পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে দুর্গতি

দেশ বিদেশ

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে | ৯ নভেম্বর ২০১৯, শনিবার
ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়সহ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কথা বলে না চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। যা বলে তা অনুমান নির্ভর ও ধার করা। এরমধ্যে ভূমিকম্পের তথ্য সংগ্রহ করতে হয় ঢাকা থেকে। ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য নিতে হয় আগরতলা থেকে। এছাড়া বাতাসের চাপ, বায়ুর তাপ, বাতাসের দিক, বাতাসের গতি, বৃষ্টি পরিমাপসহ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নির্ণয় হয় অনুমান থেকে। এসব নির্ণয়ের জন্য চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসে অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন সিস্টেম যে যন্ত্রটি রয়েছে সেটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো।

শুধু তাই নয়, বিমান চলাচলের জন্য উর্ধ্ব আকাশের বায়ুমণ্ডলের অবস্থার ম্যাপটিও ফ্রি সাইট থেকে নামিয়ে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে দেয় আবহাওয়া অফিস। দুর্গতির শেষ এখানেই নয়, প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর জাতীয় পূর্বাভাস কেন্দ্রে আবহাওয়ার যে উপাত্ত পাঠানো হয়, সে ব্যাপারেও চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের ভরসা মান্ধাতার আমলের ফ্যাক্স।
তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ হয় যেভাবে: সমুদ্রে সৃষ্ট বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় কতটুকু দুরত্বে রয়েছে এবং তার পূর্বাভাস জানার জন্য পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে কোনো রাডার নেই।
ফলে, তাৎক্ষণিক আবহাওয়ার চিত্রের জন্য চোখ রাখতে হয় জাপান ও ভারতের স্যাটেলাইটের দিকে। অথচ বাংলাদেশের কয়েকটি দুর্যোগপূর্ণ অঞ্চলের একটি চট্টগ্রাম।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ঢাকা, খেপুপাড়া, কক্সবাজার, রংপুর ও মৌলভীবাজারে সর্বমোট ৫টি রাডার রয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের। কিন্তু সমুদ্রের নিকটবর্তি পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে কোনো রাডার নেই। অন্যদিকে, ভূমিকমেপর মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানলেও তার মাত্রা নির্ণয় করতে পারে না আবহাওয়া অফিসের ভূমিকমপ বিষয়ক কার্যালয়।

সূত্র জানায়, ভূমিকম্প মাপার জন্য পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে রিক্টার স্কেল থাকলেও তার রিসিভার স্থাপন করা হয়েছে ঢাকা আবহাওয়া অফিসে। এ জন্য ভূমিকম্প হলেই তার মাত্রা পরিমাপের তথ্য জানতে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হয় ঢাকা আবহাওয়া অফিসের সাথে।বিমান উঠা-নামা এবং চলাচলের রুট নির্ধারণ করে আবহাওয়া বার্তা। এ জন্য প্রতিটি বিমান বন্দরের অভ্যন্তরে থাকে একটি করে আবহাওয়া অফিস। তাই চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরেই পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। বিমান উঠা-নামার জন্য বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট দেয়ার পাশাপাশি স্থানীয় আবহাওয়ারও উপাত্ত নেয় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। কিন্তু পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস এই গুরুদায়িত্ব পালন করছে মান্ধাতার আমলের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, প্রযুক্তির অভাবে আন্তর্জাতিক ফ্রি সাইট থেকে ম্যাপ নিয়ে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে দিচ্ছে তারা।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে গিয়ে দেখা যায়, বাতাসের চাপ, বায়ুর তাপ, বাতাসের দিক, বাতাসের গতি, বৃষ্টি পরিমাপসহ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ম তাপমাত্রা নির্ণয় করতে যুগ যুগ ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে একই প্রযুক্তি। বাতাসের চাপ নির্ণয় করার জন্য ব্যবহার হচ্ছে মান্ধাতার আমলের ব্যারোমিটার ও রেকর্ডের জন্য ব্যারোগ্রাফ।
একইভাবে বায়ুর তাপ নির্ণয়ের জন্য থার্মোমিটার ও থার্মোগ্রাফ, বাতাসের গতি নির্ণয়ের জন্য এনোমো মিটার ও এনোমো গ্রাফ, বাতাসের দিক, বৃষ্টি পরিমাপসহ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপ মাপার জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে তা সবই মান্ধাতা আমলের।
এমনকি প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর জাতীয় পূর্বাভাস কেন্দ্রে আবহাওয়ার যে উপাত্ত পাঠানো হয় তাও আদান প্রদান হয় এনালগ সিস্টেম ফ্যাক্সের মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক ফ্রি সাইট থেকে বিমান উঠানামার তথ্য: সূত্র জানায়, বিমান উঠা-নামা করতে মাটিতে ও উর্ধ্ব আকাশে বায়ুর চাপ সমপর্কে জানতে হয় পাইলটকে। বায়ুর চাপ ও গতির ওপর নির্ভর করে যাতায়াত রুট। এজন্য বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত আবহাওয়া রিপোর্ট দিতে হয়। তবে আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে আবহাওয়ার সঠিক উপাত্ত প্রেরণে ব্যর্থ পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। তাই উর্ধ্ব আকাশে বায়ুর চাপ ও রুটম্যাপ জানতে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে ভরসা করতে হয় আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (আইকা) ও বিভিন্ন ফ্রি সাইটের ওপর।

