পিএসসি’র নিয়োগ পরীক্ষায় এ কেমন জালিয়াতি

রোকনুজ্জামান পিয়াস

শেষের পাতা ২১ নভেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৩৫

সরকারি হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় নজিরবিহীন জালিয়াতির অভিযোগ ওঠেছে সরকারি কালাচাঁদপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে। খোদ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ড. মো. আরিফুর রহমান এ ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৬ই সেপ্টেম্বর পিএসসি’র অধীনে এ নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় কক্ষ পরিদর্শকের তালিকায় নাম থাকা কয়েকজন ওইদিন কোন দায়িত্বই পালন করেননি। তাদের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে পিএসসি থেকে টাকাও তুলে নেয়া হয়েছে। এমনকি গুলশান মডেল স্কুল এন্ড কলেজের তিন সহকারী শিক্ষকের পরিদর্শকের দায়িত্ব পালনের কথা বলা হলেও প্রতিষ্ঠানটিতে ওই নামে কোন শিক্ষকই নেই।

এছাড়া কালাচাঁদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক দায়িত্ব পালন না করলেও তাদের নাম তালিকাভূক্ত করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি কালাচাঁদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রের নির্ধারিত ওই কক্ষে সেদিন কোন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করেননি।
তার পরিবর্তে কক্ষে ছিলেন বেশ কয়েকজন বহিরাগত, যারা পরীক্ষার্থীদের উত্তর প্রদানে সাহায্য করেছেন। জানা গেছে, ওই কক্ষের পরীক্ষার্থী ছিলেন সরকারি কালাচাঁদপুর স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. আরিফুর রহমানের এলাকা বরিশালের। তাদের অনৈতিক সুবিধা দিতেই পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা বহিরাগত লোকজনকে দিয়ে এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। অনুসন্ধানে ‘ভূয়া’ এমন ৮ জন কক্ষ পরিদর্শকের (প্রত্যবেক্ষক) পরিচয় পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, গত ৬ই সেপ্টেম্বর সরকারি কালাচাঁদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজ উপকেন্দ্র-১৪ তে বরিশাল বিভাগের সরকারি হাই স্কুলের বাংলা বিষয়ের সহকারী শিক্ষকদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ড. মো. আরিফুর রহমানের বাড়ি বরিশাল জেলায়। তিনি ও সহকারী প্রধান শিক্ষক এমএ রশীদ মিঞাঁ মিলে পরীক্ষা কমিটির অন্যান্য সদস্যদের প্রভাবিত করে এই অনিয়ম ও জালিয়াতি করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই নিয়োগ পরীক্ষার পরিদর্শক তালিকার ৪৭, ৪৮ এবং ৪৯ নম্বরে গুলশান মডেল কলেজের তিনজন শিক্ষকের নাম রয়েছে। তারা হলেন, মো. হাসান আলী, সাথী আক্তার এবং আনোয়ার ইসলাম। পিএসসিতে কক্ষ পরিদর্শকের যে বিল জমা দেয়া হয়েছে, সেই তালিকার ৫১, ৫২ ও ৫৩ নম্বরেও এই তিনজনের নাম রয়েছে। যারা প্রকৃতপক্ষে গুলশান মডেল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক নন। এ ব্যাপারে গুলশান মডেল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তফা জামান বলেন, এই নামে তার প্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষক নেই। আর কোন শিক্ষক যদি অন্য কোথাও দায়িত্ব পালন করতে যান, সেক্ষেত্রে মৌখিকভাবে অথবা লিখিতভাবে জানিয়ে যেতে হয়। তিনি বলেন, এমন কেউ আমাকে জানান নি। সরকারি কালাচাঁদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রের পক্ষ থেকেও শিক্ষক চেয়ে চিঠি দেয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, তাছাড়া ওইদিন একই পরীক্ষা আমার এখানেও ছিলো। স্বাভাবিকভাবে আমার শিক্ষকরা আমার প্রতিষ্ঠানেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

কক্ষ পরিদর্শকের তালিকার ৪৬ নম্বরে রয়েছে সরকারি কালাচাঁদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক নুরুন্নাহার বেগমের নাম। যিনি বর্তমানে বিএড প্রশিক্ষণের জন্য এক বছরের শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন। তিনিও ওইদিন দায়িত্ব পালন করেননি। পিএসসিতে কক্ষ পর্যবেক্ষকদের যে বিল জমা দেয়া হয়েছে, তার ৫৫, ৫৬, ৫৮ এবং ৫৯ নম্বরে রয়েছেন সরকারি কালাচাঁদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজের সংযুক্ত প্রাথমিক শাখার খন্ডকালীন শিক্ষক মো. আরিফ হোসেন, অপর্ণা সেন, জুহিন সুলতানা এবং সুব্রত কুমার ঘোষের নাম। তারাও ওইদিন নিয়োগ পরীক্ষায় কক্ষ পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি। মো. আরিফ হোসেন আগেই এ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি জানান, আমি গত জুন মাসে ওই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে এসেছি। সেই হিসাবে ওইদিন আমার দায়িত্ব পালন করার কোন সুযোগ নেই। বিএড প্রশিক্ষণার্থী অপর্ণা সেনের নিজেরই পরীক্ষা ছিলো ৬ই সেপ্টেম্বর। সে হিসেবে ওইদিন দায়িত্ব পালনের কোন সুযোগ নেই তারও। একইভাবে দায়িত্ব পালন করেননি জুহিন সুলতানা। তিনি বলেন, ওই পরীক্ষায় আমাকে দায়িত্ব পালন করতে বলেনি। সে হিসাবে ওইদিন আমি স্কুল প্রাঙ্গণেই যাইনি। তবে কিভাবে তার নাম পরিদর্শকের তালিকায় ওঠেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমার জানা নেই। কর্তৃপক্ষ করেছে। আর স্বাক্ষরের ব্যাপারে বলেন, আমার স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে। এটাও একটা জালিয়াতি। সুব্রত কুমার ঘোষ বলেন, তালিকায় নাম থাকলেও ওইদিন আমি কোন ডিউটি করিনি।

অভিযোগ রয়েছে, অধ্যক্ষ ড. আরিফুর রহমান মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে তার সঙ্গে যোগাযোগকারী পরীক্ষার্থীদের সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে কক্ষ পরিদর্শক হিসেবে তাদের সবার নাম ব্যবহার করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তারা কেউ সেদিনের পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করেননি। সূত্র জানায়, ড. আরিফুর রহমান সেদিন প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে লোকজন এনে পরীক্ষার নির্ধারিত ওই কক্ষের দায়িত্ব দেন।  এ বিষয়ে সরকারি কালাচাঁদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. আরিফুর রহমান বলেন, এটা পিএসসির পরীক্ষা। অভিযোগের বিস্তারিত না শুনেই তিনি বলেন, এ ব্যাপারে পিএসসিতে কথা বলেন। এছাড়া আর কোন কথা বলতে চাননি তিনি।



আপনার মতামত দিন

শেষের পাতা -এর সর্বাধিক পঠিত



কড়া নিরাপত্তা, এজলাসে সিসি ক্যামেরা

খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি কাল