তুরিনকাণ্ডে আইনের আপন গতির কী হবে

স্টাফ রিপোর্টার

শেষের পাতা ২২ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:০১

তুরিন আফরোজের পতন। আজ তিনি সরকারি মহলেই একটি বিস্ময়, একটি বিতর্ক। তবে নিরপেক্ষ মহলে প্রশ্ন উঠেছে, আইনের আপন গতির কী হবে। আইন ও বিচারমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। সেকারণে তাকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হলে দেশের প্রচলিত আইন কী বলে? খবর বেরিয়েছিল, তুরিন বলেছেন, তিনি মুখ খুললে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অনেক কিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এনটিভি অনলাইনে প্রকাশিত তুরিন আফরোজের এ বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে গত সোমবার তিনি বলেন, ‘আমি এ রকম করে কথা বলিনি। বলেছি, আমি এখন প্রেস কনফারেন্স করবো নাকি? যুদ্ধ করবো নাকি? আমি কি মুখ খুলবো? মুখ খুললে তো অনেক কথা বলা যাবে।
এটা বলেছি।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনি প্রসিকিউটর। আইনের অধ্যাপক। তিনি মুখ না খুললে কি? তার অনেক কথাই তো মানুষ শুনতে চাইবে। যা বলবেন, তাতেই তার স্বাধীনতা আছে। তার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার সংবিধান স্বীকৃত। তুরিন অভিযোগ করেছেন, তিনি ন্যায়বিচার পাননি। সেজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তার তো বিচার চাইছেন, সংশ্লিষ্টরা। ঠিক তার নয়, তার অপরাধের বিচার।

তুরিনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে। এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্য হলো, ‘তুরিন আফরোজকে অব্যাহতি দেয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। যে সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে, সেগুলো কিন্তু অল আর ডকুমেন্টরি। এজন্য আমরা সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অব্যাহতি দিয়েছি।’
তুরিন সমর্থকরা আশা করছেন, তুরিন দ্রুত ওই সাক্ষ্যপ্রমাণের বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে কথা বলবেন। দলিলপত্র যদি বেঠিক হয়, তাহলেও কথা বলবেন। অনেকেই এ প্রসঙ্গে স্মরণ করছেন যে, স্কাইপ কথোপকথন ফাঁসের ঘটনায় শুধু একটি রদবদল ঘটেছিল। সেই ঘটনা আদালতে গড়ায়নি। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অসদাচরণের কঠিন অভিযোগ আনা হলো। তিনি বিদায় নিলেন। কিন্তু ঘটনা আর এগুলো না। থমকে গেল।
২০১৬ সালে পেশাগত অসদাচরণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলীকে প্রসিকিউশন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। তার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।

তুরিন আফরোজ রাতারাতি তারকা হয়েছিলেন। এবং রাতারাতি তিনি খসে পড়লেন। আইনের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। হঠাৎ হলেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর। সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির থিওরিকে জনপ্রিয় করেছিলেন তুরিন।
ড. তুরিন আফরোজ দ্রুত টিভি পর্দার প্রিয় মুখ হয়ে উঠলেন। এরপর বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই খবর রটলো তিনি আসামির সঙ্গে কথা বলেছেন। এমনকি এক অবিশ্বাস্য পারিবারিক বিরোধে জড়ালেন। যেখানে তার গর্ভধারিণী মা হলেন তার প্রতিপক্ষ। মা প্রকাশ্যে মুখ খুললেন মেয়ের বিরুদ্ধে। মা’কে তিনি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। অভিযোগের তীর হলো এতটাই তীক্ষ্ণ।
উল্লেখ্য যে, এনএসআই ও পাসপোর্টের সাবেক ডিজি মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ মামলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ। গোলাম আযমের মামলায়ও প্রসিকিউটর ছিলেন তিনি।
গত বছর এপ্রিলে অভিযোগ ওঠে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওয়াহিদুল হককে ফোন করে কথা বলেন তুরিন। পরে পরিচয় গোপন করে ঢাকার একটি হোটেলে তার সঙ্গে দেখাও করেন। এবং বলেন, তার বিরুদ্ধে পরিচালিত মামলার মেরিট নেই।

আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনমন্ত্রী তুরিনের কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধ কি না সেটা নাকচ করেননি। জানতে চাইলে আইনমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘আমি তো এ রকম কথা বলতে পারব না, আমার এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য নেই।’ কিন্তু আইনমন্ত্রী ও তুরিন সবাই জানেন, আইনের একটি আপন গতি আছে। সেটা তার নিয়োগ বাতিলের মধ্য দিয়ে থেমে গেলে আইনের চোখে সমতার নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম অবশ্য জানান, পেশাগত অসদাচরণের দায়ে তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবে সরকার। তার জানামতে বিশ্বের ট্রাইব্যুনালগুলোর মধ্যে এই প্রথম কোনো প্রসিকিউটরকে অপসারণ করা হলো। তার কৃতকর্মের জন্য ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে বলেও তার দাবি।





আপনার মতামত দিন

শেষের পাতা -এর সর্বাধিক পঠিত



কড়া নিরাপত্তা, এজলাসে সিসি ক্যামেরা

খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি কাল

বিএনপি’র গোলটেবিল বৈঠকে তথ্য

ভিন্নমতের কারণে ১০ বছরে নিহত ১৫২৫, গুম ৭৮১