জরাজীর্ণ ভবন: সরজমিনে দেখা যায়, জরাজীর্ণ দুইতলা একটি ভবনে চলছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কার্যক্রম। ভবনটির চারপাশ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তরা। ফলে, অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ভবনটির ভেতরে কাজ করছে আবহাওয়াবিদ ও কর্মচারীরা। এ সমপর্কে জানতে চাইলে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, শুধু আবহাওয়া অফিস নয়, কোয়ার্টারগুলোও জরাজীর্ণ। ভবনটি মেরামতের জন্য গণপূর্ত দপ্তর কাজ করার কথা থাকলেও কোনো এক কারণে আর কাজ শুরু হয়নি।
সব শেষে আবহাওয়া অধিদপ্তরের কার্যক্রমকে আরো উন্নত করতে জাতীয় বাজেটে এ খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধও করেন তিনি।

আমিই ঝাড়ুদার, আমিই কর্মকর্তা: পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে কর্মরত আবহাওয়াবিদ এস. কে ফরিদ আহমেদ বলেন, পুরো অফিসে যত পদ আছে তত কর্মী নেই। এখানে আমিই ঝাড়ুদার, আমিই কর্মকর্তা। বেশ কয়েক বছর ধরে নিয়োগ না হওয়ায় এখানে যে কয়েকজন কর্মকর্তা কাজ করেন তাদের সবাইকেই আমার মতো ঝাড়ু দিতে হয়।
জনবল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের আবহাওয়া অফিসগুলোতে সব মিলিয়ে দেড়শতাধিক পদ থাকলেও কর্মী আছে ৬০ জন। নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় এ জনবল সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

এস. কে ফরিদ আহমেদ আরো বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেতে আমরা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছি তার সবগুলোই পুরনো। যুগ যুগ ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে যন্ত্রগুলো। উন্নত বিশ্বের আবহাওয়া অফিসগুলো যখন ব্যবহার করছে আধুনিক প্রযুক্তি তখন আমাদের ভরসা সেই এনালগ সিস্টেম।
কেউ যদি আমাদের ফোন দিয়ে জানতে চায়- যে আজ কত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, তখন দৌড়ে গিয়ে বৃষ্টি পরিমাপ যন্ত্রে স্কেল ঢুকিয়ে তার গাণিতিক হিসাব করে বের করতে হয় বৃষ্টিপাতের পরিমাপ। যদি আধুনিক যন্ত্র থাকতো তাহলে কমিপউটার মনিটরে তাকিয়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বলে দিতে পারতাম।
শুধু বৃষ্টিপাত নয়-বাতাসের চাপ, বায়ুর তাপ, বাতাসের দিক, বাতাসের গতিসহ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নির্ণয় করতেও আমরা যুগ যুগ ধরে ব্যবহার করে আসছি একই যন্ত্র। এ যন্ত্রগুলো আরো আধুনিক হলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস নির্ণয় আরো দ্রুত ও সঠিক হতো।

উপ-পরিচালকের বক্তব্য : চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, বাতাসের চাপ, বায়ুর তাপ, বাতাসের দিক, বাতাসের গতি, বৃষ্টি পরিমাপসহ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ম তাপমাত্রা নির্ণয় করতে আমরা যে যন্ত্রগুলো ব্যবহার করি সেগুলো পুরনো হলেও কার্যকরি এবং নিখুঁত তথ্য দেয়। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে আবহাওয়া উপাত্তগুলো তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যেত। ধীরে ধীরে সব আধুনিক হবে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ইরাক-আফগানিস্তানে যুদ্ধাপরাধ ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ বৃটিশ সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে

চার দিনের সফরে দুবাই পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

চৌদ্দগ্রামে স্কুলছাত্রীকে অপহরণের পর ধর্ষণ, বখাটে গ্রেপ্তার

প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষা শুরু, পরীক্ষায় বসছে ২৯ লাখ শিক্ষার্থী

কঠিন লড়াইয়ে গোটাবাইয়া-প্রেমাদাসা, দিনশেষে ঘোষণা হবে বিজয়ীর নাম

শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে স্কুল মাঠে আওয়ামী লীগের সম্মেলন

‘এটা খুব ইতিবাচক দিক’

পেট্রোলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ, ইরানে নিহত ২

পিয়াজ বোমায় কাবু দেশ

পিয়াজ বিমানে উঠে গেছে, আর চিন্তা নেই

ক্যাসিনো কাণ্ড: দু’মাসে ৫০ অভিযান, এরপর কি?

এবার চালবাজি

বিয়েতে পিয়াজ উপহার

শ্রমিক নিয়োগে সিঙ্গাপুর মডেল

অতি মুনাফার পিয়াজ এবার ময়লার ভাগাড়ে

চুয়াডাঙ্গায় পিয়াজের বাজারে অভিযান অবরুদ্ধ ম্যাজিস্ট্রেট