নতুন ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে পার্লামেন্টে কঠিন লড়াইয়ের মুখে জনসন

বিশ্বজমিন

জাহিদুর রহমান | ১৯ অক্টোবর ২০১৯, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:০৯
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বৃটেনের বিচ্ছেদ বা ব্রেক্সিট নিয়ে নতুন চুক্তিতে পৌঁছেছে দুই পক্ষ। বৃহসপতিবার বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট জিন-ক্লদ জাংকার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে কেবল দুই পক্ষের আলোচনাকারীরা সম্মত হওয়া মানে চুক্তি নিশ্চিত হওয়া নয়। উভয় পক্ষের পার্লামেন্টে পাস হতে হবে খসড়া চুক্তিটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইইউ’র তুলনায় এক্ষেত্রে বেশি বাধার সম্মুখীন হবেন জনসন।

ইতিমধ্যে চুক্তিটির বিরোধিতা করেছেন অনেকে। প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি জানিয়েছে, তারা পার্লামেন্টে চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অনেকে ব্রেক্সিট নিয়ে ফের গণভোট আয়োজনের কথাও তুলেছেন।
যাতে ব্রেক্সিটই বাতিল হয়ে যায়। এতে জটিলতা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট থেকেই এ সংকটের শুরু। এর পরবর্তী তিন বছর বৃটেনের সামপ্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে ব্রেক্সিট নিয়ে। দুইজন প্রধানমন্ত্রী সহ অসংখ্য মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন ও বরখাস্ত হয়েছেন। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দল।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘ইউরোপিয়ান স্টাডিজ’ বিষয়ক অধ্যাপক গার্টন এশ নিউ ইয়র্ক টাইমসকে এ বিষয়ে বলেন, যদি পার্লামেন্টে চুক্তিটি পাস হয় তাহলে সেখান থেকেই এই সংকট সমাধানের যাত্রা শুরু হবে। যদি তেমনটা না হয়, সেক্ষেত্রে পার্লামেন্ট নতুন কোনো উপায় বের করবে। এটা কেবল একটা শাখা, রাস্তা এখানেই শেষ নয়।
জনসন নতুন চুক্তির ঘোষণা দেয়ার পরপরই রাজনৈতিক সমালোচনার শিকার হয়েছেন। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের প্রভাবশালী দল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি (ডিইউপি) চুক্তিটি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বলেছে, এই চুক্তির আওতায় বৃটেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড। এতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।  

চুক্তিটি নিয়ে ডিইউপির অসন্তোষ প্রকাশ জনসনের জন্য খারাপ সংবাদ। পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই তার নেতৃত্বাধীন সরকারের। বিলটি পার্লামেন্টে পাস করানোর জন্য ডিইউপি’র সমর্থন আবশ্যক। এমতাবস্থায় শনিবার পার্লামেন্টে বিশেষ অধিবেশন ডেকেছেন জনসন। প্রায় ৩৭ বছর পর দেশটিতে এরকম অধিবেশন বসছে। বিগত ৮০ বছরে এমন অধিবেশন বসেছে মাত্র চারটি। এদিন ব্রেক্সিট নিয়ে বৃটেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।

লন্ডনের কিংস কলেজের ইউরোপ  বিষয়ক অধ্যাপক আনন্দ মেনন বলেন, এটা বরিস জনসনের জন্য সবচেয়ে সংকটাপন্ন সময়। তিনি চুক্তির জন্য সমালোচিত, একইসঙ্গে ব্রেক্সিট সমপন্ন না হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টির জন্যও সমালোচিত।

নতুন চুক্তির আওতায়, ব্রেক্সিট শেষে আইনিভাবে বৃটেনের অংশ হিসেবেই থাকবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড। তবে ইইউ’র অংশ আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে স্থলসীমান্ত থাকায় পুরো বৃটেনে কেবল নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড পুরোপুরি ইইউ’র কাস্টমস ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আসবে না। বৃটেনের বাকি অংশের সঙ্গে ইইউ’র সীমান্তে নতুন কাস্টমস আইন প্রয়োগ হলেও, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার কাস্টমস আইন আগের মতোই থাকবে। বৃটেনের বাকি অংশের সঙ্গে ইইউ’র বাণিজ্য, অর্থনীতি ও অন্যান্য নীতিমালা ভিন্ন হলেও, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ইইউ’র নীতিমালা একই রাখতে হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জনসনের চুক্তিটি চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হওয়ার মতোই। গবেষণা সংস্থা ইউকে ইন এ চেঞ্জিং ইউরোপ জানিয়েছে, জনসনের চুক্তিতে অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হবে বৃটেন। সেক্ষেত্রে, ব্রেক্সিট না হওয়ার তুলনায় ২.৫ শতাংশ হ্রাস পাবে বৃটেনের জিডিপি। আর চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হলে এই পরিমাণ হবে ৩.৩ শতাংশ। চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রে আরো বিপজ্জনক দিকও রয়েছে। এতে, ওষুধ ঘাটতির সংকট সৃষ্টি হতে পারে বৃটেনে, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

