ার এই মন্ত্রীর পরিকল্পনায় রয়েছে যে, তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধে বিচারকরা যেন মিয়ানমারের প্রতি নির্দেশ দেন এবং আদালতকে অনুরোধ করবেন প্রমাণ সংরক্ষণ করতে, যা গণকত্যার মামলায় পরে সহায়ক হবে। মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সময় গাম্বিয়ার সাবেক স্বৈরাচারের অধীনে বসবাসের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরার কথা তার। ওদিকে ওই শুনানিতে যে বা যারা উপস্থিত হতে চান তাদের জন্য হলিডে প্যাকেজে ডিসকাউন্ট দিচ্ছে মিয়ানমারের পর্যটন বিষয়ক কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসে অবস্থানরত মিয়ানমারের নাগরিকরা তাদেরকে আবাসিক সুবিধা ও যৌক্তিক সমর্থন দেয়ার প্রস্তাব করেছে। এমন একটি কোম্পানির ভিসা সেবা দেয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ড জুলাই বলেছেন, যতটা সম্ভব সস্তায় টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করছেন তারা। মিয়ানমারে সুচিকে ডাকা হয় মাদার সু নামে। সেই ডাকনাম উল্লেখ করে তিনি মিয়ানমার টাইমসকে বলেছেন, এটাই হলো মাদার সু’কে সমর্থন প্রদর্শনের উপায়।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

মানবতার জয় (ভিডিও)

২৪ জানুয়ারি ২০২০

৪ শিক্ষার্থীকে নির্যাতন

ক্যাম্পাসে দফায় দফায় বিক্ষোভ

২৪ জানুয়ারি ২০২০

টিআই’র রিপোর্ট

বাংলাদেশে দুর্নীতি কমেনি, অবস্থানের পরিবর্তন

২৪ জানুয়ারি ২০২০

ই-পাসপোর্ট যুগে বাংলাদেশ

২৩ জানুয়ারি ২০২০





প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত