রোহিঙ্গা ইস্যুতে আইসিসি’র রায় সব দেশ মানতে বাধ্য: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

কূটনৈতিক রিপোর্টার

অনলাইন ১৮ নভেম্বর ২০১৯, সোমবার, ৪:২১

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি বলেছেন, মিয়ানমার আইসিসি (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত) বা আইসিজে’র সদস্য না হলেও বিচারে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অং সান সু চিসহ ঊর্ধ্বতন ২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রায় হলে তা বিশ্বের সব দেশ মানতে বাধ্য হবে। তারা অন্য দেশে গেলে তাদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হবে। আজ দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত।

অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) নির্দেশ হওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমার ছাড়াও অনেক দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বের অনেক দেশে নিজেদের মধ্যেই দ্বন্দ্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতাকে বড় করে দেখেছেন তাই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হতেই হবে।
তবে রাতারাতি এ সংকটের সমাধান হবে না। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী অং সান সু চিকে বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হলে এ অঞ্চল অস্থিতিশীল হবে। এটা বিরাট ম্যাসেজ।

গোলটেবিল বৈঠকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ্ কামাল বলেন, একদিনে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হবে না। প্রতি বছর ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্মাচ্ছে। ৩০ হাজার নারী গর্ভবতী। এটি বাড়তে থাকলে কী হবে? রোহিঙ্গাদের শুধু মিয়ানমার নয়, অন্য দেশে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে সচিব বলেন, প্রতিটি দেশ ৯ হাজার করে রোহিঙ্গা নিলে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা তো এমন কোনো লক্ষণ দেখছি না।

আলোচনায় সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, মিয়ানমারকে আমরা মোটেই চিনি না, তারা খুব কঠিন প্রকৃতির। তাদের ওপর এ ধরনের চাপ কোনো কাজেই লাগবে না। আমরা একটি ভিকটিম রাষ্ট্র হিসাবেও নিজেদের জানাতে পারছি না। আমরা তাদের ওপর চাপ তো দূরে থাক, পঁচা পিয়াজ কিনতে মিয়ানমারে দৌড়াচ্ছি। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট প্রচারে রোহিঙ্গাদের ভয়েস সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য রোহিঙ্গাদের সরাসরি যুক্ত করতে হবে। রোহিঙ্গারা বললে বিশ্বে যতটা নাড়া দেবে ততটা বাংলাদেশ বললে হবে না।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, আইসিসি তদন্ত করার অনুমতি দিয়েছে। মিয়ানমার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। রাশিয়া ও চীন মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন একটি বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। চীন তার স্বার্থ যতদিন দেখবে ততদিন পর্যন্ত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য অপেক্ষাই করতে হবে। ভারতের কিছু রাজনীতিক আমাকে বলেছেন—ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা সার্বভৌমত্বকেও ছাড় দেয়, যা বাংলাদেশের সঙ্গে হয়ে ওঠেনি। তার পরামর্শ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ায় এখন যে করেই হোক রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা উচিত।
সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে জবাবদিহিতায় আনার বিষয়ে গাম্বিয়া আইসিসিতে মামলা করেছে। আর্জেন্টিনার কিছু মানবাধিকার কর্মী অং সান সু চির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অন্যদিকে যতক্ষণ পর্যন্ত চীনকে আমরা আমাদের পক্ষে আনতে না পারব ততক্ষণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কঠিন হবে।

অনুষ্ঠানে আলোচক মেজর (অব.) এমদাদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত এ তিন দেশই মিয়ানমারের সঙ্গে বেশ কিছু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত। চীন সবসময় জাতিসংঘে মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হলে এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের উত্থান হবে।

বৈঠকে উখিয়ার চেয়ারম্যান নূরুল হক বলেন, এবারের মতো এত বড় রোহিঙ্গা সংকট আগে মোকাবিলা করতে হয়নি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, পরিবেশগত সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে রোহিঙ্গা নামে একটি ‘টাইম বোমা’ রাখা হয়েছে। তা বিস্ফোরণ হলে গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। চীন ও ভারত না চাইলে এ সংকটের সমাধান হবে না।

অভিবাসী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, ঢালাওভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থা বলে সবাইকে এক করে ফেলা ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে যারা অর্থনৈতিক সহায়তা করে থাকে তারা যতটা মানবিক কারণে করে থাকে ততটা রাজনৈতিক বিষয়ে শীতলতা দেখায়।
 




আপনার মতামত দিন

অনলাইন -এর সর্বাধিক পঠিত