জনসনের চুক্তিটির সঙ্গে ২০১৮ সালে ইইউ’র করা একটি চুক্তির মিল রয়েছে। ওই চুক্তিতে ইইউ প্রস্তাব করেছিল, ব্রেক্সিটের পর তাদের কাস্টমস ইউনিয়নে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সদস্যপদ বজায় রাখা হোক। মে সরকার ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। মে বলেছিলেন, এতে বৃটেনের ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতা নষ্ট হবে। জনসন বলছেন, আইনিভাবে বৃটেনের অংশই থাকবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড। কিন্তু কার্যত বৃটেনের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে দেশটি। জনসন তার চুক্তির মাধ্যমে ডিইউপি’র সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু চুক্তি ঘোষণার পরপরই সে আশায় গুড়েবালি দিয়েছে ডিইউপি। দলটির নেতারা বলেছেন, এই চুক্তিতে প্রস্তাবিত কাস্টমস ও অনুমোদন ইস্যুগুলোতে এবং ভ্যাট প্রদানের বিষয়গুলো ঘিরে অসপষ্টতা রয়েছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পার্লামেন্টে জনসনের চুক্তি পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে জনসন পার্লামেন্টে হারলেও পুরো রাজনৈতিক কৌশল বিবেচনায় জিতে যাবেন। তেরেসা মে’র উত্তরসূরি হিসেবে এসে তিনি বেশকিছু সমালোচিত পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মধ্যে চুক্তিহীন ব্রেক্সিট সমর্থন, বিরোধীদের চুপ রাখতে পার্লামেন্ট স্থগিত করাও রয়েছে। কিন্তু সবশেষে তিনি নতুন একটি চুক্তি হাজির করতে পেরেছেন পার্লামেন্টের সামনে। সেটি পাস না হলে পার্লামেন্টকে ব্রেক্সিট সংকট বৃদ্ধির জন্য দোষ দিতে পারেন। আগাম নির্বাচন ডাকতে পারেন।  তবে এই কৌশলের নেতিবাচক দিকও রয়েছে। জনসনের পূর্বসূরি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র চুক্তির ক্ষেত্রে এ বিষয় সপষ্ট হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রায় একইরকম পরিস্থিতিতে আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়ে বেশকিছু আসন হারিয়েছে মে সরকার। জনসনের ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটতে পারে।
(দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য টাইমস ও বিবিসি অবলম্বনে)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ফ্লোরিডায় নৌঘাঁটিতে হামলা, বন্দুকধারীসহ নিহত ৪

দূষণে বাড়ছে মৃত্যু সর্বাধিক ঝুঁকিতে শিশুরা

বিমর্ষ ওরা তিন জন

হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটিকে মারলো কে?

‘বন্ধু ভারত যেন আতঙ্ক জাগানো কিছু না করে’

ভ্রাম্যমাণ হকার সিন্ডিকেট

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেই কোটিপতি পিয়ন গ্রেপ্তার

চলছে দাম বাড়ানোর ঘষামাজা

আওয়ামী লীগে নতুন হিসাব

নতুন জীবনে সৃজিত-মিথিলা

বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছেন: কাদের

বিএসএমএমইউ ভিসি আদালত অবমাননা করেছেন: ফখরুল

সোমবার লোকসভায় পেশ হবে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল

বিচারের মুখোমুখি সুচি, রয়টার্সের বিশ্লেষণ

মোবাইলফোনের একটি কলে ভেঙে যেতে পারে সুন্দর সম্পর্ক

বিদেশি ঋণ পরিশোধের শর্ত শিথিল